বিশ্বকাপের সূচি প্রকাশের পর থেকেই একটি সম্ভাব্য ম্যাচ বিশেষভাবে আলোচনায় উঠে আসে—মেক্সিকোর বিপক্ষে ইংল্যান্ড, তাও আবার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম কিংবদন্তি ভেন্যু আজতেকা স্টেডিয়ামে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দুই হাজার মিটারেরও বেশি উচ্চতায় অবস্থিত এই মাঠে খেলতে নামা মানেই শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়; এটি শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং ঐতিহাসিক স্মৃতিরও পরীক্ষা। কিন্তু এই লড়াইকে কেবল ৯০ মিনিটের খেলা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। ইংল্যান্ড ও মেক্সিকোর সম্পর্কের পেছনে রয়েছে এমন এক দীর্ঘ ইতিহাস, যেখানে ইউরোপীয় আগন্তুকদের জন্য এই ভূখণ্ড খুব কমই সহজ প্রমাণিত হয়েছে।
অনেকের ধারণা, আজতেকায় ইংল্যান্ডের ইতিহাস মানেই ১৯৮৬ সালের দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’। কিন্তু তার আগেই একই বিশ্বকাপে এই মাঠেই প্যারাগুয়েকে হারিয়েছিল ইংল্যান্ড। তাই এই স্টেডিয়াম তাদের জন্য সম্পূর্ণ অচেনা নয়। তবে স্বাগতিক মেক্সিকোকে তাদের নিজের ঘরে হারানো সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার চ্যালেঞ্জ।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, আজতেকায় স্থানীয় কোনো মেক্সিকান দলকে হারানো শেষ ইংলিশ দল ছিল শেফিল্ড ওয়েডনেসডে। ১৯৬৭ সালে একটি প্রীতি ম্যাচে তারা টোলুকাকে ৪-১ গোলে পরাজিত করেছিল। সেই সফরের গল্পে ফুটবলের চেয়ে খাদ্যজনিত অসুস্থতা, অদ্ভুত প্রাণী আর সাংস্কৃতিক বিস্ময়ের বর্ণনাই বেশি জায়গা পেয়েছে। তবু সেই ঘটনাই প্রমাণ করে, অসম্ভব বলে কিছু নেই।
তবে মাঠের বাইরের ইংরেজ অভিজ্ঞতা অনেক কম আশাব্যঞ্জক। বিখ্যাত সাহিত্যিক গ্রাহাম গ্রিন ১৯৩৮ সালে মেক্সিকো সফরের যে বিবরণ লিখেছিলেন, সেখানে রঙিন উৎসব বা পর্যটনের আকর্ষণের চেয়ে বেশি উঠে এসেছে দারিদ্র্য, প্রচণ্ড গরম, ধ্বংসপ্রাপ্ত গির্জা এবং কঠিন জীবনযাত্রার বাস্তবতা। তার চোখে মেক্সিকো ছিল রোমান্টিক কল্পনার দেশ নয়, বরং গভীর বৈপরীত্যের সমাজ।
এরও বহু আগে, ষোড়শ শতকে ইংল্যান্ড ও স্পেনের সামুদ্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময় আরেকটি নাটকীয় অধ্যায়ের জন্ম হয়। ইংরেজ নৌ-অধিনায়ক স্যার জন হকিন্সের নেতৃত্বে একটি বহর মেক্সিকো উপসাগরে স্প্যানিশ নৌবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কয়েকটি জাহাজ ডুবে যায়, আর শতাধিক ইংরেজ নাবিক ভেরাক্রুজ উপকূলে আটকা পড়েন।
সেখান থেকেই শুরু হয় তাদের প্রকৃত দুর্ভোগ। স্থানীয় অধিবাসীদের আক্রমণের মুখে পড়ে তারা শেষ পর্যন্ত স্প্যানিশ প্রশাসনের হাতে বন্দি হন। পরে মেক্সিকো সিটিতে নিয়ে গিয়ে তাদের সাধারণ শ্রমিকের মতো জীবনযাপন করতে বাধ্য করা হয়। কেউ রুপার খনিতে কাজ করেছেন, কেউ বছরের পর বছর বন্দিদশায় কাটিয়েছেন।
