ইরাক-ইরান যুদ্ধের মাঝেও হলিউডের ধাঁচে একটি বিশাল বাজেটের চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন তৎকালীন ইরাকি নেতা সাদ্দাম হোসেন। ১৯৮৩ সালে মুক্তি পাওয়া Clash of Loyalties ছিল সেই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার প্রথম এবং শেষ বড় প্রকল্প। কোটি কোটি ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই চলচ্চিত্র একদিকে যেমন যুদ্ধকালীন বাস্তবতার সঙ্গে লড়েছে, অন্যদিকে মুক্তির পর প্রায় বিস্মৃতির আড়ালেও চলে যায়।
যুদ্ধের মধ্যেই শুটিং
বিবিসির প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৮০ সালে বাগদাদের কাছাকাছি মরুভূমিতে ছবিটির শুটিং শুরু হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই ইরান-ইরাক যুদ্ধ শুরু হয়। শুটিং ইউনিটের অনেক সদস্যকে হঠাৎ করেই সেনাবাহিনীতে ডেকে নেওয়া হয়। যুদ্ধের কারণে অস্ত্রের আদলে তৈরি চলচ্চিত্রের প্রপস তুরস্ক সীমান্ত দিয়ে ইরাকে নিতে গিয়েও বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়। সীমান্ত কর্তৃপক্ষ এগুলোকে বাস্তব অস্ত্র ভেবে আটকে দেয়। পরে দীর্ঘ বিকল্প পথে সেগুলো বাগদাদে পৌঁছানো হয়।
তবুও ইরাকি নেতৃত্বের নির্দেশ ছিল, স্বাভাবিক জীবনযাত্রার বার্তা দিতে চলচ্চিত্রের কাজ যত দ্রুত সম্ভব আবার শুরু করতে হবে। দুই সপ্তাহ বিরতির পর শুটিং পুনরায় শুরু হয়।
হলিউড গড়ার স্বপ্ন
১৯৭৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর সাদ্দাম হোসেন আন্তর্জাতিক মানের একটি ইরাকি চলচ্চিত্র শিল্প গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল এমন সব দেশপ্রেমমূলক চলচ্চিত্র নির্মাণ করা, যা পশ্চিমা দর্শকদের কাছেও গ্রহণযোগ্য হবে। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই Clash of Loyalties নির্মাণ করা হয়।
চলচ্চিত্রটির কাহিনি ১৯২০ সালের ব্রিটিশবিরোধী ইরাকি বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। এতে মেসোপটেমিয়া থেকে আধুনিক ইরাক রাষ্ট্র গঠনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়। অনেকেই এটিকে ‘সাদ্দামের Lawrence of Arabia’ বলেও উল্লেখ করেছিলেন।
তারকা, বিতর্ক ও নির্মাণ সংকট
ছবির অন্যতম তারকা ছিলেন ব্রিটিশ অভিনেতা অলিভার রিড। কিন্তু শুটিং চলাকালে তাঁর একাধিক বিতর্কিত আচরণ নির্মাতাদের জন্য নতুন সংকট তৈরি করে। একটি হোটেলে তাঁর অসৌজন্যমূলক আচরণ ইরাকি কর্তৃপক্ষকে এতটাই ক্ষুব্ধ করেছিল যে তাঁকে ছবি থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ পর্যন্ত আসে। তবে প্রযোজক লতিফ জোরেফানি দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে সেই সিদ্ধান্ত বদলাতে সক্ষম হন।
এ ছাড়া রিডের বিভিন্ন বেপরোয়া আচরণ নিয়েও সহশিল্পীদের নানা স্মৃতিচারণ রয়েছে। অন্যদিকে অভিনেতা মার্ক সিন্ডেন দাবি করেছিলেন, ইরাকে যাওয়ার আগে তাঁকে ব্রিটিশ একটি গোপন সংস্থা বাগদাদের কিছু স্থাপনার ছবি তুলতে বলেছিল। পরে ইরাকে তাঁকে নিরাপত্তা বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদেরও মুখোমুখি হতে হয়।

যুদ্ধের বাস্তবতা ও চলচ্চিত্র
চলচ্চিত্রটির একটি দৃশ্যে বিস্ফোরিত ট্রেন দেখানো হয়েছিল। শুটিংয়ের পরদিনই ইরানি গণমাধ্যমে দাবি করা হয়, ইরানি বাহিনী ইরাকে একটি সামরিক ট্রেনে হামলা চালিয়ে সেটি ধ্বংস করেছে। যদিও সেটি ছিল চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের দৃশ্য।
যুদ্ধকালীন বাস্তবতার কারণে স্থানীয় অনেক অভিনেতাকে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে হওয়ায় কিছু দৃশ্য নতুন করে ধারণ করতে হয়। পুরো প্রযোজনাজুড়েই নিরাপত্তা, পরিবহন ও জনবলসংক্রান্ত নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় নির্মাতাদের।
মুক্তির পর হারিয়ে যাওয়া
প্রায় ৩ কোটি ডলার ব্যয়ে নির্মিত Clash of Loyalties ১৯৮৩ সালে মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এবং একটি পুরস্কারও জেতে। কিন্তু কয়েকটি সীমিত প্রদর্শনীর পর ছবিটি কার্যত আর মুক্তি পায়নি।
১৯৯০ সালে কুয়েত দখলের পর ইরাকের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ হলে সাদ্দাম হোসেনের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র শিল্প গড়ার পরিকল্পনাও থেমে যায়। বহু বছর ছবিটির রিল সংরক্ষিত অবস্থায় পড়ে ছিল। পরে প্রযোজক লতিফ জোরেফানি স্মৃতিচারণ করে বলেন, দীর্ঘ যুদ্ধ, ধ্বংস আর প্রাণহানির তুলনায় চলচ্চিত্র নির্মাণ শেষ পর্যন্ত খুবই ক্ষুদ্র একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
সাদ্দাম হোসেনের স্বপ্ন ছিল বাগদাদকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র নির্মাণের একটি কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে মাত্র একটি চলচ্চিত্র—Clash of Loyalties।
যুদ্ধের মাঝেও হলিউড ধাঁচের চলচ্চিত্র নির্মাণের সাদ্দাম হোসেনের উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ এবং কেন সেটি শেষ পর্যন্ত হারিয়ে যায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















