উত্তর-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনায় সামরিক শক্তি, ক্ষেপণাস্ত্র, পারমাণবিক প্রতিরোধ কিংবা সীমান্ত বিরোধই ছিল প্রধান বিষয়। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এখন নিরাপত্তার প্রশ্ন ক্রমশ সরে যাচ্ছে ডিজিটাল অবকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার সক্ষমতা, তথ্য নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার দিকে। ফলে অঞ্চলটির নিরাপত্তা কাঠামো আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি বহুমাত্রিক, আন্তঃনির্ভরশীল এবং অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে শুধু প্রযুক্তির অগ্রগতি নয়, বৃহৎ শক্তিগুলোর নতুন কৌশলগত অবস্থানও সমানভাবে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার পারস্পরিক সম্পর্কের নতুন সমীকরণ, উত্তর কোরিয়াকে ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা দেখিয়ে দিচ্ছে যে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা আর কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে নির্ধারিত হবে না। বরং তথ্যপ্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং ডিজিটাল প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতাই অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তির মানদণ্ড হয়ে উঠবে।
বিশেষ করে চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা উত্তর-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা পরিবেশকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। অতীতে এই সম্পর্ক মূলত পশ্চিমা প্রভাবের বিরোধিতার ভিত্তিতে গড়ে উঠলেও এখন সেটি আরও সুসংগঠিত ও কার্যকর নিরাপত্তা সহযোগিতায় রূপ নিচ্ছে। সামরিক সমন্বয়ের পাশাপাশি প্রযুক্তি বিনিময়, গোয়েন্দা সহযোগিতা, সাইবার কার্যক্রম এবং কূটনৈতিক সমর্থন—সব ক্ষেত্রেই তাদের যোগাযোগ আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমাদের সঙ্গে রাশিয়ার সংঘাত এই নির্ভরশীলতাকে আরও গভীর করেছে, আর একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার ভূরাজনৈতিক গুরুত্বও বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সামনে নিরাপত্তার সংজ্ঞাই বদলে গেছে। শুধু সামরিক জোট কিংবা প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়ে বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। সাইবার হামলা, বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার, প্রযুক্তিগত গুপ্তচরবৃত্তি, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নিরাপত্তা ঝুঁকি এখন সমান গুরুত্বের বিষয়। যুদ্ধ ও শান্তির মধ্যকার প্রচলিত সীমারেখাও আগের মতো স্পষ্ট নেই। কোনো রাষ্ট্র গুলি না ছুড়েও প্রতিপক্ষের অর্থনীতি, অবকাঠামো কিংবা সামাজিক স্থিতিশীলতাকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এমন বাস্তবতায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো নতুনভাবে ভাবার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করলেও ঐতিহাসিক বিরোধ ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা এখনো পূর্ণাঙ্গ কৌশলগত সহযোগিতার পথে বাধা হয়ে রয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করে না। সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নীতি, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, উন্নত প্রযুক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্পখাতে স্থিতিস্থাপকতা গড়ে তুলতে দুই দেশের আরও গভীর সমন্বয় এখন সময়ের দাবি।
একই সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতাকে কেবল প্রচলিত সামরিক জোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলেও চলবে না। উত্তর-পূর্ব এশিয়ার স্থিতিশীলতা এখন এমন একটি বিষয়, যার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতি, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ওপর সরাসরি পড়ে। তাই এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এমন মধ্যম শক্তিগুলোকেও সম্পৃক্ত করতে হবে, যাদের কৌশলগত সক্ষমতা রয়েছে এবং যারা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় বাস্তব অবদান রাখতে পারে। ভারত, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদাররা সেই পরিসরে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রযুক্তি, ডিজিটাল উদ্ভাবন এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে ভারতের ক্রমবর্ধমান অবস্থান তাকে উত্তর-পূর্ব এশিয়ার একটি সম্ভাবনাময় অংশীদারে পরিণত করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও ভারতের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ এবং উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে সহযোগিতা গড়ে উঠলে তা শুধু বিদ্যমান জোটকে শক্তিশালী করবে না, বরং পরিবর্তিত নিরাপত্তা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি বহুমাত্রিক কাঠামোও তৈরি করবে।

