০৭:৫১ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬
ভারতের গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সংকট কি এখন ভোটের আগেই নির্ধারিত হচ্ছে? মেক্সিকো: যেখানে ইতিহাসের পরাজয় ভেঙে নতুন গল্প লিখতে চায় ইংল্যান্ড বিচ্ছিন্নতাবাদী-সন্ত্রাসীদের হামলায় পাপুয়ায় মার্কিন পাইলট নিহত, তদন্তে ইন্দোনেশিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সমন্বয় এল নিনোর তীব্র প্রভাবে ইন্দোনেশিয়ায় খরা বাড়ছে, পানির সংকটে হাজারো পরিবার, খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে নতুন শঙ্কা নতুন অর্থনীতিকে দেখতে হলে শুধু তথ্য নয়, মানুষের কাছেও পৌঁছাতে হবে দেশে ‘বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের’ আভাস দিলেন জিএম কাদের আশ্রয়ের আদর্শ: অভিবাসীদের মাধ্যমেই আমেরিকার শক্তি শততম ম্যাচে স্কালোনির নতুন মাইলফলক, আর্জেন্টিনা ফুটবলে সোনালি অধ্যায়ের নায়ক বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় বার্তা, আবারও উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা পেল শ্রীলঙ্কা পাসকি প্রযুক্তি চালু করল ভিসা, অনলাইন লেনদেনে নিরাপত্তা ও গতি বাড়ানোর নতুন উদ্যোগ

আশ্রয়ের আদর্শ: অভিবাসীদের মাধ্যমেই আমেরিকার শক্তি

কোনো রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় শুধু তার সীমান্ত, সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক সক্ষমতায় নির্ধারিত হয় না। বরং সেই রাষ্ট্র কী ধরনের মানুষকে আপন করে নেয়, নিপীড়িতদের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি কী এবং নতুন আগন্তুকদের জন্য কতটা সুযোগ তৈরি করে—এসবই শেষ পর্যন্ত তার জাতীয় চরিত্রকে সংজ্ঞায়িত করে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এই প্রশ্নটি বহুবার ফিরে এসেছে। কখনও দেশটি নিজেকে নিপীড়িত মানুষের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে, আবার কখনও ভয়, সংকীর্ণতা ও জাতীয়তাবাদের কাছে সেই আদর্শকে বিসর্জন দিয়েছে।

আমেরিকার সূচনালগ্ন থেকেই একটি ধারণা প্রবল ছিল—যে মানুষ নিজ দেশে নির্যাতিত, ধর্মীয় বা রাজনৈতিক কারণে বঞ্চিত কিংবা নতুন জীবনের সন্ধানে ঘর ছেড়েছে, তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র হতে পারে নতুন সম্ভাবনার ভূমি। এই আদর্শ সব সময় নিখুঁতভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। বরং ইতিহাসে এর অসংখ্য ব্যতিক্রম রয়েছে। তবু স্বাধীনতার ঘোষিত মূল্যবোধের সঙ্গে এই ধারণাটি এতটাই গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে যে, সেটি আমেরিকান পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেছে।

অভিবাসন শুধু জনসংখ্যা বাড়ায়নি; এটি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং সামাজিক গতিশীলতাকেও নতুন রূপ দিয়েছে। বিভিন্ন ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতি থেকে আসা মানুষ দেশটিকে বৈচিত্র্যময় করেছে এবং একই সঙ্গে উদ্ভাবন, উদ্যোগ ও শ্রমের নতুন শক্তি এনে দিয়েছে। বিশ্বের বহু দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ সময় ধরে নতুন নাগরিকদের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সফল ছিল। এই সক্ষমতাই দেশটির সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধাগুলোর একটি।

Immigrants Put America First: In Coming Here, They Affirm Our Values |  George W. Bush Presidential Center

গণতন্ত্রের বিকাশেও অভিবাসনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যখন সমাজের বড় অংশই নতুন জীবন শুরু করতে আসে, তখন জন্মসূত্রে মর্যাদা বা সামাজিক শ্রেণির পরিবর্তে ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও পরিশ্রম বেশি গুরুত্ব পায়। নতুন সমাজে সবার জন্য সমান সুযোগের ধারণা তখন আরও শক্তিশালী হয়। এই বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দীর্ঘদিন প্রভাবিত করেছে।

