দীর্ঘদিন ধরে ভারতকে বিশ্বের ‘ফার্মেসি’ বলা হয়েছে মূলত একটি কারণে—কম দামে মানসম্মত জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনের সক্ষমতা। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে শুধু সস্তায় ওষুধ বানানোর ক্ষমতা নয়, বরং নতুন ওষুধ আবিষ্কারের সক্ষমতা। সাম্প্রতিক কয়েকটি সাফল্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, ভারতীয় ওষুধশিল্প হয়তো সেই কঠিন কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পথেই এগোতে শুরু করেছে।
বিশ্বজুড়ে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ এখন অন্যতম বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি। বহু সংক্রমণে প্রচলিত ওষুধ আর কার্যকর থাকছে না। বিশেষ করে গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর নতুন অ্যান্টিবায়োটিকের অভাব চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন বাস্তবতায় ভারতের একটি প্রতিষ্ঠান নিজস্ব গবেষণা, উন্নয়ন ও বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে নতুন রাসায়নিক সত্তাভিত্তিক অ্যান্টিবায়োটিক বাজারে আনতে সক্ষম হয়েছে। এটি শুধু একটি ওষুধের সাফল্য নয়; এটি একটি শিল্পের মানসিকতার পরিবর্তনের প্রতীক।
দীর্ঘ সময় ধরে বৈশ্বিক ওষুধশিল্পে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবন ছিল অনাকর্ষণীয় ক্ষেত্র। কারণ অর্থনৈতিক হিসাব এখানে অন্যরকম। ক্যানসার বা ডায়াবেটিসের ওষুধের মতো বছরের পর বছর ব্যবহার হয় না অ্যান্টিবায়োটিকের। বরং কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিককে যত কম ব্যবহার করা যায়, ততই ভালো, যাতে প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত তৈরি না হয়। ফলে গবেষণায় বিপুল বিনিয়োগ করেও বাজার থেকে প্রত্যাশিত মুনাফা পাওয়া কঠিন। এ কারণেই বিশ্বের বহু বড় ওষুধ কোম্পানি ধীরে ধীরে এই ক্ষেত্র থেকে সরে গেছে।
এই শূন্যতার মধ্যেই ভারতীয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নতুন পথ দেখাতে শুরু করেছে। তারা শুধু বিদ্যমান ওষুধের বিকল্প তৈরি করছে না; বরং সম্পূর্ণ নতুন বৈজ্ঞানিক ধারণার ওপর ভিত্তি করে ওষুধ আবিষ্কারের ঝুঁকি নিচ্ছে। একসময় যে ধরনের গবেষণা মূলত ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা কেন্দ্রেই সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তার একটি অংশ বেঙ্গালুরু বা মুম্বাইয়ের গবেষণাগারেও হচ্ছে। এটি ভারতের গবেষণা সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য শুধু বৈজ্ঞানিক নয়, সামাজিকও। নতুন ওষুধ যখন উন্নত দেশগুলোতে আবিষ্কৃত হয়, তখন তা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে পৌঁছাতে প্রায়ই বহু বছর লেগে যায়। উচ্চমূল্য, সীমিত বাজার এবং জটিল নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া এই বিলম্বের অন্যতম কারণ। ফলে যেসব দেশে সংক্রমণের বোঝা সবচেয়ে বেশি, সেখানকার রোগীরাই নতুন চিকিৎসা থেকে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হন।
ভারতের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। কারণ ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় বাজার প্রায়ই ভারত নিজেই, এরপর আসে এশিয়া, আফ্রিকা ও অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের বাজার। এসব অঞ্চলে তাদের ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক আগে থেকেই গড়ে উঠেছে। ফলে নতুন কোনো ওষুধ উদ্ভাবিত হলে সেটি অপেক্ষাকৃত দ্রুত সেইসব মানুষের কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়, যাদের এটির প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।

এই বাস্তবতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ওষুধ-প্রতিরোধী সংক্রমণের বড় বোঝা বহন করছে ভারতসহ বহু উন্নয়নশীল দেশ। কিছু ব্যাকটেরিয়ার ক্ষেত্রে প্রতিরোধের হার ইতোমধ্যে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। উদ্ভাবক এবং রোগী যখন একই ভৌগোলিক বাস্তবতার অংশ হন, তখন গবেষণাগার থেকে হাসপাতাল পর্যন্ত পথটি তুলনামূলকভাবে ছোট হয়ে আসে। বৈশ্বিক দক্ষিণে জন্ম নেওয়া উদ্ভাবনের সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই।
তবে কয়েকটি সাফল্যকে স্থায়ী রূপ দিতে হলে গবেষণাবান্ধব পরিবেশ আরও শক্তিশালী করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, অণুজীববিজ্ঞান গবেষণাগার, অনুবাদমূলক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং দক্ষ গবেষক তৈরির ধারাবাহিক বিনিয়োগ ছাড়া নতুন ওষুধ আবিষ্কারের ভিত্তি মজবুত হবে না। একই সঙ্গে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অবকাঠামো উন্নত করা, অনুমোদন প্রক্রিয়াকে দক্ষ ও পূর্বানুমানযোগ্য করা এবং উচ্চমানের গবেষণা কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি।
অ্যান্টিবায়োটিকের জন্য অর্থনৈতিক নীতিতেও আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। এই খাতে গবেষণার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি, অথচ সম্ভাব্য বাণিজ্যিক লাভ সীমিত। তাই শুধু বাজারের ওপর নির্ভর করলে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ আসবে না। সরকারকে এমন নীতি নিতে হবে, যা নতুন অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবনকে আর্থিকভাবে টেকসই করে তুলবে এবং গবেষকদের দীর্ঘমেয়াদি আস্থা দেবে।
তবে উদ্ভাবনই সমস্যার একমাত্র সমাধান নয়। যত নতুন অ্যান্টিবায়োটিকই আবিষ্কৃত হোক, সেগুলোর অযথা ব্যবহার চলতে থাকলে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত নতুন প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। অপ্রয়োজনীয় প্রেসক্রিপশন, নিয়ন্ত্রণহীন ওভার-দ্য-কাউন্টার বিক্রি এবং কৃষিখাতে নির্বিচার ব্যবহার শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে কার্যকর ওষুধকেও অকার্যকর করে দিতে পারে।
এই কারণেই বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তিগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। টিকাদান সংক্রমণ কমায়, ফলে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজনও কমে। নিরাপদ পানি ও উন্নত স্যানিটেশন রোগের বিস্তার রোধ করে। হাসপাতালের শক্তিশালী সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের সুরক্ষা দেয় এবং প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার সীমিত রাখে।
ভারত বহু দশক ধরে বিশ্বের কাছে সাশ্রয়ী ওষুধ সরবরাহকারী দেশ হিসেবে পরিচিত। এখন তার সামনে আরও বড় এক সুযোগ উপস্থিত হয়েছে—শুধু অন্যের আবিষ্কার উৎপাদন নয়, বরং নিজেই নতুন ওষুধ উদ্ভাবনের বৈশ্বিক কেন্দ্র হয়ে ওঠা। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জন নির্ভর করবে দুটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, গবেষণা ও উদ্ভাবনের ধারাবাহিক সক্ষমতা গড়ে তোলা। দ্বিতীয়ত, আবিষ্কৃত অ্যান্টিবায়োটিককে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা। প্রথম লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনা এখন দৃশ্যমান। দ্বিতীয়টি বাস্তবায়ন করতে পারলেই ভারতের ওষুধশিল্পের নতুন বিপ্লব সত্যিকার অর্থে পূর্ণতা পাবে।
রামানন লক্ষ্মীনারায়ণ 



















