চার দশকেরও বেশি সময় ধরে অ্যান্টার্কটিকার বরফময় ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকা বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো ও একসময় সবচেয়ে বড় হিমশৈল শেষ পর্যন্ত গলে সমুদ্রের পানিতে মিশে গেছে। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে বরফ পানিতে পরিণত হলেও এ হিমশৈলের বিদায়কে জলবায়ু পরিবর্তন, মেরু অঞ্চলের ভবিষ্যৎ এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য নিয়ে নতুন করে আলোচনার কারণ হিসেবে দেখছেন গবেষকেরা।
বিশালত্বের এক অনন্য প্রতীক
হিমশৈলটি একসময় প্রায় ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৯০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল। এর আয়তন অনেক বড় শহরের চেয়েও বেশি ছিল। প্রায় এক ট্রিলিয়ন টন ওজনের এই বরফখণ্ডের প্রায় ৪০ মিটার পানির ওপরে থাকলেও আরও প্রায় ৪০০ মিটার অংশ ছিল সমুদ্রের নিচে। সমতল সাদা বিস্তৃতি দিগন্তজুড়ে ছড়িয়ে থাকায় এটি ছিল এক অনন্য প্রাকৃতিক দৃশ্য।
জন্মের পর দীর্ঘ অপেক্ষা
১৯৮৬ সালে অ্যান্টার্কটিকার একটি বরফস্তর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর হিমশৈলটি সমুদ্রতলে আটকে যায়। প্রায় ৩০ বছরেরও বেশি সময় এটি প্রায় একই স্থানে অবস্থান করে। একই সময়ে এর সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হওয়া অন্য দুটি বিশাল হিমশৈল উত্তর দিকে ভেসে গিয়ে অনেক আগেই গলে বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু এটি দীর্ঘদিন অত্যন্ত শীতল পরিবেশে আটকে থাকায় টিকে ছিল।
২০২০ সালে সামান্য গলতে শুরু করলে সমুদ্রতলের কাদা থেকে ধীরে ধীরে মুক্ত হয়ে এটি নতুন যাত্রা শুরু করে। এরপর সমুদ্রস্রোত ও প্রবল বাতাসের প্রভাবে উত্তর-পূর্ব দিকে ভেসে যেতে থাকে।
সমুদ্রযাত্রায় নতুন চ্যালেঞ্জ
যাত্রাপথে একসময় এটি শক্তিশালী ঘূর্ণায়মান সমুদ্রস্রোতের মধ্যে আটকে পড়ে। প্রায় আট মাস ধরে প্রতিদিন ধীরে ধীরে ঘুরতে থাকে বিশাল বরফখণ্ডটি। এ সময় এর প্রান্তে বড় বড় ফাটল, খিলান ও গুহার মতো গঠন তৈরি হয়। উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে নিয়মিত বড় বড় অংশ ভেঙে পড়তে থাকে এবং এর আকার দ্রুত ছোট হতে শুরু করে।
শেষ পর্যন্ত এটি জন্মের সময়কার আকারের প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। এরপর ধীরে ধীরে আরও ভেঙে গিয়ে সম্পূর্ণভাবে সমুদ্রে মিশে যায়।

বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ
হিমশৈলটি বহু বছর ধরেই বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্র ছিল। বিভিন্ন গবেষণা অভিযানে এর গলিত পানির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। উপগ্রহ, দূর অনুধাবন প্রযুক্তি এবং ড্রোনের মাধ্যমে নিয়মিত এর অবস্থান, আকার, তাপমাত্রা ও পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
তবে হিমশৈলটি নিজস্ব আবহাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে অনেক সময় পর্যবেক্ষণকেও কঠিন করে তুলেছিল। তবু এর প্রতিটি পরিবর্তন নিবিড়ভাবে অনুসরণ করা হয়েছে।
প্রকৃতির জন্য ক্ষতি নাকি উপকার
এত বড় একটি হিমশৈলের বিলীন হওয়া নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। একদল মনে করেন, বিপুল পরিমাণ মিঠাপানি সমুদ্রে মিশে গেলে সামুদ্রিক পরিবেশের লবণাক্ততার ভারসাম্য বদলে যেতে পারে। এতে ক্রিল, প্ল্যাঙ্কটন, সিল, পেঙ্গুইনসহ বিভিন্ন প্রাণীর খাদ্যচক্র সাময়িকভাবে প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পাশাপাশি সমুদ্রতল ঘষে যাওয়ার সময় প্রবাল, স্পঞ্জসহ ছোট সামুদ্রিক প্রাণীর আবাসস্থলও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অন্যদিকে অনেক গবেষকের মতে, এমন বিশাল বরফখণ্ডের ভাঙনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে বরফে আটকে থাকা পুষ্টি উপাদান সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে অণুজীব ও উদ্ভিদজাত প্ল্যাঙ্কটনের বৃদ্ধি বাড়ে, যা পুরো সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থাৎ, এই বিলীন হওয়া একই সঙ্গে ক্ষতি ও নতুন জীবনের সম্ভাবনা—দুই দিকই বহন করে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতীক
বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো এই হিমশৈলের বিদায় শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনার সমাপ্তি নয়। এটি উষ্ণ হতে থাকা সমুদ্র, পরিবর্তিত জলবায়ু এবং অ্যান্টার্কটিকার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন উদ্বেগও সামনে নিয়ে এসেছে। বরফের পানিতে ফিরে যাওয়া প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম হলেও, এই পরিবর্তনের গতি ভবিষ্যতে পৃথিবীর মেরু অঞ্চলের জন্য কী বার্তা বহন করছে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
মেরু অঞ্চলের ৪০ বছরের পুরোনো বিশ্বের বৃহত্তম হিমশৈল গলে বিলীন হয়েছে। জলবায়ু, সমুদ্রের প্রাণবৈচিত্র্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়ছে নতুন আলোচনা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















