আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তির গুরুত্ব নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি ধারণা আবারও নতুন করে সামনে এসেছে—পৃথিবী শেষ পর্যন্ত শক্তির নিয়মেই চলে। যে রাষ্ট্র শক্তিশালী, সে নিজের ইচ্ছামতো কাজ করবে; দুর্বলদের কাজ সেই বাস্তবতা মেনে নেওয়া। এই দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থকেরা প্রায়ই প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডিডিসের বিখ্যাত উক্তি উদ্ধৃত করেন: শক্তিমান যা পারে তাই করে, আর দুর্বলকে যা সহ্য করতে হয়, তা-ই সহ্য করে।
কিন্তু এই ব্যাখ্যা কি সত্যিই থুসিডিডিসের চিন্তার প্রতিফলন? নাকি তাঁর লেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা উল্টো দিকেই ইঙ্গিত করে?
থুসিডিডিসের ‘পেলোপনেশীয় যুদ্ধ’ শুধু যুদ্ধের ধারাবিবরণী নয়; এটি ক্ষমতা, নেতৃত্ব, নৈতিকতা এবং রাষ্ট্রের আত্মবিনাশের এক গভীর রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি বিখ্যাত সংলাপ উদ্ধৃত করলে মনে হতে পারে তিনি নির্মম বাস্তববাদের প্রবক্তা। কিন্তু পুরো গ্রন্থটি একসঙ্গে পড়লে ভিন্ন এক সত্য সামনে আসে। সেখানে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—অসংযত শক্তি শেষ পর্যন্ত শক্তিধরকেই বিপদে ফেলে।
এই সত্যটি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে মেলোস দ্বীপের ঘটনাকে ঘিরে। এথেন্স তখন সামরিকভাবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ছোট্ট দ্বীপ মেলোস নিরপেক্ষ থাকতে চাইলেও এথেন্স তাদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়। আলোচনায় এথেন্সের দূতেরা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, ন্যায়বিচার কেবল সমশক্তির মধ্যে কার্যকর; যেখানে শক্তির অসমতা রয়েছে, সেখানে সিদ্ধান্ত নেয় শক্তিই।
শেষ পর্যন্ত মেলোস ধ্বংস হয়। পুরুষদের হত্যা করা হয়, নারী ও শিশুদের দাসে পরিণত করা হয়। বহু পাঠকের কাছে এখানেই যেন থুসিডিডিসের বক্তব্য শেষ হয়ে যায়। কিন্তু আসলে তাঁর বর্ণনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ শুরু হয় এরপর।

মেলোসের ধ্বংসের পরই তিনি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন সিসিলি অভিযানের কাহিনি—যে অভিযান এথেন্সের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ সামরিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছিল। বিশাল সেনাবাহিনী, নৌবহর এবং সাম্রাজ্যিক আত্মবিশ্বাস নিয়ে শুরু হওয়া এই অভিযান শেষ হয় সম্পূর্ণ ধ্বংসে। রাষ্ট্রের শক্তি তখনও ছিল, কিন্তু বিচক্ষণতা হারিয়ে গিয়েছিল।
এই ধারাবাহিকতা কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়। থুসিডিডিস ইচ্ছাকৃতভাবেই দুটি ঘটনাকে পাশাপাশি রেখেছেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, মেলোসে যে অহংকার দেখা গিয়েছিল, সিসিলিতে তারই মূল্য দিতে হয়েছিল। অন্যকে দমনের উল্লাস শেষ পর্যন্ত নিজের পতনের পথ তৈরি করেছিল।
এখানেই থুসিডিডিস আধুনিক বাস্তববাদীদের অনেকের থেকে আলাদা। তিনি কখনোই বলেননি যে শক্তি অপ্রয়োজনীয়। বরং তিনি নিজেও একজন সেনাপতি ছিলেন এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষায় শক্তি প্রয়োগকে স্বাভাবিক বলে মনে করতেন। কিন্তু শক্তির ব্যবহার আর শক্তির পূজা—এই দুইয়ের মধ্যে তিনি স্পষ্ট পার্থক্য টেনেছেন।