কিন্তু বিপদ সেখানেই শেষ হয়নি। কয়েক বছর পর স্প্যানিশ ইনকুইজিশন প্রোটেস্ট্যান্ট ইংরেজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়। কারও ওপর চালানো হয় নির্যাতন, কেউ দগ্ধ হন, কেউ চাবুকের শাস্তি পান, আবার কাউকে পাঠানো হয় গ্যালি জাহাজে। নাবিক মাইলস ফিলিপস তুলনামূলকভাবে সৌভাগ্যবান ছিলেন। তাকে পাঁচ বছর একটি মঠে কাজ করতে এবং পুরো সময়জুড়ে অপমানজনক পোশাক পরে থাকতে বাধ্য করা হয়।

মঠ থেকে মুক্তি পাওয়ার পরও তার জীবন ছিল রোমাঞ্চে ভরা। কখনও রেশম বুননের কাজ, কখনও দোভাষী, কখনও সৈনিক—বিভিন্ন পেশা বদলে শেষ পর্যন্ত তিনি ইউরোপ হয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন এবং নিজের অভিজ্ঞতার বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন। তার বর্ণনায় অতিরঞ্জন থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট—মেক্সিকো ইংরেজদের জন্য কখনও সহজ গন্তব্য ছিল না।
তবে ইউরোপীয়দের মধ্যে সবচেয়ে করুণ পরিণতি বোধহয় অস্ট্রিয়ার আর্চডিউক ম্যাক্সিমিলিয়ানের। ফরাসি সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়নের পরিকল্পনায় ১৮৬৪ সালে তিনি মেক্সিকোর সম্রাট হিসেবে দেশটিতে আসেন। স্প্যানিশ ভাষায় দক্ষ হলেও মেক্সিকোর জটিল রাজনীতি সম্পর্কে তার ধারণা ছিল অত্যন্ত সীমিত। প্রজাপতি সংগ্রহের মতো ব্যক্তিগত শখে তিনি যতটা আগ্রহী ছিলেন, রাজনৈতিক সমর্থন গড়ে তুলতে ততটা সফল হননি।
অবশেষে বিদ্রোহীদের হাতে পরাজিত হয়ে ১৮৬৭ সালে তাকে গুলি করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। মৃত্যুর আগে তিনি জাতীয় ঐক্য ও রক্তপাত বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বক্তৃতা করেছিলেন, কিন্তু তা তার ভাগ্য বদলাতে পারেনি। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তার সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে।
এই ঘটনাগুলো ভিন্ন সময়ের, ভিন্ন বাস্তবতার। তবু একটি মিল রয়েছে—মেক্সিকো এমন এক দেশ, যেখানে বাইরের শক্তির আত্মবিশ্বাস বহুবার বাস্তবতার মুখে ভেঙে পড়েছে। এখানকার ইতিহাস বিদেশি বিজয়ীদের জন্য খুব কমই সুখকর হয়েছে।
কিন্তু ইতিহাসের আরেকটি শিক্ষা হলো, অতীত ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না। ফুটবল মাঠে আগের শতকের যুদ্ধ, সাম্রাজ্য বা রাজনৈতিক ব্যর্থতার কোনো সরাসরি প্রভাব নেই। আজতেকায় নামা ইংল্যান্ড দলের সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব অতীতের বোঝা বহন করা নয়; বরং নিজেদের সময়ের নতুন ইতিহাস লেখা।
প্রতিটি প্রজন্মের খেলোয়াড়ের সামনে এমন একটি মুহূর্ত আসে, যখন তারা পুরোনো স্মৃতিকে অতিক্রম করার সুযোগ পায়। আজতেকার আলোয় ইংল্যান্ডের জন্য সেই মুহূর্ত উপস্থিত। ইতিহাস তাদের সতর্ক করতে পারে, অনুপ্রাণিতও করতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ফল নির্ধারণ করবে বর্তমানের পারফরম্যান্সই। অতীতের গল্প যতই আকর্ষণীয় হোক, নতুন ইতিহাস সবসময় লেখা হয় বর্তমানের সাহস দিয়েই।
ডমিনিক স্যান্ডব্রুক 


















