ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে। রাজধানী তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় রাখা হয়েছে তাঁর মরদেহ, যেখানে চীন, রাশিয়া, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদল এবং শিয়া ধর্মীয় নেতারা শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হচ্ছেন। কয়েক দিনব্যাপী এই আয়োজনের মাধ্যমে ইরান সরকার খামেনির রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উত্তরাধিকারকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, ইরানি কর্মকর্তা, বিদেশি প্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা ও মিলিশিয়া সদস্যরা খামেনির কফিনের সামনে নীরবে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন। কেউ প্রার্থনা করছেন, কেউ মাথা নত করছেন, আবার কেউ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছেন।
বিদায়ের আনুষ্ঠানিক সূচি
শুক্রবারের শোকানুষ্ঠানের পর শনিবার সাধারণ মানুষের জন্য খামেনির কফিন প্রদর্শনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সোমবার তেহরানে শবযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর তাঁর মরদেহ ইরাকের পবিত্র শিয়া শহরগুলোতে নেওয়া হবে এবং সবশেষে ইরানের মাশহাদে, তাঁর জন্মভূমিতে দাফন করা হবে।
ইরানের জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কফিনের ওপর রাখা হয়েছে একটি কালো পাগড়ি এবং কালো-সাদা নকশার স্কার্ফ, যা খামেনির পরিচিত পোশাকের অংশ ছিল। কালো পাগড়ি তাঁর নবী মুহাম্মদের বংশধর হওয়ার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
তেহরানে শোকের আবহ
শুক্রবার সকাল থেকেই রাজধানী তেহরানজুড়ে শোকের পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়। সড়ক, উড়ালসেতু ও সরকারি ভবনে কালো ব্যানার টানানো হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে খামেনির প্রতিকৃতি সম্বলিত বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। কিছু পোস্টারে তাঁকে একাই দেখানো হয়েছে, আবার কিছুতে তাঁর উত্তরসূরি মোজতবা খামেনির সঙ্গে একই ফ্রেমে তুলে ধরা হয়েছে, যা নেতৃত্বের ধারাবাহিকতার বার্তা বহন করছে।
একই সঙ্গে শহরজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। যান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে এবং রাজধানীর কেন্দ্রস্থলের অনেক দোকানপাট বন্ধ রাখা হয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, এটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ জনসমাগমে পরিণত হতে পারে।

আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের উপস্থিতি
শুক্রবারের অনুষ্ঠানে এক হাজারেরও বেশি বিদেশি প্রতিনিধি অংশ নিয়েছেন বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং দেশটির নিরাপত্তা পরিষদের উপ-চেয়ারম্যান দিমিত্রি মেদভেদেভ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। চীনের পক্ষ থেকে দেশটির শীর্ষ আইনসভা ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের ভাইস চেয়ারম্যান হে ওয়েই উপস্থিত হচ্ছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার এবং ইরানি তেলের প্রধান ক্রেতা।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনিরও অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি ইরাকের প্রেসিডেন্ট, পার্লামেন্টের স্পিকার, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের শিয়া সম্প্রদায়ের নেতা এবং ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন আঞ্চলিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরাও উপস্থিত রয়েছেন।
এছাড়া আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের জ্যেষ্ঠ নেতা মোল্লা আবদুল গনি বারাদার ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকিও অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন। একই অনুষ্ঠানে তালেবানবিরোধী নেতা আহমদ মাসউদকেও শ্রদ্ধা জানাতে দেখা গেছে, যা আঞ্চলিক রাজনীতির জটিল বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে।
সংকটের মধ্যেই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া
খামেনির মৃত্যু এবং দীর্ঘ সময় পর তাঁর দাফনের আয়োজন এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন ইরান সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নিরাপত্তা সংকট, আঞ্চলিক সংঘাত, বিক্ষোভ, ইন্টারনেট বন্ধ এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আয়োজন বিলম্বিত হয়েছিল।
ইরান সরকার এই শোকানুষ্ঠানের মাধ্যমে খামেনিকে বিশ্বজুড়ে সম্মানিত শিয়া ধর্মীয় নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চাইলেও, দেশের ভেতরে তাঁর দীর্ঘ শাসনামল, রাজনৈতিক দমননীতি এবং অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে ভিন্নমতও বিদ্যমান।
খামেনির মৃত্যু ইরানের জন্য শুধু একজন নেতার বিদায় নয়, বরং দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