দীর্ঘ যুদ্ধ কীভাবে একটি সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে ক্ষয় করে, সেটিও তাঁর অন্যতম বড় উদ্বেগ। যুদ্ধের শুরুতে যে এথেন্স বিচারবোধ, বিতর্ক এবং সংযমের জন্য পরিচিত ছিল, বহু বছরের সংঘাতে সেই একই রাষ্ট্র ধীরে ধীরে নিষ্ঠুরতার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। সহিংসতা তখন আর ব্যতিক্রম থাকে না; সেটিই হয়ে ওঠে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের স্বাভাবিক ভাষা।
মাইটিলিনের বিদ্রোহের সময় এথেন্স প্রথমে পুরো নগরের সব পুরুষকে হত্যা এবং নারী-শিশুদের দাস বানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু পরদিন নিজেদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে তারা সেই আদেশ প্রত্যাহার করে। অর্থাৎ তখনও সমাজের ভেতরে আত্মসমালোচনার জায়গা ছিল।
কিন্তু মেলোসের ক্ষেত্রে সেই দ্বিধা আর দেখা যায় না। সেখানে নির্মমতা যেন একেবারেই স্বাভাবিক সিদ্ধান্তে পরিণত হয়। এই পরিবর্তনই থুসিডিডিসের কাছে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়। কারণ তাঁর দৃষ্টিতে যুদ্ধ শুধু মানুষ হত্যা করে না; এটি রাষ্ট্রের চরিত্রও বদলে দেয়।
মেলোসের মানুষ আলোচনায় আরেকটি সতর্কবার্তা দিয়েছিল। তারা বলেছিল, আজ যারা অন্যের ওপর নির্দয় আচরণ করছে, একদিন তাদেরও একই পরিণতির মুখোমুখি হতে হতে পারে। তখন এথেন্স এই সতর্কতাকে গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু যুদ্ধের শেষদিকে পরিস্থিতি বদলে যায়। পরাজিত এথেন্স নিজেই আশঙ্কা করতে থাকে, বিজয়ীরা তাদের সঙ্গে সেই আচরণই করবে, যা তারা একসময় ছোট ছোট নগররাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে করেছিল।
এই কারণেই মেলোসের সংলাপ আসলে বিজয়ীদের বিজয়ের গল্প নয়; এটি বিজয়ীদের আত্মপ্রবঞ্চনার গল্প। যুদ্ধক্ষেত্রে এথেন্স জয়ী হয়েছিল, কিন্তু রাজনৈতিক বিচারে তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ পরাজয়ের বীজ বপন করেছিল।
বর্তমান বিশ্বের জন্য এই শিক্ষা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অবশ্যই শক্তির বাস্তবতা দ্বারা প্রভাবিত হয়। রাষ্ট্রগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতা ব্যবহার করবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যদি কোনো রাষ্ট্র বিশ্বাস করতে শুরু করে যে শক্তিই একমাত্র নীতি, তবে সেই বিশ্বাসই তাকে ক্রমে বিচ্ছিন্ন, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী এবং শেষ পর্যন্ত ভুল সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
ইতিহাসে বড় শক্তিগুলোর পতন খুব কম ক্ষেত্রেই কেবল বাইরের আক্রমণে ঘটেছে। অধিকাংশ সময় তারা নিজেদের সাফল্য থেকেই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছে। সেই আত্মবিশ্বাস ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে ঔদ্ধত্যে, আর ঔদ্ধত্য শেষ পর্যন্ত তাদের বিচারক্ষমতাকে দুর্বল করেছে।
থুসিডিডিসের স্থায়ী শিক্ষা এখানেই। তিনি আমাদের শেখাননি যে শক্তিমান যা খুশি তাই করতে পারে। বরং তিনি দেখিয়েছেন, শক্তিমান যদি মনে করে তার ক্ষমতার কোনো সীমা নেই, তবে সেই বিশ্বাসই তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে উঠতে পারে। ইতিহাসে সাময়িক বিজয় অনেক রাষ্ট্র অর্জন করেছে; কিন্তু স্থায়ী নেতৃত্ব টিকিয়ে রাখতে পেরেছে কেবল তারাই, যারা শক্তির পাশাপাশি সংযম, দূরদর্শিতা এবং আত্মসমালোচনার মূল্য বুঝেছিল।
জনাথন কির্শনার 



















