পৃথিবীর অতীতের অসংখ্য ভূতাত্ত্বিক রহস্য যেন কোটি কোটি বছরের বরফের স্তরের নিচে লুকিয়ে আছে অ্যান্টার্কটিকায়। সেই বরফের আচ্ছাদনের নিচে এবার বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন বিশাল এক ‘পাখা-আকৃতির’ ভূতাত্ত্বিক কাঠামো, যা পৃথিবীর প্রাচীন সুপারকন্টিনেন্ট গন্ডোয়ানার ভাঙন এবং অ্যান্টার্কটিকার বরফস্তরের বিবর্তন সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে।
নেচার জিওসায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় আন্তর্জাতিক গবেষক দল এই নতুন ভূতাত্ত্বিক ব্যবস্থার নাম দিয়েছে ইস্ট অ্যান্টার্কটিক ফ্যান-শেপড বেসিন প্রভিন্স (EAFBP)। এটি পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার একাধিক বিচ্ছিন্ন ভূগর্ভস্থ অববাহিকাকে একটি বিশাল মহাদেশজুড়ে বিস্তৃত একক কাঠামোর অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বরফের তিন কিলোমিটারেরও বেশি নিচে লুকানো ভূদৃশ্য
অ্যান্টার্কটিকার শিলাস্তরের ৯৯ শতাংশেরও বেশি অংশ বরফে ঢাকা। অনেক স্থানে বরফের পুরুত্ব তিন কিলোমিটারেরও বেশি হওয়ায় সরাসরি ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধান প্রায় অসম্ভব।
এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে গবেষকরা বরফ ভেদ করতে সক্ষম রাডার, মাধ্যাকর্ষণ পরিমাপ, চৌম্বকীয় জরিপ, ভূকম্পন তথ্য এবং ভূত্বকের ডিজিটাল মডেল ব্যবহার করেন। এসব তথ্য একত্র করে তারা দেখতে পান, দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি একটি কেন্দ্র থেকে একাধিক ভূগর্ভস্থ অববাহিকা পাখার পাখনার মতো চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে। এতদিন এগুলোকে আলাদা আলাদা কাঠামো হিসেবে দেখা হলেও নতুন গবেষণায় এগুলোকে একই বৃহৎ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
বিচ্ছিন্ন অববাহিকাগুলোর নতুন ব্যাখ্যা
উইলকস বেসিন, অরোরা বেসিন এবং পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বরফাবৃত হ্রদ ভস্তক লেকের অববাহিকাসহ বেশ কয়েকটি অঞ্চল আগে থেকেই বিজ্ঞানীদের পরিচিত ছিল। তবে নতুন গবেষণা বলছে, এগুলো আলাদা ইতিহাস বহনকারী পৃথক অববাহিকা নয়; বরং একই টেকটোনিক প্রক্রিয়ায় গড়ে ওঠা বৃহত্তর ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর অংশ।
ফলে পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার ভূগর্ভস্থ মানচিত্র সম্পর্কে গবেষকদের ধারণায় বড় পরিবর্তন এসেছে।
কীভাবে তৈরি হলো এই বিশাল কাঠামো
গবেষকদের প্রধান ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘ডিস্ট্রিবিউটেড রোটেশনাল এক্সটেনশন’ নামে পরিচিত একটি ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই কাঠামো তৈরি হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় মহাদেশীয় ভূত্বক একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন দিকে ধীরে ধীরে প্রসারিত হয়।
এর ফলে একাধিক ফল্ট লাইনের মাঝখানে পাখার মতো বা হাতের আঙুল ছড়িয়ে দেওয়ার মতো আকৃতির V-আকৃতির অববাহিকা তৈরি হয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবীতে এ ধরনের ভূত্বকীয় প্রসারণের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে ভালোভাবে সংরক্ষিত উদাহরণগুলোর একটি হতে পারে এই অঞ্চল।
![]()
গন্ডোয়ানার ভাঙনের নতুন সূত্র
প্রায় ১৮ কোটি বছর আগে গন্ডোয়ানা নামে পরিচিত সুপারকন্টিনেন্ট ভাঙতে শুরু করে। সেই সময় অ্যান্টার্কটিকা, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও ভারত একই ভূখণ্ডের অংশ ছিল। পরে প্রায় সাত কোটি বছর আগে অ্যান্টার্কটিকা ও অস্ট্রেলিয়া আলাদা হয়ে যায়।
গবেষকদের ধারণা, নতুন আবিষ্কৃত এই পাখা-আকৃতির অববাহিকা ব্যবস্থা ওই বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে। এটি ভূত্বককে দুর্বল করে ভবিষ্যৎ বিভাজনের পথ সহজ করে দিয়েছিল। যদিও এর সুনির্দিষ্ট সময়কাল এখনও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
বরফস্তরের ভবিষ্যৎ বোঝার নতুন সুযোগ
দীর্ঘদিন ধরে পূর্ব অ্যান্টার্কটিকাকে পৃথিবীর সবচেয়ে স্থিতিশীল ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু নতুন গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে, অতীতে এই অঞ্চলে ধারণার চেয়ে অনেক বেশি ভূত্বকীয় পরিবর্তন ঘটেছিল।
এই আবিষ্কারের গুরুত্ব শুধু অতীতের ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়। বরফের নিচের ভূপ্রকৃতি আজও হিমবাহের চলাচল এবং বরফপ্রবাহের দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে এই ধরনের ভূগর্ভস্থ কাঠামো সম্পর্কে বিস্তারিত জানা গেলে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রভাবে অ্যান্টার্কটিকার বরফস্তর কীভাবে পরিবর্তিত হতে পারে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কতটা বাড়তে পারে—সেসব পূর্বাভাস আরও নির্ভুল করা সম্ভব হবে।
তবে গবেষকদের মতে, এই বিশাল কাঠামো ঠিক কখন সৃষ্টি হয়েছিল এবং কোন কোন ভূতাত্ত্বিক শক্তি এর পেছনে কাজ করেছে, তা এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। ভবিষ্যতে আরও উন্নত ভূকম্পন জরিপ, ভূতাত্ত্বিক মডেল এবং বরফের নিচের বিস্তৃত মানচিত্র তৈরির মাধ্যমে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হবে।
অ্যান্টার্কটিকার বরফের গভীরে লুকিয়ে থাকা এই নতুন আবিষ্কার আবারও মনে করিয়ে দিল, পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি গবেষণা হওয়া এবং সবচেয়ে দুর্গম অঞ্চলগুলোর মধ্যেও এখনও এমন বহু রহস্য রয়েছে, যা উন্মোচিত হওয়ার অপেক্ষায়।
অ্যান্টার্কটিকার বরফের নিচে আবিষ্কৃত বিশাল ভূগর্ভস্থ কাঠামো পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা নিয়ে গবেষণায় নতুন দিগন্ত খুলেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















