যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অন্তর্বর্তী সমঝোতা কার্যত ভেঙে পড়ার আশঙ্কার মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে আবারও উত্তেজনা তীব্র হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর হুঁশিয়ারির পর ইরান কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় নতুন করে হামলা চালিয়েছে। এতে পুরো অঞ্চলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সমঝোতার পরও থামেনি হামলা
দুই দেশের মধ্যে সাময়িক সমঝোতার উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধ বন্ধ করা, সমুদ্রপথে বাণিজ্য স্বাভাবিক করা এবং পারমাণবিক কর্মসূচিসহ দীর্ঘদিনের বিরোধ নিয়ে আলোচনার পথ খুলে দেওয়া। ইতোমধ্যে মধ্যস্থতায় এক দফা বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়।
তবে সেই উদ্যোগ স্থায়ী হতে পারেনি। কয়েক দিনের মধ্যেই উভয় পক্ষ আবারও একে অপরের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। ফলে কূটনৈতিক অগ্রগতির পরিবর্তে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

কুয়েত ও বাহরাইনে হামলা
ইরানের হামলার পর কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করে। বাহরাইনেও সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হয়। পরে দেশটির একটি আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানায়, সাম্প্রতিক মার্কিন হামলার জবাব হিসেবেই তারা এই অভিযান চালিয়েছে। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করেছে এবং এর ফলে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, হামলায় তাদের কোনো সেনা নিহত হয়নি এবং বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবরও পাওয়া যায়নি। তবে পরিস্থিতি এখনো পরিবর্তনশীল বলে তারা উল্লেখ করেছে।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন উত্তেজনা
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করেও উত্তেজনা বাড়ছে। একটি তেলবাহী জাহাজে ড্রোন হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক নজরদারি, যোগাযোগ, আকাশ প্রতিরক্ষা, ড্রোন সংরক্ষণ এবং নৌ-মাইন স্থাপনের সক্ষমতার ওপর হামলা চালানোর কথা জানায়।
ইরান পাল্টা দাবি করেছে, ওই প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ অটুট রয়েছে এবং বাইরের সামরিক চাপ সেই অবস্থান পরিবর্তন করতে পারবে না। একই সঙ্গে তারা জানায়, প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি তাদের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের অংশ।

জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি বাজার
যুদ্ধ শুরুর পর উপসাগরীয় অঞ্চলে শত শত বাণিজ্যিক জাহাজ আটকা পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে ধীরে ধীরে কিছু জাহাজ চলাচল শুরু করায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সরবরাহ বেড়েছে এবং তেলের দামও যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থার কাছাকাছি নেমে এসেছে।
তবে নতুন হামলার কারণে নৌপরিবহন খাত আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বড় বড় পরিবহন কোম্পানিগুলো পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে এবং সতর্কতার সঙ্গে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
লেবানন সীমান্তেও সংঘর্ষ
এদিকে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েল নতুন করে সশস্ত্র যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করেছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও সীমান্তে উত্তেজনা কমেনি। একাধিকবার যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
ইরান বলছে, লেবাননে হামলা বন্ধ করা এবং বিদেশি সেনা প্রত্যাহার নিশ্চিত করা সাময়িক সমঝোতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে বাস্তবে সংঘর্ষ অব্যাহত থাকায় পুরো অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফেরার সম্ভাবনা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন সামরিক উত্তেজনা শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাকেই নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকেও নতুন ঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়েছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















