ইন্টারনেট, স্মার্টফোন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষের তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল ব্যক্তিগত সতর্কতা দিয়ে আর এই বাস্তবতা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। বরং তথ্য ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হতে পারে ভবিষ্যতের সবচেয়ে কার্যকর পথ।
গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে
ডিজিটাল যুগে মানুষের অবস্থান, কেনাকাটা, অনলাইন আচরণ, পছন্দ-অপছন্দ থেকে শুরু করে অসংখ্য তথ্য নিয়মিতভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে একজন মানুষের স্বাস্থ্য, ধর্মীয় বিশ্বাস, রাজনৈতিক মত বা ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কেও অনুমান করতে পারে। ফলে সাধারণ মানুষের অজান্তেই তাদের সম্পর্কে বিস্তৃত ডিজিটাল প্রোফাইল তৈরি হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে জনমত জরিপগুলোও দেখাচ্ছে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের তথ্য ব্যবহারের ধরন নিয়ে মানুষের উদ্বেগ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। নতুন প্রযুক্তি চালুর আগে যথেষ্ট সতর্কতা ও জবাবদিহির অভাব নিয়ে প্রশ্নও বাড়ছে।
বর্তমান আইন কেন যথেষ্ট নয়
বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে গত কয়েক বছরে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় নতুন আইন হয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই এসব আইনের মূল লক্ষ্য ছিল ব্যবহারকারীর হাতে নিজের তথ্যের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবে এই পদ্ধতি কার্যকর নয়। কারণ হাজারো প্রতিষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহ, অসংখ্য গোপনীয়তা নীতি এবং জটিল শর্ত একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। অনেক সময় নিরীহ মনে হওয়া তথ্যও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে সংবেদনশীল তথ্যের ইঙ্গিত দিতে পারে।
প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি বাড়ানোর দাবি
বিশেষজ্ঞদের মতে, তথ্য ব্যবহারের কারণে যদি কোনো ব্যক্তি অযৌক্তিক ঝুঁকি বা ক্ষতির মুখে পড়েন, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আইনি দায় নিশ্চিত করতে হবে। অতীতে খাদ্য, ওষুধ কিংবা যানবাহন শিল্পেও কঠোর নিয়ন্ত্রণ চালুর আগে নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের সংকট ছিল। পরে আইন ও নিয়ন্ত্রণ জোরদার হওয়ায় এসব খাতে নিরাপত্তার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে।
একইভাবে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ উদ্ভাবনকে থামিয়ে দেয় না; বরং আরও নিরাপদ প্রযুক্তি তৈরিতে উৎসাহ দেয়। নিরাপত্তাকে বাধা নয়, উদ্ভাবনের অংশ হিসেবেই দেখা উচিত বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
তথ্য সংগ্রহে সীমা টানার গুরুত্ব
অনেক দেশে এখন এমন বিধান যুক্ত হচ্ছে, যেখানে নাগরিকরা চাইলে প্রতিষ্ঠানের কাছে নিজেদের তথ্য মুছে ফেলার আবেদন করতে পারেন। একই সঙ্গে তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ সীমিত করার বিষয়েও গুরুত্ব বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যত কম তথ্য সংগ্রহ করা হবে, অপব্যবহারের ঝুঁকিও তত কমবে। তাই তথ্যের সর্বনিম্ন ব্যবহার নিশ্চিত করা ভবিষ্যতের গোপনীয়তা সুরক্ষার অন্যতম ভিত্তি হতে পারে।
ভারসাম্যপূর্ণ আইন প্রয়োজন
গোপনীয়তা রক্ষার নামে এমন আইনও করা উচিত নয়, যা উল্টো আরও বেশি ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহে বাধ্য করে। উদাহরণ হিসেবে বয়স যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা উল্লেখ করা হয়, যেখানে ব্যবহারকারীর পরিচয় নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত বা জৈবিক তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজন হতে পারে। এতে গোপনীয়তা সুরক্ষার বদলে নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের আইন এমন হওয়া উচিত, যা একদিকে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখবে, অন্যদিকে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের পথও অযথা বাধাগ্রস্ত করবে না। তবে সেই ভারসাম্যের কেন্দ্রে থাকতে হবে প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং মানুষের তথ্যের নিরাপদ ব্যবহার।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার লড়াই তাই কেবল ব্যক্তির নয়, বরং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, আইনপ্রণেতা এবং সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় শুধু ব্যবহারকারীর সতর্কতা নয়, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিই জোরালো হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















