ভিয়েতনামের চলচ্চিত্রশিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বৈচিত্র্য—এমনটাই মনে করেন দেশটির জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও প্রযোজক কাইটি নগুয়েন। দা নাং শহরে অনুষ্ঠিত চতুর্থ দা নাং এশিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল উপলক্ষে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, স্থানীয় সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে তুলে ধরেই দক্ষিণ কোরিয়ার সিনেমা বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছে। ভিয়েতনামও সেই পথেই এগোতে চায়।
মাত্র ২৭ বছর বয়সী কাইটি নগুয়েন এবারের উৎসবের সর্বকনিষ্ঠ জুরি সদস্য। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি এখন চলচ্চিত্র প্রযোজনাতেও যুক্ত। তার মতে, ভিয়েতনামের উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলের সংস্কৃতি একে অপরের থেকে আলাদা। বহু বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবন নিয়ে এমন অসংখ্য গল্প রয়েছে, যা বিশ্বের দর্শকদের সামনে তুলে ধরা সম্ভব।
ভিয়েতনামের গল্প বলার নতুন সময়
কাইটি বলেন, শুধু ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, সমসাময়িক ভিয়েতনামের মানুষের জীবন নিয়েও এখন আরও বেশি চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে। নতুন প্রজন্মের নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার ও প্রযোজকদের হাত ধরে দেশটির চলচ্চিত্রশিল্প গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে।
তার ভাষায়, নতুন সৃষ্টিশীল মানুষের আগমনের ফলে ভিয়েতনামের নিজস্ব রঙিন গল্পগুলো আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগও বেড়েছে।
বক্স অফিসে ধারাবাহিক সাফল্য
২০১৭ সালে ‘এম চুয়া ১৮’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় কাইটি নগুয়েনের। প্রথম ছবিতেই তিনি সেরা অভিনেত্রীর স্বীকৃতি অর্জন করেন। এরপর ‘ব্লাড মুন পার্টি’ (২০২০), ‘দ্য লাস্ট ওয়াইফ’ (২০২৩) এবং ‘হাইজ্যাকড’ (২০২৫)-এর মতো চলচ্চিত্রে অভিনয় করে সমালোচক ও দর্শক—উভয়ের প্রশংসা কুড়িয়েছেন।
গত বছর ভিয়েতনামের মোট বক্স অফিস আয় দাঁড়ায় প্রায় ৫ দশমিক ৫৯৩ ট্রিলিয়ন ডং বা প্রায় ২১ কোটি মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি। কাইটির মতে, এই প্রবৃদ্ধি দেশটির চলচ্চিত্রশিল্পের দ্রুত বিকাশেরই প্রতিফলন।
দক্ষিণ কোরিয়ার সাফল্য থেকে শিক্ষা
কাইটি নগুয়েন মনে করেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সিনেমা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সফল হয়েছে মূলত নিজেদের সংস্কৃতি ও পরিচয়কে শক্তভাবে তুলে ধরার কারণে।
তিনি বলেন, ভিয়েতনামের চলচ্চিত্রশিল্পও এখন নিজেদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন জীবন থেকে গল্প খুঁজে বের করার পর্যায়ে রয়েছে। ভবিষ্যতে কান চলচ্চিত্র উৎসব কিংবা বুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মতো মর্যাদাপূর্ণ আসরে ভিয়েতনামের নিজস্ব পরিচয় তুলে ধরা চলচ্চিত্র নিয়মিত স্থান করে নেবে—এমন প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।

সৃজনশীলতায় আলাদা পরিচয়ের গুরুত্ব
অভিনেত্রী ও প্রযোজক—দুই পরিচয়েই কাইটির কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো ‘স্বাতন্ত্র্য’।
তার মতে, ভিয়েতনামের চলচ্চিত্রশিল্পকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে হলে নির্মাতাদের নিজেদের স্বকীয়তা প্রকাশে সাহসী হতে হবে। ভিন্নভাবে ভাবা এবং ভিন্নভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে ভয় পেলে নতুন উচ্চতায় পৌঁছানো সম্ভব নয়।
নিজের কাজের ক্ষেত্রেও তিনি একই নীতি অনুসরণ করেন। সাধারণত বছরে একটি চলচ্চিত্রে কাজ করেন তিনি। বাকি সময়টুকু নিজের জন্য রাখেন, নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করেন এবং ব্যক্তিগতভাবে শেখার চেষ্টা করেন। তার বিশ্বাস, একজন ভালো অভিনেতা হতে হলে জীবনের নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
কোরিয়ার সঙ্গে বিশেষ সংযোগ
কাইটির অভিনীত ‘ব্লাড মুন পার্টি’ দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘ইন্টিমেট স্ট্রেঞ্জার্স’-এর ভিয়েতনামি সংস্করণ। ছবিটি দেশটির ইতিহাসে সর্বাধিক আয় করা চলচ্চিত্রগুলোর অন্যতম হয়ে ওঠে।
কোরিয়ান অভিনেত্রী সং হে-কিয়োর অভিনয়েরও প্রশংসা করেন কাইটি। বিশেষ করে ‘দ্য গ্লোরি’-তে সং হে-কিয়োর অভিনয় তাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে বলে জানান তিনি। তার মতে, একজন শিল্পীর জীবনের অভিজ্ঞতা ও আবেগকে অভিনয়ের মাধ্যমে ধারণ করার ক্ষমতাই তাকে আলাদা মর্যাদা দেয়।
নিজের প্রযোজিত ও অভিনীত ‘হাইজ্যাকড’ চলচ্চিত্রটিকেই তিনি কোরিয়ার দর্শকদের কাছে পরিচয় করিয়ে দিতে চান। ১৯৭৮ সালে ভিয়েতনামে ঘটে যাওয়া একটি বাস্তব বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নির্মিত এই ছবিটি তার কাছে ব্যক্তিগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তার মা একজন বিমানবালা ছিলেন। তাই গল্পটির সঙ্গে তার পরিবারেরও একটি আবেগঘন সম্পর্ক রয়েছে।
ভিয়েতনামের চলচ্চিত্রশিল্পের বিকাশ নিয়ে কাইটি নগুয়েনের এই আশাবাদ দেশটির নতুন প্রজন্মের নির্মাতাদের আত্মবিশ্বাস এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের গল্প তুলে ধরার আকাঙ্ক্ষাকেই সামনে নিয়ে আসে।
ভিয়েতনামের চলচ্চিত্রশিল্পের বৈচিত্র্য ও নিজস্ব সংস্কৃতির গল্প বিশ্বদর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে চান অভিনেত্রী কাইটি নগুয়েন। দক্ষিণ কোরিয়ার সাফল্যকে তিনি দেখছেন অনুপ্রেরণা হিসেবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















