দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ছিল ভিয়েতনামের সামুদ্রিক খাদ্য রপ্তানিকারকদের সবচেয়ে বড় বাজার। মাঝেমধ্যে শুল্ক ও বাণিজ্য বাধা তৈরি হলেও চিংড়ি, ক্যাটফিশ ও টুনা মাছের রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়ার পর পরিস্থিতি বদলে যেতে শুরু করে। শুল্কহার বারবার পরিবর্তিত হওয়ায় মার্কিন ক্রেতাদের অর্ডার অনিয়মিত হয়ে পড়ে। ফলে ভিয়েতনামের রপ্তানিকারকেরা বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন।
২০২৫ সালের শেষ নাগাদ চীন ভিয়েতনামের সবচেয়ে বড় সামুদ্রিক খাদ্য আমদানিকারক দেশে পরিণত হয়। একই সময়ে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানেও ভিয়েতনামের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। এসব দেশের সঙ্গে ভিয়েতনামের বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়ক হয়েছে দুটি বৃহৎ আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তি—সিপিটিপিপি (CPTPP) এবং আরসিইপি (RCEP)।
বিকল্প বাজারে নতুন সুযোগ
ভিয়েতনামের বৃহত্তম চিংড়ি রপ্তানিকারক মিন ফু সিফুড কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় নতুন সহযোগী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। রপ্তানিকারকদের মতে, এসব আঞ্চলিক চুক্তির আওতায় বাজারে প্রবেশ সহজ হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি স্থিতিশীল বাণিজ্য পরিবেশ পাওয়া যাচ্ছে।
শুধু ভিয়েতনাম নয়, এশিয়ার আরও কয়েকটি শিল্পও ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি এবং ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনার প্রভাব মোকাবিলায় এই বাণিজ্য জোটগুলোকে নিরাপত্তার একটি বিকল্প হিসেবে দেখছে।
তবে এখনো সীমিত প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, সিপিটিপিপি ও আরসিইপির সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রভাব এখনো সীমিত। কারণ অনেক শুল্ক ছাড় ধাপে ধাপে কার্যকর হচ্ছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো এসব চুক্তির সুযোগ সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নয়। এর পাশাপাশি কোভিড-১৯ মহামারি চুক্তিগুলোর প্রকৃত প্রভাব মূল্যায়নকেও জটিল করে তুলেছে।
তবুও আগ্রহ বাড়ছে। গত এক বছরে ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও আর্জেন্টিনা সিপিটিপিপিতে যোগ দেওয়ার আবেদন করেছে। অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছে চীন, তাইওয়ান, ইন্দোনেশিয়া, ইকুয়েডর ও ইউক্রেন। অন্যদিকে হংকং, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও চিলি আরসিইপিতে যোগ দিতে আবেদন করেছে।
নতুন বাণিজ্য বাস্তবতায় এশিয়ার কৌশল
থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রী সিহাসাক ফুয়াংকেটকেও বলেন, বহুপক্ষীয় বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা কার্যকরভাবে কাজ করছে না। বড় বাজারগুলোতে বাড়তি শুল্কের মুখে পড়ায় দেশগুলোকে আঞ্চলিক ও আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপর আরও গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। থাইল্যান্ডও সিপিটিপিপিতে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
সরবরাহ শৃঙ্খলে পরিবর্তন
এই দুই চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো ‘রুলস অব অরিজিন’, যার ফলে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খল আরও সহজ হয়েছে। একটি সদস্য দেশে উৎপাদিত পণ্যে অন্য সদস্য দেশের উপকরণ ব্যবহৃত হলেও তা শুল্ক সুবিধা পেতে পারে।
এ সুবিধার কারণে কম্বোডিয়ার পোশাক, জুতা, ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ, বৈদ্যুতিক তার এবং অটোপার্টস রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় তাদের রপ্তানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
অস্ট্রেলিয়াও লাভবান হয়েছে। সিপিটিপিপির আওতায় মেক্সিকোয় অস্ট্রেলিয়ার বার্লি, গরুর মাংস ও ওয়াইন রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একইভাবে জাপান ও চীনের মধ্যেও আরসিইপির সুবিধায় কিছু পণ্যের শুল্ক ধীরে ধীরে কমছে।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তির পূর্ণ সুফল পেতে সময় লাগে। শুল্ক কমানোর পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের এসব সুবিধা সম্পর্কে সচেতন করা এবং ডিজিটাল বাণিজ্যসহ নতুন খাতে চুক্তিগুলোকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক বাণিজ্য অনিশ্চয়তার মধ্যে সিপিটিপিপি ও আরসিইপি এশিয়ার দেশগুলোর জন্য বিকল্প বাজার, বৈচিত্র্যময় সরবরাহ শৃঙ্খল এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য নিরাপত্তা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যদিও এখন পর্যন্ত এর সামগ্রিক প্রভাব সীমিত, তবুও আগামী বছরগুলোতে এর সুফল আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
ট্রাম্পের শুল্ক নীতির চাপের মধ্যে এশিয়ার অর্থনীতিগুলো ধীরে ধীরে আঞ্চলিক সহযোগিতার দিকে ঝুঁকছে, যা ভবিষ্যতের বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামোকেও নতুনভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
ট্রাম্পের শুল্ক নীতির অনিশ্চয়তায় এশিয়ার দেশগুলো সিপিটিপিপি ও আরসিইপির মতো আঞ্চলিক বাণিজ্য জোটে ভর করে বিকল্প বাজার ও সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তুলছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















