দক্ষিণ এশিয়ার দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী পাকিস্তান ও ভারতের সম্পর্ক আজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে রাজনৈতিক অচলাবস্থা, সামরিক উত্তেজনা এবং কৌশলগত অবিশ্বাস একে অপরকে আরও জটিল করে তুলছে। গত এক দশকে নয়াদিল্লির নীতিগত অবস্থান ছিল ইসলামাবাদের সঙ্গে কার্যত সব ধরনের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ সীমিত রাখা। কূটনৈতিক সংলাপ থেকে শুরু করে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক বিনিময় কিংবা জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ—সবই সংকুচিত হয়েছে। এর পাশাপাশি একাধিক সামরিক সংঘর্ষ দুই দেশের সম্পর্কে নতুন মাত্রার অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।
অথচ একই সময়ে বিশ্বরাজনীতির মানচিত্র দ্রুত বদলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আলোচনার পথে ফিরেছে। ওয়াশিংটন ও বেইজিংও তাদের প্রতিযোগিতাকে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে রাখার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে। এমন আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় দক্ষিণ এশিয়ার দুই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র যদি সংঘাতকেই একমাত্র পথ হিসেবে ধরে রাখে, তাহলে তার মূল্য শুধু তাদের নিজেদের নয়, পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তাকেও দিতে হবে।
পাকিস্তান-ভারত সম্পর্কের সংকট নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই পারস্পরিক অবিশ্বাস, জম্মু ও কাশ্মীর প্রশ্নের অমীমাংসিত অবস্থা, সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ নিয়ে পারস্পরিক অভিযোগ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা—এই চারটি উপাদান সম্পর্ককে নিয়মিতভাবে অস্থির রেখেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করার ভারতের সিদ্ধান্ত এই সংকটকে আরও গভীর করেছে।
বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দুই দেশ এমন এক পরিস্থিতিতে অবস্থান করছে যেখানে সামরিক উত্তেজনা যেকোনো সময় বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে। ২০২৫ সালের সামরিক অভিযানের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি না হওয়ায় কার্যত একটি অমীমাংসিত সংঘাতের পরিবেশ বিদ্যমান। তার ওপর উভয় দেশই উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও সশস্ত্র ড্রোনের মতো দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল অস্ত্র ব্যবস্থার অধিকারী। এমন অবস্থায় ভুল হিসাব, ভুল তথ্য বা সীমিত সংঘর্ষও মুহূর্তের মধ্যে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
এই বাস্তবতায় সংকট মোকাবিলার জন্য কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য। বর্তমানে দুই দেশের সেনাবাহিনীর মহাপরিচালকদের সাপ্তাহিক যোগাযোগই কার্যত একমাত্র আনুষ্ঠানিক সংযোগ। কিন্তু এত বড় নিরাপত্তা ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে এটুকু যথেষ্ট নয়। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ, উচ্চ কমিশনারদের পুনর্বহাল এবং জরুরি পরিস্থিতির জন্য পৃথক কূটনৈতিক যোগাযোগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা উত্তেজনা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে কেবল সংকট ব্যবস্থাপনাই যথেষ্ট নয়; দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংলাপেরও বিকল্প নেই। অতীতে অনানুষ্ঠানিক ব্যাকচ্যানেল আলোচনার মাধ্যমে কাশ্মীর ইস্যুতে একটি সম্ভাব্য সমঝোতার কাঠামো তৈরি হয়েছিল। যদিও তা বাস্তবায়িত হয়নি, তবু সেই অভিজ্ঞতা দেখায় যে আনুষ্ঠানিক আলোচনার বাইরে বিকল্প কূটনৈতিক পথও কার্যকর হতে পারে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে পানি বণ্টন নিয়ে একটি পৃথক ব্যাকচ্যানেল চালু করা সময়োপযোগী উদ্যোগ হতে পারে।
সিন্ধু পানি চুক্তি ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতি এখন দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়গুলোর একটি। পাকিস্তানের দৃষ্টিতে এই চুক্তি একতরফাভাবে স্থগিত করার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। ইসলামাবাদের আশঙ্কা, পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোতে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভারত বাস্তবে বিদ্যমান পানি ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে চাইছে। অন্যদিকে ভারত নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ এবং সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদের অভিযোগকে এই অবস্থানের পেছনের কারণ হিসেবে তুলে ধরছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, সিন্ধু, ঝেলাম ও চেনাব নদীর পানি পাকিস্তানের কোটি মানুষের জীবন, কৃষি ও অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে এই প্রশ্নে যেকোনো একতরফা পদক্ষেপ সহজেই সামরিক উত্তেজনায় রূপ নিতে পারে। যদি ভারত সত্যিই জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন বা পরিবেশগত বাস্তবতার কারণে চুক্তিতে সংশোধন চায়, তাহলে প্রথমে বিদ্যমান চুক্তির কার্যকারিতা পুনর্বহাল করে আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের পথ অনুসন্ধান করাই অধিক গ্রহণযোগ্য হবে।
বিশ্বাস পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও দুই দেশের সামনে কিছু বাস্তবসম্মত সুযোগ রয়েছে। ধর্মীয় তীর্থযাত্রা, চিকিৎসার জন্য যাতায়াত, বিভক্ত পরিবারের পুনর্মিলন কিংবা সীমিত জনগণের যোগাযোগ পুনরায় চালু হলে পারস্পরিক বৈরিতা কিছুটা হলেও কমতে পারে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো অভিন্ন চ্যালেঞ্জ দুই দেশের সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। জ্বালানি সংযোগ, আঞ্চলিক অবকাঠামো এবং বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক উদ্যোগও দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সম্পর্কের ইতিবাচক ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে।
এক্ষেত্রে আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রশ্নও নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্ম দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা প্রশমনের একটি সম্ভাব্য মাধ্যম ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও পারস্পরিক সন্দেহ সেই কাঠামোকেও দুর্বল করেছে। যদি আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্র সংকুচিত হতে থাকে, তাহলে নতুন কৌশলগত সমীকরণ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক হবে না।
তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বাধা রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। যদি কোনো পক্ষ নীতিগতভাবেই সংলাপ থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্তে অটল থাকে, তাহলে সম্পর্কের ব্যবধান আরও বাড়বে। সেই বাস্তবতায় পাকিস্তানের সামনে একদিকে যেমন আলোচনার সম্ভাবনা খোলা রাখা জরুরি, অন্যদিকে সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকির জন্য প্রস্তুত থাকাও প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সুশাসন, নীতির ধারাবাহিকতা এবং আঞ্চলিক সংযোগ জোরদার করা তার দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলো সংঘাতকে স্থায়ী বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেবে, নাকি প্রতিযোগিতার মধ্যেও সংলাপের জন্য ন্যূনতম রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করবে। কারণ পারমাণবিক যুগে যুদ্ধের মূল্য শুধু বিজয় বা পরাজয়ে নির্ধারিত হয় না; অনেক সময় তার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় শান্তির সম্ভাবনাটিই হারিয়ে যাওয়ায়।
আইজাজ আহমদ চৌধুরী 



















