ইন্দোনেশিয়ার পাপুয়া প্রদেশে বিচ্ছিন্নতাবাদী-সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত মার্কিন পাইলট নিকোলাস এফ. গোসেলিনের মরদেহ উদ্ধার করেছে দেশটির সামরিক বাহিনী (টিএনআই)। একই সঙ্গে ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে তদন্ত ও মরদেহ স্বদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে জাকার্তা।
ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুক্রবার এক বিবৃতিতে নিহত পাইলটের পরিবারের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করে জানায়, দেশটির সামরিক বাহিনী, পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী ঘটনার তদন্ত করছে। পাশাপাশি জাকার্তায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কনস্যুলার সহায়তা ও মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইভোন মেউয়েংকাং বলেন, সাধারণ মানুষ, বেসামরিক নাগরিক এবং দুর্গম এলাকার যোগাযোগ নিশ্চিত করতে পরিচালিত বেসামরিক বিমানসেবার ওপর যেকোনো সশস্ত্র হামলার নিন্দা জানায় ইন্দোনেশিয়া। বিদেশি নাগরিকসহ সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বৃহস্পতিবার হাইল্যান্ড পাপুয়ার ইয়াহুকিমো অঞ্চলে বিমান অবতরণের পরপরই নিকোলাস এফ. গোসেলিনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে বিমানটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পশ্চিম পাপুয়া ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (টিপিএনপিবি) হামলার দায় স্বীকার করে জানায়, এটি ইন্দোনেশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি একটি “বার্তা”।
বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মুখপাত্র সেবি সামবোম দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট বিমানটি নিয়মিত ইন্দোনেশিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বহন করছিল, যা তাদের ঘোষিত সতর্কবার্তার লঙ্ঘন। ভবিষ্যতেও সরকার যদি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণাধীন বলে দাবি করা এলাকায় বেসামরিক বিমান চলাচল অব্যাহত রাখে, তাহলে একই ধরনের হামলা চালানো হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
তবে ইন্দোনেশিয়ার সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গোসেলিন যে বিমানের পাইলট ছিলেন সেটি পিটি এএমএ (PT AMA) পরিচালিত। প্রতিষ্ঠানটির বিমানগুলো পাপুয়ার দুর্গম এলাকায় খাদ্য, জ্বালানি ও ডাক পরিবহনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা দিয়ে থাকে।
পাপুয়ায় সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম. উইরিয়া আর্থাদিগুনা জানান, বিচ্ছিন্নতাবাদী-সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হামলায় পাইলট নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর নিরাপত্তা বাহিনী মরদেহ উদ্ধার করে সরিয়ে নিয়েছে। হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
তিনি আরও জানান, বিমানে থাকা সাতজন পাপুয়া যাত্রী নিরাপদে উদ্ধার হয়েছেন এবং তারা নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গেছেন।
এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, ঘটনাটির তদন্তে তারা ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। নিহতের পরিবারের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য, বিদেশে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তাই তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
সম্প্রতি পাপুয়ায় সহিংসতা নতুন করে বেড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সম্পদসমৃদ্ধ এই অঞ্চলে স্বাধীনতার দাবিতে সশস্ত্র আন্দোলন চালিয়ে আসছে টিপিএনপিবি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উন্নত অস্ত্র হাতে পাওয়ার পর তারা নিরাপত্তা বাহিনী, বেসামরিক বিমান এবং অভিবাসী বাসিন্দাদের ওপর হামলা বাড়িয়েছে।
এর জবাবে ইন্দোনেশিয়া সংঘাতপ্রবণ এলাকায় সামরিক ও পুলিশি অভিযান জোরদার করেছে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, এসব অভিযানে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ, বেসামরিক হতাহত এবং ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটছে।
বর্তমান ঘটনাটি ২০২৩ সালে নিউজিল্যান্ডের পাইলট ফিলিপ মেহরটেন্সকে অপহরণের ঘটনাকেও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। তাকে ১৮ মাসেরও বেশি সময় জিম্মি করে রাখার পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। সেই ঘটনাও আন্তর্জাতিকভাবে পাপুয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং দুর্গম এলাকায় বেসামরিক বিমান চলাচলের ঝুঁকি নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















