২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমার অব্যাহত সংঘাতের মধ্যে রয়েছে। যুদ্ধের ময়দানে একের পর এক প্রাণ হারাচ্ছেন কিংবা গুরুতর আহত হচ্ছেন সামনের সারির সেনাসদস্যরা। নিখোঁজ ঘোষিত অনেক সেনার পরিবার বেতন ও প্রাপ্য সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। কিন্তু একই সময়ে সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের ঘনিষ্ঠ কিছু কর্মকর্তা দুর্নীতি, ঘুষ ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন বলে এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ক্ষমতার ছায়ায় দ্রুত উত্থান
এই ব্যবস্থার অন্যতম উদাহরণ লেফটেন্যান্ট কর্নেল হ্লাইং মিন তুন। একসময় অপেক্ষাকৃত অখ্যাত এই কর্মকর্তা দ্রুতই মিন অং হ্লাইংয়ের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দলের সদস্য হয়ে ওঠেন। তিনি যখন ডিফেন্স সার্ভিসেস একাডেমির ৪৭তম ব্যাচে ভর্তি হন, তখন মিন অং হ্লাইং ছিলেন সেই প্রতিষ্ঠানের কমান্ড্যান্ট।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় কঠোর প্রশিক্ষণ সম্পন্ন না করেই তিনি সরাসরি লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে উন্নীত হন। এই পদোন্নতির পেছনে যোগ্যতার চেয়ে ব্যক্তিগত আনুগত্য ও পৃষ্ঠপোষকতাই বেশি ভূমিকা রেখেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঘুষের মাধ্যমে সম্পদ গড়ার অভিযোগ
এপ্রিল মাসে মিন অং হ্লাইং নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর হ্লাইং মিন তুনকে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের উপপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পদে থেকে তিনি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রকল্প অনুমোদন কিংবা বাজেট ছাড়ের বিনিময়ে বড় অঙ্কের ঘুষ আদায় করেন। কোথাও প্রকল্প ব্যয়ের নির্দিষ্ট অংশ, আবার কোথাও একটি নথিতে স্বাক্ষরের জন্যই কয়েক কোটি কিয়াত পর্যন্ত দাবি করা হয় বলে অভিযোগ।
তার স্ত্রী ইয়াদানার সোয়ে অংও এখন বিলাসবহুল জীবনযাপনের জন্য পরিচিত। দামী ব্যাগ, বিলাসবহুল গাড়ি, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে কেনাকাটার সফর, নেপিদোতে ‘হ্লাইং ইয়াদানার’ নামে সিল্ক কাপড়ের ব্যবসা এবং অভিজাত হোটেল ও বিনোদনকেন্দ্রে নিয়মিত যাতায়াত—সব মিলিয়ে তাদের জীবনযাত্রা সাধারণ সেনাসদস্যদের বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

সৈন্যদের পরিবারের দুর্দশা
যেখানে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বিপুল সম্পদ অর্জন করছেন, সেখানে নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত সেনাদের পরিবার চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। সামরিক বাহিনী অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করায় পরিবারগুলো বেতন বা অন্যান্য সুবিধা পাচ্ছে না।
হ্লাইং মিন তুনের সাবেক সহকর্মীদের কেউ কেউ তাকে এমন এক সুবিধাভোগী কর্মকর্তা হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যিনি যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা সহযোদ্ধাদের সরঞ্জাম ও সহায়তার আবেদন উপেক্ষা করেও নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেছেন।
ইয়াঙ্গুনে চাঁদাবাজির অভিযোগ
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাও হতেইত অং ইয়াঙ্গুনের নিরাপত্তা কমান্ডে নিজের অবস্থান ব্যবহার করে নগরীর নাইটলাইফ ব্যবসাকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছেন।
মেজর জেনারেল থান্ট জাওয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি কারাওকে বার, অভিজাত ম্যাসাজ পার্লার এবং মাদক সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অভিযান ও বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে অর্থ আদায় করেন বলে অভিযোগ। তার অধীনস্থ কর্মকর্তারাও এই কার্যক্রমে অংশ নেন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিলাসবহুল বিনোদনকেন্দ্রে অবাধ জীবনযাপন করেন।
এছাড়া ব্যবসায়ীদের বাড়িঘর দখল, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অর্থ আদায়ের জন্য আটক করার অভিযোগও রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব অর্থ মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে জাও হতেইত অং এবং তার পৃষ্ঠপোষকদের কাছে পৌঁছায়।
পৃষ্ঠপোষকতার চক্রেই টিকে থাকা ব্যবস্থা
প্রতিবেদনটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীতে দীর্ঘদিন ধরে একটি পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর কাঠামো গড়ে উঠেছে। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা নিজেদের অনুগতদের লাভজনক পদে বসান, আর সেই কর্মকর্তারা আবার অর্জিত অর্থ ও সুবিধার একটি অংশ ঊর্ধ্বতনদের কাছে পৌঁছে দেন। ফলে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে একই ধরনের দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সংস্কৃতি বিস্তার লাভ করছে।
এর ফলে যুদ্ধরত সাধারণ সেনাসদস্যদের চাহিদা ও কল্যাণ উপেক্ষিত থাকলেও ক্ষমতাকেন্দ্রিক দুর্নীতি ও ভয়ভীতিনির্ভর ব্যবস্থাই আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মিয়ানমারের সেনাবাহিনীতে দুর্নীতির অভিযোগ: যুদ্ধরত সৈন্যদের দুর্দশার বিপরীতে শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিলাসজীবনের চিত্র তুলে ধরেছে এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।
(সূত্র: The Irrawaddy)
সুই তাও 



















