দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ধারণা, সুস্থ থাকতে হলে প্রতিদিন আট ঘণ্টা ঘুমানোই সবচেয়ে ভালো। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। বরং খুব কম বা খুব বেশি—দুই ধরনের ঘুমই স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের চাহিদা অনুযায়ী নিয়মিত ও মানসম্মত ঘুমই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কম ঘুমের ঝুঁকি স্পষ্ট
এক রাত ঠিকমতো ঘুম না হলে পরদিন মনোযোগ কমে যেতে পারে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল হতে পারে, মানসিক চাপ বাড়তে পারে এবং মেজাজ খিটখিটে হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব থাকলে স্মৃতিশক্তি হ্রাস, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, এমনকি অকাল মৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
তবে শুধু কম ঘুম নয়, অতিরিক্ত ঘুমও স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয় বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। গবেষকদের ভাষায়, ঘুম ও স্বাস্থ্যের মধ্যে একটি ‘ইউ’ আকৃতির সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ খুব কম বা খুব বেশি—দুই ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে, আর মাঝামাঝি সময়ের ঘুম সবচেয়ে উপকারী।
কত ঘণ্টা ঘুম সবচেয়ে উপযুক্ত?
বিভিন্ন গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১৮ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের জন্য সাধারণভাবে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুম যথাযথ। ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমই যথেষ্ট বলে মনে করা হয়।
আরেকটি বড় গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন প্রায় সাত ঘণ্টা ঘুম অধিকাংশ মানুষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী হতে পারে। তবে নিয়মিত নয় ঘণ্টার বেশি ঘুমের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে এখনও আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ওপর ঘুমের প্রভাব
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় প্রায় পাঁচ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের জৈবিক বয়সের সঙ্গে ঘুমের সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হয়েছে। এতে দেখা যায়, মস্তিষ্ক, ফুসফুস, যকৃত ও ত্বকসহ শরীরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রবণতা রয়েছে।
গবেষণার ফল অনুযায়ী, নারীদের জন্য দৈনিক প্রায় সাড়ে ছয় থেকে প্রায় আট ঘণ্টা এবং পুরুষদের জন্য প্রায় সাড়ে ছয় থেকে সাড়ে সাত ঘণ্টার মধ্যে ঘুম সবচেয়ে উপকারী হতে পারে। এই সময়ের কম বা বেশি ঘুম শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে।

শুধু সময় নয়, ঘুমের মানও গুরুত্বপূর্ণ
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ঘুমের সময়ই সবকিছু নয়। ঘুম কতটা গভীর, নিয়মিত এবং নিরবচ্ছিন্ন হচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তাদের মতে, গবেষণার গড় ফলাফল প্রত্যেক মানুষের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য নাও হতে পারে। কারও শরীরের চাহিদা অন্যের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট একটি সংখ্যা নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই।
ঘুম নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তাও ক্ষতিকর
আরেকটি জরিপে দেখা গেছে, অনেক মানুষ ঘুম না হওয়ার চিন্তায়ই ঘুম হারিয়ে ফেলেন। অর্থাৎ ঘুম নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ নিজেই নতুন সমস্যা তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, শরীরের সংকেতকে গুরুত্ব দিন। সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি সতেজ ও স্বাভাবিক অনুভব করেন, তাহলে সেটিই আপনার জন্য উপযুক্ত ঘুমের ইঙ্গিত। সাধারণভাবে প্রতিদিন ছয় থেকে আট ঘণ্টার মধ্যে নিয়মিত ও মানসম্মত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলাই সবচেয়ে ভালো।
ঘুমের সময় নিয়ে অযথা উদ্বিগ্ন না হয়ে, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করাই সুস্থ থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
স্বাস্থ্যকর ঘুমের অভ্যাস গড়তে প্রতিদিন কত ঘণ্টা ঘুম দরকার? নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে কম ও বেশি ঘুম—দুই ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যঝুঁকির তথ্য।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