ইউরোপও এই পরিবর্তনের বাইরে নয়। ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে যে একটি আঞ্চলিক সংঘাত খুব দ্রুত বৈশ্বিক প্রভাব ফেলতে পারে। একইভাবে উত্তর-পূর্ব এশিয়ার প্রযুক্তিগত অস্থিরতা কিংবা সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহে বিঘ্ন ইউরোপের অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকেও সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে। ফলে ইউরোপের অংশগ্রহণ কেবল বাণিজ্য বা বিনিয়োগে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রযুক্তিগত স্থিতিশীলতা, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং হাইব্রিড নিরাপত্তা সহযোগিতার দিকেও বিস্তৃত হওয়া উচিত।
এই প্রেক্ষাপটে উলানবাতার সংলাপের মতো উদ্যোগগুলোর গুরুত্ব নতুনভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটের বাইরে থেকেও এমন প্ল্যাটফর্মগুলো বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে শান্তি, নিরাপত্তা ও আস্থার পরিবেশ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করে। বড় আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মতো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না থাকলেও এ ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ধারণা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ভবিষ্যতের আঞ্চলিক সংলাপে তাই শুধু সামরিক উত্তেজনা বা ভূখণ্ডগত বিরোধ নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শাসনব্যবস্থা, সাইবার আচরণবিধি, প্রযুক্তিগত স্থিতিস্থাপকতা, বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা এবং ডিজিটাল ঝুঁকির মতো বিষয়গুলোকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ একবিংশ শতাব্দীর নিরাপত্তা সংকটের বড় অংশই প্রযুক্তিগত পরিবর্তন থেকে তৈরি হচ্ছে।

এই আলোচনায় মঙ্গোলিয়ার অবস্থানও ব্যতিক্রমধর্মী। চীন ও রাশিয়ার মাঝখানে অবস্থান করেও দেশটি দীর্ঘদিন ধরে কৌশলগত স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রেখেছে। ‘থার্ড নেবার পলিসি’র মাধ্যমে তারা ইন্দো-প্যাসিফিক, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বহু দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। ফলে আঞ্চলিক মেরুকরণ যত বাড়বে, ততই নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য সংলাপের ক্ষেত্র হিসেবে মঙ্গোলিয়ার গুরুত্ব বাড়বে।
একই সঙ্গে মধ্যম শক্তিগুলোরও উচিত মঙ্গোলিয়ার সঙ্গে প্রযুক্তি, ডিজিটাল শাসন, সাইবার নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, শিক্ষা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা গড়ে তোলা। এতে শুধু মঙ্গোলিয়ার সক্ষমতাই বাড়বে না, বরং সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোও আরও ভারসাম্যপূর্ণ হবে।
উত্তর-পূর্ব এশিয়ার আগামী দিনের স্থিতিশীলতা শেষ পর্যন্ত শুধু সামরিক জোট, ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন কিংবা শীর্ষ বৈঠকের ওপর নির্ভর করবে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতা, ডিজিটাল অবকাঠামোর নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত নির্ভরতা এবং হাইব্রিড হুমকি মোকাবিলায় রাষ্ট্রগুলো কত দ্রুত নিজেদের কৌশল বদলাতে পারে, সেটিই হবে ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
অতএব, অঞ্চলটির সামনে নিরাপত্তা সংকট রয়েছে কি না—এ নিয়ে আর কোনো বিতর্ক নেই। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক নেতৃত্ব কি প্রযুক্তিনির্ভর নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাদের নিরাপত্তা কাঠামোকে সময়মতো রূপান্তর করতে পারবে? সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে শুধু উত্তর-পূর্ব এশিয়ার ভবিষ্যৎ নয়, বরং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার গতিপথও।
জগন্নাথ পান্ডা 



















