বিশ্বের ইস্পাত শিল্পের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে ভারতের ওপর। দ্রুত নগরায়ণ, শিল্পায়ন এবং অবকাঠামো নির্মাণে ব্যাপক বিনিয়োগের ফলে দেশটির ইস্পাত উৎপাদন আগামী এক দশকে নাটকীয়ভাবে বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কোকিং কয়লা—যা ইস্পাত উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল।
কিন্তু বৈশ্বিক বাজারের এই উজ্জ্বল সম্ভাবনার পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার কোকিং কয়লা খাত আরেকটি বাস্তবতার মুখোমুখি। বিশ্বের বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশটির খনি কোম্পানিগুলো মনে করছে, কুইন্সল্যান্ডের উচ্চ রয়্যালটি কর নতুন বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। ফলে ভবিষ্যতের চাহিদা যতই বাড়ুক, সেই চাহিদা পূরণের জন্য উৎপাদন সম্প্রসারণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
ভারতের ইস্পাত উৎপাদনের উচ্চাভিলাষ
ভারত ইতোমধ্যেই সমুদ্রপথে বাণিজ্য হওয়া কোকিং কয়লার অন্যতম বড় আমদানিকারক। দেশটির লক্ষ্য বর্তমান প্রায় ১৬৩ মিলিয়ন টন বার্ষিক ইস্পাত উৎপাদন ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন টনে উন্নীত করা। নতুন শহর, শিল্পাঞ্চল, রেলপথ, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বিপুল পরিমাণ ইস্পাতের প্রয়োজন হবে, আর সেই ইস্পাত উৎপাদনে কোকিং কয়লার চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
ভারতের সীমাবদ্ধতা কোথায়?
ভারতের কয়লার মজুত বিশাল হলেও ইস্পাত উৎপাদনের উপযোগী উচ্চমানের কোকিং কয়লার পরিমাণ খুবই সীমিত। বর্তমানে দেশটির উৎপাদিত কয়লার ৫ শতাংশেরও কম এ কাজে ব্যবহারযোগ্য।
এর পাশাপাশি ভারত এখনও মূলত ব্লাস্ট ফার্নেস ও বেসিক অক্সিজেন ফার্নেস প্রযুক্তিনির্ভর ইস্পাত উৎপাদন পদ্ধতির ওপর নির্ভর করছে। এই প্রযুক্তিতে কোকিং কয়লা অপরিহার্য। তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি, যেমন ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেসের ব্যবহার বাড়লেও তা এখনও ভারতের প্রধান উৎপাদন কৌশল নয়। ফলে দেশটির আমদানিনির্ভরতা আগামী বছরগুলোতে আরও বাড়বে।
অস্ট্রেলিয়ার জন্য সুযোগ, কিন্তু নীতিগত বাধা
ভারতের এই ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া। আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্যে সরবরাহ হওয়া কোকিং কয়লার প্রায় অর্ধেকই আসে দেশটি থেকে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাজারে দামের বড় ওঠানামা দেখা গেছে। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের পর দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়। পরে আবহাওয়াজনিত সরবরাহ বিঘ্নও বাজারকে অস্থির করে তোলে। তবে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল এবং সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দাম আবার কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী। বর্তমান মূল্যস্তরে উৎপাদন এখনও অত্যন্ত লাভজনক।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ খনি প্রতিষ্ঠান বিএইচপি-র তথ্যও সেটিই নির্দেশ করে। তাদের উৎপাদন ব্যয় বর্তমান বাজারদামের তুলনায় অনেক কম, ফলে প্রতিটি টন কোকিং কয়লা থেকে উল্লেখযোগ্য মুনাফা অর্জনের সুযোগ রয়েছে।

রয়্যালটি করের প্রভাব
বাজারে লাভজনক পরিস্থিতি থাকা সত্ত্বেও খনি কোম্পানিগুলোর প্রধান উদ্বেগ করনীতি। কুইন্সল্যান্ড সরকার ২০২২ সালে কয়লার রয়্যালটি কাঠামো পরিবর্তন করে মূল্যভিত্তিক উচ্চ হারের কর চালু করে। দাম যত বাড়ে, করের হারও তত বৃদ্ধি পায়।
খনি কোম্পানিগুলোর দাবি, এই ব্যবস্থা নতুন খনি উন্নয়ন কিংবা উৎপাদন সম্প্রসারণের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা কমিয়ে দিয়েছে। বিএইচপি ইতোমধ্যেই জানিয়েছে, কুইন্সল্যান্ডে নতুন প্রবৃদ্ধিমূলক বিনিয়োগের পরিকল্পনা তাদের নেই। তারা কেবল বিদ্যমান খনিগুলোর উৎপাদন ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করবে।
এর অর্থ হলো, বর্তমান সম্পদ শেষ হওয়া পর্যন্ত খনিগুলো পরিচালিত হবে, কিন্তু উৎপাদন বাড়ানোর মতো নতুন উদ্যোগ নেওয়ার সম্ভাবনা কম।
ভবিষ্যতের বাজারে সরবরাহ সংকটের ঝুঁকি
ভারত যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতি বছর ইস্পাত উৎপাদন বাড়ায়, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে কোকিং কয়লার অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হবে। এই অতিরিক্ত চাহিদার বেশিরভাগই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হবে।
ভারত ইতোমধ্যেই কোকিং কয়লা আমদানি বাড়িয়েছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী দশকে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি হতে পারে। যদিও চীন ও জাপানের মতো কিছু দেশ ধীরে ধীরে পরিবেশবান্ধব ইস্পাত উৎপাদন প্রযুক্তির দিকে এগোচ্ছে, তবুও ভারতের বাড়তি চাহিদা সেই প্রভাব অনেকটাই ভারসাম্যপূর্ণ করে দিতে পারে।
খনি কোম্পানিগুলোর সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত
এই বাস্তবতায় অস্ট্রেলিয়ার খনি কোম্পানিগুলোর সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে। তারা উচ্চ রয়্যালটি কর মেনে নিয়ে ভবিষ্যতের বাড়তে থাকা বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে। অথবা নতুন বিনিয়োগ এড়িয়ে গিয়ে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বাজার অন্য প্রতিযোগীদের জন্য ছেড়ে দিতে পারে।
ভারতের শিল্পায়নের গতি এবং ইস্পাত উৎপাদনের পরিকল্পনা এখন আর কেবল একটি দেশের অর্থনৈতিক কর্মসূচি নয়; এটি বৈশ্বিক কোকিং কয়লার বাজারের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। সেই বাস্তবতায় অস্ট্রেলিয়ার করনীতি, খনি কোম্পানির বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত এবং ভবিষ্যতের সরবরাহ সক্ষমতা—এই তিনটি বিষয়ই আগামী দশকের ইস্পাত শিল্পের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ক্লাইড রাসেল 



















