মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষকৃত্যকে ঘিরে নজিরবিহীন আয়োজন শুরু করতে যাচ্ছে তেহরান। শুক্রবার থেকে শুরু হয়ে প্রায় এক সপ্তাহব্যাপী চলবে এই কর্মসূচি, যার অংশ হিসেবে ইরান ও ইরাকের অন্তত পাঁচটি শহরে শোকানুষ্ঠানের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, এতে কয়েক কোটি মানুষ অংশ নিতে পারেন।
দীর্ঘ বিলম্বের পর এই শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন দেশটি যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং গভীর সামাজিক বিভাজনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকার এই আয়োজনকে জাতীয় ঐক্য, রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা এবং বাইরের চাপ মোকাবিলার সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।
রাষ্ট্রের জন্য প্রতীকী এক মুহূর্ত
খামেনি ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের শুরুতেই নিহত হন। তার মৃত্যুর কয়েক মাস আগেই ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। যদিও সরকার শেষকৃত্যে ব্যাপক জনসমাগমের প্রত্যাশা করছে, তবু দেশটির বহু নাগরিক এখনও খামেনির দীর্ঘ শাসনামল নিয়ে অসন্তুষ্ট।
প্রায় চার দশকের নেতৃত্বে তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, ভিন্নমত দমন, দুর্নীতি বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই ছিল। তার মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর কিছু মানুষ প্রকাশ্যেই আনন্দ উদযাপন করেছিলেন, যদিও এতে তাদের বড় ধরনের ঝুঁকি নিতে হয়েছিল।
আঞ্চলিক প্রভাবও তুলে ধরতে চায় তেহরান
খামেনি শুধু ইরানের রাষ্ট্রপ্রধানই ছিলেন না; তিনি দেশটির ইসলামিক শাসনব্যবস্থার ধর্মীয় সর্বোচ্চ কর্তৃত্বও ছিলেন। ইরাক, লেবানন, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের শিয়া মুসলমানদের মধ্যেও তার অনুসারী ছিল। একই সঙ্গে তিনি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের সর্বাধিনায়ক ছিলেন, যারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়ে এসেছে।
শেষকৃত্য পরিকল্পনা কমিটির মুখপাত্র ইমান আত্তারজাদেহ বলেছেন, এই বিদায়কে তারা কোনো সমাপ্তি নয়, বরং ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখছেন।
অস্বাভাবিক বিলম্ব, বিশাল আয়োজন
ইসলামি সংস্কৃতিতে মৃত্যুর এত দীর্ঘ সময় পর দাফন অত্যন্ত বিরল। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির কারণেই এই বিলম্ব হয়েছে বলে ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা খামেনির মরদেহ গোপনে দাফনের গুঞ্জনও অস্বীকার করেছে এবং বলেছে, ধর্মীয় বিধান মেনেই মরদেহ সংরক্ষণ করা হয়েছে।
শেষকৃত্যের প্রতীক হিসেবে প্রকাশিত সরকারি লোগোতে খামেনির মুষ্টিবদ্ধ হাতের সঙ্গে রাখা হয়েছে একটি স্লোগান—“আমাদের উঠে দাঁড়াতেই হবে।” সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই বার্তার মধ্য দিয়েই জাতীয় ঐক্য, প্রতিরোধ এবং নতুন অধ্যায়ে প্রবেশের প্রতীকী আহ্বান তুলে ধরা হচ্ছে।
তেহরানের পাশাপাশি ইরাকের কারবালা ও নাজাফেও বড় পরিসরে শোকানুষ্ঠান হবে। এর মাধ্যমে ইরান তার সীমান্তের বাইরেও ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রভাব তুলে ধরতে চায়।
নিরাপত্তা ও উত্তরাধিকার প্রশ্নে চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশাল আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হলো নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার বার্তা দেওয়া। তবে একটি বড় প্রশ্ন এখনও রয়ে গেছে। মার্চে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত খামেনির ছেলে আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি এখনও প্রকাশ্যে আসেননি। শেষকৃত্যে তিনি উপস্থিত থাকবেন কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়।
এদিকে তেহরানে তিন দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। রাজধানীর বাইরে বিশাল পার্কিংয়ের ব্যবস্থা, বাসে যাত্রী পরিবহন, সেনানিবাস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগতদের থাকার ব্যবস্থা এবং গ্র্যান্ড মোসাল্লায় লাখো মানুষের জন্য প্রবেশ ও প্রস্থানের বিশেষ অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।
শেষ যাত্রার সূচি
সোমবার তেহরানের প্রধান সড়কগুলো দিয়ে মরদেহ বহনের শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ধর্মীয় শিক্ষার কেন্দ্র কোমে আরেকটি অনুষ্ঠান হবে। বুধবার মরদেহ নেওয়া হবে ইরাকের কারবালা ও নাজাফে। সবশেষে বৃহস্পতিবার খামেনির জন্মস্থান মাশহাদে ইমাম রেজার মাজার প্রাঙ্গণে তাকে দাফন করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই শেষকৃত্য শুধু একজন নেতার বিদায় নয়; এটি ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি এবং নতুন এক পর্বের সূচনার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হবে।
খামেনির শেষযাত্রায় সপ্তাহব্যাপী আয়োজনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ঐক্য ও ধারাবাহিকতার বার্তা দিতে চাইলেও ইরানের সমাজে বিদ্যমান বিভাজনের বাস্তবতাও আলোচনায় উঠে এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