তবে এই ইতিহাসের আরেকটি দিকও রয়েছে। অভিবাসীদের প্রতি সন্দেহ, বিদেশবিদ্বেষ এবং রাজনৈতিকভাবে তাদের লক্ষ্যবস্তু বানানোর প্রবণতাও আমেরিকার ইতিহাসে নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে আইন, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং জনমত ব্যবহার করে বিদেশিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বা রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় এই প্রবণতা আরও তীব্র হয়েছে। ফলে উন্মুক্ততার আদর্শ এবং সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের মধ্যে টানাপোড়েন প্রায় স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই দ্বন্দ্ব নতুন মাত্রা পেয়েছে। অভিবাসীদের অপরাধী বা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা, তাদের মানবিক মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং কঠোর আটক ও বহিষ্কারনীতিকে রাজনৈতিক সাফল্যের হাতিয়ার বানানোর চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের আত্মপরিচয়ের সঙ্গে স্পষ্ট সংঘাত তৈরি করেছে। একটি দেশ যখন নতুন আগন্তুকদের কেবল নিরাপত্তা-ঝুঁকি হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন সে নিজের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কেও অস্বীকার করে।

For U.S. asylum seekers, some judges are a better bet than others

তবু এও সত্য যে, যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি শক্তিশালী ঐতিহ্য এখনো টিকে আছে। দেশের বড় শহরগুলোতে অভিবাসী সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ছে, তারা নেতৃত্বের পর্যায়েও উঠে আসছে। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে বহু নাগরিক এখনো বিশ্বাস করেন, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি তার বৈচিত্র্যের মধ্যেই নিহিত। নতুন মানুষকে সুযোগ দেওয়া মানে কেবল মানবিক দায়িত্ব পালন নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং গণতন্ত্রকে আরও সমৃদ্ধ করার পথ।

এই বিতর্ক শেষ পর্যন্ত কেবল অভিবাসননীতি নিয়ে নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের দেশ হতে চায়—সেই মৌলিক প্রশ্নকে সামনে আনে। এমন একটি দেশ, যা ভয় ও বর্জনের রাজনীতিকে কেন্দ্র করে নিজের পরিচয় গড়ে তুলবে, নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে স্বাধীনতা ও আশ্রয়ের প্রতিশ্রুতি এখনো বাস্তব অর্থ বহন করে?

ইতিহাস দেখিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে উজ্জ্বল সময়গুলো এসেছে তখনই, যখন দেশটি নতুন মানুষকে বোঝা নয়, সম্পদ হিসেবে দেখেছে। কারণ একটি জাতির শক্তি শুধু তার জন্মসূত্রের নাগরিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং যারা নতুন স্বপ্ন নিয়ে সেই সমাজে যোগ দেয়, তাদের অবদানও সমানভাবে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। সেই কারণেই আশ্রয়, বৈচিত্র্য এবং অন্তর্ভুক্তির আদর্শ শুধু নৈতিক অবস্থান নয়—এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভারতের গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সংকট কি এখন ভোটের আগেই নির্ধারিত হচ্ছে?

আশ্রয়ের আদর্শ: অভিবাসীদের মাধ্যমেই আমেরিকার শক্তি

০৭:০০:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬

কোনো রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় শুধু তার সীমান্ত, সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক সক্ষমতায় নির্ধারিত হয় না। বরং সেই রাষ্ট্র কী ধরনের মানুষকে আপন করে নেয়, নিপীড়িতদের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি কী এবং নতুন আগন্তুকদের জন্য কতটা সুযোগ তৈরি করে—এসবই শেষ পর্যন্ত তার জাতীয় চরিত্রকে সংজ্ঞায়িত করে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এই প্রশ্নটি বহুবার ফিরে এসেছে। কখনও দেশটি নিজেকে নিপীড়িত মানুষের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে, আবার কখনও ভয়, সংকীর্ণতা ও জাতীয়তাবাদের কাছে সেই আদর্শকে বিসর্জন দিয়েছে।

আমেরিকার সূচনালগ্ন থেকেই একটি ধারণা প্রবল ছিল—যে মানুষ নিজ দেশে নির্যাতিত, ধর্মীয় বা রাজনৈতিক কারণে বঞ্চিত কিংবা নতুন জীবনের সন্ধানে ঘর ছেড়েছে, তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র হতে পারে নতুন সম্ভাবনার ভূমি। এই আদর্শ সব সময় নিখুঁতভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। বরং ইতিহাসে এর অসংখ্য ব্যতিক্রম রয়েছে। তবু স্বাধীনতার ঘোষিত মূল্যবোধের সঙ্গে এই ধারণাটি এতটাই গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে যে, সেটি আমেরিকান পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেছে।

