ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মরদেহ তেহরানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জনসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়েছে। শুক্রবার রাজধানীর একটি বিশাল প্রার্থনা হলে ধর্মীয় নেতা, সরকারি কর্মকর্তা, বিদেশি প্রতিনিধি এবং হাজারো শোকাহত মানুষ তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান।
ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় নিহত হওয়ার পর খামেনির জন্য এক সপ্তাহব্যাপী রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যের আয়োজন করেছে ইরান। দেশটির কর্তৃপক্ষ এই আয়োজনকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি জনসমর্থন ও বিপ্লবী চেতনার প্রদর্শন হিসেবে তুলে ধরছে।
শেষকৃত্যের সময়সূচি
খামেনির মরদেহ প্রথমে তেহরানে রাখা হলেও পরবর্তী কয়েক দিনে তা ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর কুমে নেওয়া হবে। এরপর বুধবার ইরাকের শিয়া ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালায় শ্রদ্ধা নিবেদনের কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। সবশেষে বৃহস্পতিবার ইরানের পবিত্র নগরী মাশহাদে ইমাম রেজার মাজারের পাশে তাঁকে দাফন করা হবে।

ইসলামে সাধারণত মৃত্যুর এক দিনের মধ্যেই দাফনের বিধান থাকলেও যুদ্ধকালীন নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে শেষকৃত্য পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। গত মাসে যুদ্ধবিরতির অন্তর্বর্তী সমঝোতার পর এই কর্মসূচি নির্ধারণ করা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির শেষকৃত্য এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্ত। ইরানের নেতৃত্ব সাম্প্রতিক যুদ্ধ থেকে টিকে যাওয়াকে নিজেদের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরলেও দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ দেশটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তাঁর বাবার ওপর হামলায় আহত হওয়ার পর থেকে প্রকাশ্যে খুব কমই দেখা দিয়েছেন। একই সময়ে ইরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে এবং রাজধানীর প্রধান সড়কজুড়ে সামরিক ও পুলিশ সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে।
শেষ শ্রদ্ধায় দেশি-বিদেশি প্রতিনিধিরা

শুক্রবার প্রার্থনা হলে খামেনির কফিন তাঁর নিহত পরিবারের সদস্যদের কফিনের পাশে রাখা হয়। সেখানে রাষ্ট্রপতি, পার্লামেন্টের স্পিকার, পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব উপস্থিত ছিলেন। বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নতুন প্রধান আহমদ ভাহিদিও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
বিদেশি অতিথিদের মধ্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের উপপ্রধান হে ওয়ে, রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ এবং ইরাকের প্রেসিডেন্ট নিজার আমেদি উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া লেবাননের হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরাল্লাহ ও ইমাদ মুগনিয়েহর পরিবারের সদস্যরাও অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
শোকের আবহ ও নিরাপত্তা
তেহরানের বিভিন্ন সড়কে কালো শোকপতাকা টানানো হয়েছে। হাজারো মানুষ কাঁদতে কাঁদতে স্লোগান দেন এবং খামেনির ছবি বহন করেন। শিয়া ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে অনেকেই বুকে আঘাত করে শোক প্রকাশ করেন।

ইরানের কর্তৃপক্ষ আগামী কয়েক দিনের শোভাযাত্রায় লাখো মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পরিবহন, খাবার ও আবাসনের ব্যবস্থা করেছে। হোটেলগুলোতে ছাড় দেওয়া হয়েছে এবং স্কুল, মসজিদ ও ক্রীড়া হলগুলোতে আগত শোকাহতদের থাকার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে শেষকৃত্য চলাকালে কোনো ধরনের হামলা না চালানোর সতর্কবার্তাও দিয়েছে তেহরান।
খামেনির দাফনের মধ্য দিয়ে এক যুগের অবসান হলেও তাঁর মৃত্যুর পর ইরানের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, সেদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের নজর এখন নিবদ্ধ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















