এল নিনোর প্রভাবে ইন্দোনেশিয়াজুড়ে শুষ্ক মৌসুম আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় কমে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পানি সংকট দ্রুত বাড়ছে। পরিস্থিতি আগামী কয়েক মাসে আরও জটিল হতে পারে বলে সতর্ক করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা (বিএনপিবি) জানিয়েছে, বহু এলাকায় টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে বৃষ্টি না হওয়ায় হাজারো পরিবার নিরাপদ পানির সংকটে পড়েছে। সংস্থাটি স্থানীয় প্রশাসনকে খরার প্রস্তুতি জোরদার করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে পানি সাশ্রয় এবং বন বা জমিতে আগুন লাগতে পারে এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
পানি সংকটের বিস্তার
সর্বশেষ পরিস্থিতিতে যোগ হয়েছে যোগ্যাকার্তার গুনুঙ্গকিদুল, মধ্য জাভার সেমারাং এবং পূর্ব জাভার জেম্বার। এসব এলাকায় অন্তত ৭০০ পরিবার সরাসরি পানির সংকটে আক্রান্ত হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ইতোমধ্যে ট্যাংকারের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ শুরু করেছে।
এর আগে মধ্য জাভার সিলাকাপ, ক্লাতেন ও জেপারা, যোগ্যাকার্তার বানতুল, পশ্চিম জাভার কারাওয়াং, তাসিকমালায়া ও সুকাবুমি এবং মালুকুর সেরামসহ বিভিন্ন এলাকায় সাত হাজারেরও বেশি পরিবার বিশুদ্ধ পানির অভাবে ভুগছিল। এসব এলাকাতেও জরুরি ভিত্তিতে পানি সরবরাহ কার্যক্রম চলছে।
খরা মোকাবিলায় বিভিন্ন অঞ্চল ৯০ দিনের সতর্কতা জারি করেছে। গুনুঙ্গকিদুলে জুন থেকেই সতর্কতা কার্যকর রয়েছে। পশ্চিম জাভাও চলতি মাসে একই ধরনের সতর্কতা ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে পশ্চিম নুসা তেঙ্গারার পশ্চিম লম্বকে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জুনের মাঝামাঝি খরা জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। বানতেন প্রদেশ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজন হলে প্রদেশজুড়ে সতর্কতা জারি করবে।
খাদ্য উৎপাদনে বাড়ছে ঝুঁকি
আবহাওয়া, জলবায়ু ও ভূ-পদার্থবিজ্ঞান সংস্থা (বিএমকেজি) জানিয়েছে, এ বছরের শুষ্ক মৌসুম ‘চরম’ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
জুনের মাঝামাঝি সময়ে ইন্দোনেশিয়ার ৩৭ শতাংশ জলবায়ু অঞ্চল আনুষ্ঠানিকভাবে শুষ্ক মৌসুমে প্রবেশ করেছে। একই সময়ে দেশের প্রায় অর্ধেক এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে শুষ্ক মৌসুম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে এবং দেশের ৮০ শতাংশেরও বেশি এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হবে।
এই পরিস্থিতিতে কৃষি খাতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিএমকেজি। সংস্থাটি খরা-সহনশীল ও দ্রুত পরিপক্ব ফসলের জাত ব্যবহার, চাষের সময়সূচি পরিবর্তন এবং বিকল্প খাদ্যশস্য উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

সরকারের প্রস্তুতি
ইন্দোনেশিয়ার কৃষিমন্ত্রী আমরান সুলেইমান বলেছেন, সম্ভাব্য খরার প্রভাব কমাতে সরকার আগেই প্রস্তুতি নিয়েছে। সেচ পাম্পের ব্যবহার বাড়ানোসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে যাতে কৃষিকাজ ব্যাহত না হয় এবং খাদ্য উৎপাদন স্বাভাবিক থাকে।
তিনি আরও বলেন, জাতীয় চালের মজুত এখন ইতিহাসের অন্যতম সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এবং আগামী বছর পর্যন্ত দেশের চাহিদা পূরণে তা যথেষ্ট হবে।
এদিকে পার্লামেন্টের কৃষি ও খাদ্যবিষয়ক কমিশন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে দ্রুত বীজ, সার, কৃষিযন্ত্র এবং পশুখাদ্য সরবরাহের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের ওপর জোর
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল জরুরি ভিত্তিতে পানি সরবরাহ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। খরা-প্রবণ এলাকায় নিরাপদ পানির অবকাঠামো উন্নয়ন, পাইপলাইনের মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে পানি সরবরাহ এবং আঞ্চলিক পানি সেবাকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি নির্বিচারে ভূমি রূপান্তর এবং ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহারও পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। তাই জলাধার ও পানি ধারণক্ষম এলাকা রক্ষায় কঠোর নীতি গ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
ইন্দোনেশিয়ার চলমান খরা সংকট দেখিয়ে দিচ্ছে, জলবায়ুগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু জরুরি ত্রাণ নয়, টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সংরক্ষণই ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমাধান।
এল নিনোর তীব্র প্রভাবে ইন্দোনেশিয়ায় খরা বাড়ছে। পানির সংকটে হাজারো পরিবার, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















