ভারতের গণতন্ত্র নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে বিতর্ক চলছে, তার কেন্দ্রবিন্দু এখন আর শুধু নির্বাচনের ফল নয়; বরং নির্বাচন কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেটাই বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। গণতন্ত্রের মৌলিক ধারণা হলো জনগণ সরকার নির্বাচন করবে। কিন্তু যখন রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা এমনভাবে ব্যবহৃত হয় যে ক্ষমতাসীনরাই কার্যত ঠিক করে দেয় কারা ভোট দিতে পারবে, তখন গণতন্ত্রের ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে যায়।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই আশঙ্কাকেই আরও স্পষ্ট করেছে। ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে পরিচালিত একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে কোটি কোটি মানুষের ভোটাধিকার প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কাগজে-কলমে এটি ছিল ভোটার তালিকাকে আরও নির্ভুল করার উদ্যোগ। কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তা শুধু প্রশাসনিক ত্রুটির নয়; বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হস্তক্ষেপের।
যে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই সময়ে সময়ে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা স্বাভাবিক। মানুষের স্থানান্তর, মৃত্যু কিংবা নতুন ভোটারের অন্তর্ভুক্তির কারণে এ ধরনের প্রক্রিয়া প্রয়োজনীয়। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন সেই প্রক্রিয়া সমানভাবে প্রয়োগ না হয়ে নির্দিষ্ট অঞ্চল বা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ওপর অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়।
ভারতে সাম্প্রতিক বিশেষ নিবিড় সংশোধন কর্মসূচির ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে যে, আগে থেকেই নিবন্ধিত ভোটারদেরও আবার নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে বাধ্য করা হয়েছে। এমনকি অনেকের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের জন্মসনদসহ বিভিন্ন নথি জমা দিতে বলা হয়েছে। ফলে বহু দরিদ্র, গ্রামীণ ও প্রান্তিক মানুষের জন্য নিজেদের ভোটাধিকার ধরে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় দিক হলো, রাষ্ট্র আর নাগরিকের যোগ্যতা যাচাই করছে না; বরং নাগরিককে নিজের অস্তিত্ব ও অধিকার প্রমাণের দায় চাপিয়ে দিচ্ছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন। কারণ ভোটাধিকারকে আর মৌলিক নাগরিক অধিকার হিসেবে নয়, বরং প্রশাসনের অনুমোদনসাপেক্ষ সুবিধা হিসেবে বিবেচনা করা শুরু হলে তার রাজনৈতিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী হয়।
সবচেয়ে বেশি বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। দীর্ঘদিন ধরে বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই রাজ্যে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে সামান্য বানান ভুল, বয়সের অমিল কিংবা তথ্যগত ছোটখাটো অসঙ্গতিকেই ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার কারণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, একই ধরনের কঠোরতা দেশের সর্বত্র দেখা যায়নি। অভিযোগ অনুযায়ী, ভোটার বাদ দেওয়ার ঘটনা বেশি ঘটেছে বিরোধী দলের শক্ত ঘাঁটি এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায়। একই সঙ্গে নারীদেরও তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ আপিল করলেও খুব অল্পসংখ্যকের নাম পুনর্বহাল হয়েছে। অন্যদিকে একই সময়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নতুন ভোটার তালিকাভুক্ত হওয়ার ঘটনাও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এসব ঘটনার পাশাপাশি ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ার নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কিছু নির্বাচনী এলাকার ভোটের তথ্য বিশ্লেষণে ভোটার উপস্থিতি ও সম্ভাব্য প্রদত্ত ভোটের সংখ্যার মধ্যে অসামঞ্জস্যের অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা বিচার করার দায় অবশ্যই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত না হওয়াই গণতান্ত্রিক আস্থাকে আরও দুর্বল করে।
নির্বাচনের ফলাফল তাই শুধু রাজনৈতিক বিজয় বা পরাজয়ের হিসাব নয়; বরং পুরো নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। কোথাও যদি বিজয়ের ব্যবধান ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষের সংখ্যার চেয়ে কম হয়, তবে সেই ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। গণতন্ত্রে ফলাফলের বৈধতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে প্রক্রিয়ার বৈধতার ওপর।
সমস্যা এখানেই থেমে নেই। পশ্চিমবঙ্গে নতুন প্রশাসন ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করার ঘোষণা দিয়েছে বলে জানা গেছে। খাদ্য সহায়তা, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা নগদ সহায়তার মতো মৌলিক কল্যাণমূলক সুবিধাকে ভোটার তালিকার সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হলে নাগরিক অধিকার ও রাজনৈতিক অধিকারের সীমারেখা বিপজ্জনকভাবে মিশে যায়। এতে ভোটার তালিকা একটি প্রশাসনিক নথি না থেকে নাগরিকত্বের কার্যকর মানদণ্ডে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
গণতন্ত্রে বিচার বিভাগের ভূমিকা এমন পরিস্থিতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যখন আদালত বিতর্কিত ঘটনাগুলোর কার্যকর প্রতিকার দিতে ব্যর্থ হয় অথবা দ্রুত হস্তক্ষেপ করে না, তখন নাগরিকদের আস্থা আরও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিই গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। সেই ভিত্তি দুর্বল হলে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা বজায় থাকলেও তার গণতান্ত্রিক আত্মা ক্ষয় হতে থাকে।
এর মধ্যেই আসন পুনর্বিন্যাসের সম্ভাব্য উদ্যোগ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নির্বাচনী সীমানা পুনর্নির্ধারণ যদি নিরপেক্ষতার বদলে রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তবে নির্বাচনী প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র আরও অসম হয়ে পড়বে। তখন নির্বাচন ক্ষমতা পরিবর্তনের পথ না হয়ে ক্ষমতা স্থায়ী করার কৌশলে রূপ নিতে পারে।
তবে ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতার আরেকটি দিকও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে অসন্তোষ, কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষাকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দেখিয়ে দিচ্ছে যে জনঅসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে। তরুণদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা নতুন সামাজিক আন্দোলনগুলোও প্রমাণ করছে যে রাজনৈতিক বিকল্পের অনুসন্ধান থেমে নেই।
কিন্তু জনঅসন্তোষ একা রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটায় না। যদি নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয় এবং ভোটের মাধ্যমেই পরিবর্তনের সম্ভাবনা সংকুচিত হয়ে যায়, তাহলে গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বলয় দুর্বল হয়ে পড়ে।
ভারতের এই অভিজ্ঞতা কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্ক নয়। বিশ্বের বহু গণতন্ত্রেই এখন ভোটার তালিকা, নির্বাচনী সীমানা, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা এবং বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ক্ষমতাসীন সরকার যদি নির্বাচনের নিয়ম নিজের সুবিধামতো নির্ধারণ করতে পারে, তবে নির্বাচন আর ক্ষমতার প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র থাকে না; সেটি ক্ষমতা সংরক্ষণের যন্ত্রে পরিণত হয়।
এই কারণেই ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু ভারতীয়দের জন্য নয়, বিশ্বের সব গণতন্ত্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি কেবল ভোট নয়; সেই ভোটের প্রতি মানুষের অবিচল আস্থা। সেই আস্থা একবার ক্ষয় হতে শুরু করলে শুধু একটি নির্বাচন নয়, পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মুখে পড়ে।
জয়তী ঘোষ 


