অভিবাসন শুধু জনসংখ্যা বাড়ায়নি; এটি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং সামাজিক গতিশীলতাকেও নতুন রূপ দিয়েছে। বিভিন্ন ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতি থেকে আসা মানুষ দেশটিকে বৈচিত্র্যময় করেছে এবং একই সঙ্গে উদ্ভাবন, উদ্যোগ ও শ্রমের নতুন শক্তি এনে দিয়েছে। বিশ্বের বহু দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ সময় ধরে নতুন নাগরিকদের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সফল ছিল। এই সক্ষমতাই দেশটির সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধাগুলোর একটি।

Immigrants Put America First: In Coming Here, They Affirm Our Values |  George W. Bush Presidential Center

গণতন্ত্রের বিকাশেও অভিবাসনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যখন সমাজের বড় অংশই নতুন জীবন শুরু করতে আসে, তখন জন্মসূত্রে মর্যাদা বা সামাজিক শ্রেণির পরিবর্তে ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও পরিশ্রম বেশি গুরুত্ব পায়। নতুন সমাজে সবার জন্য সমান সুযোগের ধারণা তখন আরও শক্তিশালী হয়। এই বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দীর্ঘদিন প্রভাবিত করেছে।

তবে এই ইতিহাসের আরেকটি দিকও রয়েছে। অভিবাসীদের প্রতি সন্দেহ, বিদেশবিদ্বেষ এবং রাজনৈতিকভাবে তাদের লক্ষ্যবস্তু বানানোর প্রবণতাও আমেরিকার ইতিহাসে নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে আইন, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং জনমত ব্যবহার করে বিদেশিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বা রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় এই প্রবণতা আরও তীব্র হয়েছে। ফলে উন্মুক্ততার আদর্শ এবং সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের মধ্যে টানাপোড়েন প্রায় স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই দ্বন্দ্ব নতুন মাত্রা পেয়েছে। অভিবাসীদের অপরাধী বা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা, তাদের মানবিক মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং কঠোর আটক ও বহিষ্কারনীতিকে রাজনৈতিক সাফল্যের হাতিয়ার বানানোর চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের আত্মপরিচয়ের সঙ্গে স্পষ্ট সংঘাত তৈরি করেছে। একটি দেশ যখন নতুন আগন্তুকদের কেবল নিরাপত্তা-ঝুঁকি হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন সে নিজের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কেও অস্বীকার করে।

For U.S. asylum seekers, some judges are a better bet than others

তবু এও সত্য যে, যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি শক্তিশালী ঐতিহ্য এখনো টিকে আছে। দেশের বড় শহরগুলোতে অভিবাসী সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ছে, তারা নেতৃত্বের পর্যায়েও উঠে আসছে। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে বহু নাগরিক এখনো বিশ্বাস করেন, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি তার বৈচিত্র্যের মধ্যেই নিহিত। নতুন মানুষকে সুযোগ দেওয়া মানে কেবল মানবিক দায়িত্ব পালন নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং গণতন্ত্রকে আরও সমৃদ্ধ করার পথ।

এই বিতর্ক শেষ পর্যন্ত কেবল অভিবাসননীতি নিয়ে নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের দেশ হতে চায়—সেই মৌলিক প্রশ্নকে সামনে আনে। এমন একটি দেশ, যা ভয় ও বর্জনের রাজনীতিকে কেন্দ্র করে নিজের পরিচয় গড়ে তুলবে, নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে স্বাধীনতা ও আশ্রয়ের প্রতিশ্রুতি এখনো বাস্তব অর্থ বহন করে?

ইতিহাস দেখিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে উজ্জ্বল সময়গুলো এসেছে তখনই, যখন দেশটি নতুন মানুষকে বোঝা নয়, সম্পদ হিসেবে দেখেছে। কারণ একটি জাতির শক্তি শুধু তার জন্মসূত্রের নাগরিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং যারা নতুন স্বপ্ন নিয়ে সেই সমাজে যোগ দেয়, তাদের অবদানও সমানভাবে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। সেই কারণেই আশ্রয়, বৈচিত্র্য এবং অন্তর্ভুক্তির আদর্শ শুধু নৈতিক অবস্থান নয়—এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি।