০৯:১৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬
কাবুলে পানির সংকট নিয়ে জাতিসংঘের সতর্কতা, শহরের ভবিষ্যৎ উন্নয়নও ঝুঁকিতে ‘দ্য ওডিসি’ প্রচারে দেবী-প্রেরণার সাজে জেনডায়া, ফ্যাশনে চরিত্রের ভাষা কঙ্গোয় ইবোলা চিকিৎসায় প্রথম ট্রায়াল শুরু, ১৪০০ জন আক্রান্ত অং সান সু চির সঙ্গে দেখা করতে দিল না মিয়ানমার জান্তা থাই বিমানসেবিকার মাধ্যমে হেরোইন পাচার, উৎস মিয়ানমার সন্দেহ পঁচিশ বছর পর তাইওয়ান সেনায় ফিরল কমিউনিস্ট বিরোধী শিক্ষা আমির খানের ব্যক্তিগত আয়োজনে বিয়ে, গৌরী স্প্রাটের সঙ্গে নতুন অধ্যায় এআই এখনো বাস্তব পৃথিবী বোঝে না, গবেষকদের নতুন সতর্কবার্তা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যু, বাংলা সাহিত্য ও চিন্তাজগতে শূন্যতা তাইওয়ানের পূর্বে চীনা কোস্টগার্ডের দ্বিতীয় টহল, তাইপের প্রতিবাদ

ভারতের নারী কৃষকদের স্বীকৃতি: আইনের পরিবর্তন কি বদলাবে বাস্তবতা?

কৃষিকাজে নারীর অংশগ্রহণ নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা বীজ বপন করেছেন, চারা রোপণ করেছেন, ফসল কেটেছেন, গবাদিপশু লালন করেছেন এবং পরিবারের খাদ্যব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছেন। কিন্তু এই দীর্ঘ শ্রমের ইতিহাসে একটি মৌলিক প্রশ্ন বারবার উপেক্ষিত হয়েছে—যে নারী জমিতে কাজ করেন, তিনি কি রাষ্ট্রের চোখে কৃষক?

ভারতের গ্রামীণ বাস্তবতা দেখায়, কৃষিকাজের মেরুদণ্ড হয়ে ওঠা অসংখ্য নারী এখনও আইনি পরিচয়, সম্পত্তির অধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এই বৈপরীত্য শুধু সামাজিক অবিচারের নয়; এটি কৃষি অর্থনীতি ও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণেরও একটি বড় ব্যর্থতা।

মহারাষ্ট্রের যবতমাল জেলার উষা কুটের জীবন সেই বাস্তবতারই প্রতীক। ঋণের চাপে আত্মহত্যা করা স্বামীর রেখে যাওয়া অল্প জমি নিয়ে তার সংগ্রাম শুরু হয়েছিল পরিবার থেকেই। জমিতে ছিল না সেচ, ছিল না বিদ্যুৎ। বহু বাধা অতিক্রম করে উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হলেও বাজারদরের চাপে সেই সাফল্যের বড় অংশ হারিয়ে যায়। তবু দীর্ঘ সংগ্রামের পর জমিই তার জীবিকার ভিত্তি এবং আত্মমর্যাদার উৎস হয়ে ওঠে।

কিন্তু উষার গল্প ব্যতিক্রম। অধিকাংশ নারী কৃষকের জীবন প্রতিদিন অনিশ্চয়তা, ঋণের চাপ এবং সামাজিক অবমূল্যায়নের সঙ্গে লড়াই করেই এগোয়। তাদের শ্রম দৃশ্যমান হলেও তাদের পরিচয় অদৃশ্য।

Rights, justice, action for India's women farmers - The Hindu

ভারতের গ্রামাঞ্চলে পুরুষদের উল্লেখযোগ্য অংশ কাজের সন্ধানে শহরমুখী হওয়ায় কৃষির দায়িত্ব ক্রমশ নারীদের কাঁধে এসে পড়েছে। তারা শুধু জমি চাষ করেন না; গবাদিপশু পালন, বীজ সংরক্ষণ এবং পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তাও নিশ্চিত করেন। অথচ জমির মালিকানার প্রশ্নে নারীরা এখনও প্রান্তিক। বিপুল সংখ্যক নারী কৃষিকাজে যুক্ত থাকলেও অল্পসংখ্যকের নামে কৃষিজমি নিবন্ধিত।

এই বৈষম্যের প্রভাব বহুমাত্রিক। জমির মালিকানা না থাকলে ব্যাংকঋণ পাওয়া কঠিন হয়, ফসল বিমার সুবিধা মেলে না, সরকারি সহায়তা কিংবা ক্ষতিপূরণের অর্থও অনেক সময় প্রকৃত চাষির হাতে পৌঁছায় না। অর্থাৎ যে নারী মাঠে ঘাম ঝরান, রাষ্ট্রের নথিতে তিনি প্রায়শই অদৃশ্য।

এ কারণেই নারী কৃষকদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির প্রশ্নটি কেবল প্রতীকী নয়; এটি অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন। রাষ্ট্র কাকে কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তার ওপর নির্ভর করে কে ঋণ পাবে, কে বীমার আওতায় আসবে, কে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা ভোগ করবে এবং সংকটের সময় কার পাশে প্রশাসন দাঁড়াবে।

এই বাস্তবতার পরিবর্তনে মহারাষ্ট্রের সাম্প্রতিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি রাজ্য নারী কৃষকদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার লক্ষ্যে আইন পাস করেছে। কৃষিকাজের পাশাপাশি মৌচাষ, মৎস্যচাষ, পশুপালন এবং বনজ পণ্য সংগ্রহের মতো সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডেও যুক্ত নারীদের এই স্বীকৃতির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

Empowering Women Farmers and Promoting Climate Resilience in Indian  Agriculture

এই আইন একদিনে বৈষম্যের অবসান ঘটাবে—এমন দাবি করা যাবে না। এটি নারীদের হাতে জমির মালিকানা তুলে দিচ্ছে না, কিংবা কৃষিতে বিদ্যমান পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোকেও ভেঙে ফেলছে না। কিন্তু রাষ্ট্র যখন প্রথমবারের মতো নারীর কৃষিশ্রমকে স্বীকৃতি দেয়, তখন সেটি ভবিষ্যতের নীতিগত পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করে।

সমাজে বহু পরিবর্তনের শুরু হয়েছে স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে। গৃহস্থালির অবৈতনিক শ্রম নিয়ে যেমন একসময় আলোচনা ছিল না, আজ সেটি জননীতির আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে। নারী কৃষকদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, যদি এই স্বীকৃতি বাস্তব নীতিতে রূপ নেয়।

ভারতের কৃষি ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় নারীকে প্রান্তে রেখে এগোনোর সুযোগ আর নেই। কৃষিক্ষেত্রে তাদের অবদান কেবল উৎপাদনের নয়; গ্রামীণ অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতারও ভিত্তি। তাই নারী কৃষকদের স্বীকৃতি কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি দীর্ঘদিনের একটি অসমতা সংশোধনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।

প্রকৃত পরিবর্তন তখনই আসবে, যখন আইনের স্বীকৃতির সঙ্গে যুক্ত হবে জমির অধিকার, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। কারণ কৃষকের পরিচয় শুধু মাঠে কাজ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; রাষ্ট্রের কাছে সমান মর্যাদা পাওয়ার মধ্যেই তার পূর্ণতা।

জনপ্রিয় সংবাদ

কাবুলে পানির সংকট নিয়ে জাতিসংঘের সতর্কতা, শহরের ভবিষ্যৎ উন্নয়নও ঝুঁকিতে

ভারতের নারী কৃষকদের স্বীকৃতি: আইনের পরিবর্তন কি বদলাবে বাস্তবতা?

০৭:০০:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬

কৃষিকাজে নারীর অংশগ্রহণ নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা বীজ বপন করেছেন, চারা রোপণ করেছেন, ফসল কেটেছেন, গবাদিপশু লালন করেছেন এবং পরিবারের খাদ্যব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছেন। কিন্তু এই দীর্ঘ শ্রমের ইতিহাসে একটি মৌলিক প্রশ্ন বারবার উপেক্ষিত হয়েছে—যে নারী জমিতে কাজ করেন, তিনি কি রাষ্ট্রের চোখে কৃষক?

ভারতের গ্রামীণ বাস্তবতা দেখায়, কৃষিকাজের মেরুদণ্ড হয়ে ওঠা অসংখ্য নারী এখনও আইনি পরিচয়, সম্পত্তির অধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এই বৈপরীত্য শুধু সামাজিক অবিচারের নয়; এটি কৃষি অর্থনীতি ও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণেরও একটি বড় ব্যর্থতা।

মহারাষ্ট্রের যবতমাল জেলার উষা কুটের জীবন সেই বাস্তবতারই প্রতীক। ঋণের চাপে আত্মহত্যা করা স্বামীর রেখে যাওয়া অল্প জমি নিয়ে তার সংগ্রাম শুরু হয়েছিল পরিবার থেকেই। জমিতে ছিল না সেচ, ছিল না বিদ্যুৎ। বহু বাধা অতিক্রম করে উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হলেও বাজারদরের চাপে সেই সাফল্যের বড় অংশ হারিয়ে যায়। তবু দীর্ঘ সংগ্রামের পর জমিই তার জীবিকার ভিত্তি এবং আত্মমর্যাদার উৎস হয়ে ওঠে।

কিন্তু উষার গল্প ব্যতিক্রম। অধিকাংশ নারী কৃষকের জীবন প্রতিদিন অনিশ্চয়তা, ঋণের চাপ এবং সামাজিক অবমূল্যায়নের সঙ্গে লড়াই করেই এগোয়। তাদের শ্রম দৃশ্যমান হলেও তাদের পরিচয় অদৃশ্য।

Rights, justice, action for India's women farmers - The Hindu

ভারতের গ্রামাঞ্চলে পুরুষদের উল্লেখযোগ্য অংশ কাজের সন্ধানে শহরমুখী হওয়ায় কৃষির দায়িত্ব ক্রমশ নারীদের কাঁধে এসে পড়েছে। তারা শুধু জমি চাষ করেন না; গবাদিপশু পালন, বীজ সংরক্ষণ এবং পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তাও নিশ্চিত করেন। অথচ জমির মালিকানার প্রশ্নে নারীরা এখনও প্রান্তিক। বিপুল সংখ্যক নারী কৃষিকাজে যুক্ত থাকলেও অল্পসংখ্যকের নামে কৃষিজমি নিবন্ধিত।

এই বৈষম্যের প্রভাব বহুমাত্রিক। জমির মালিকানা না থাকলে ব্যাংকঋণ পাওয়া কঠিন হয়, ফসল বিমার সুবিধা মেলে না, সরকারি সহায়তা কিংবা ক্ষতিপূরণের অর্থও অনেক সময় প্রকৃত চাষির হাতে পৌঁছায় না। অর্থাৎ যে নারী মাঠে ঘাম ঝরান, রাষ্ট্রের নথিতে তিনি প্রায়শই অদৃশ্য।

এ কারণেই নারী কৃষকদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির প্রশ্নটি কেবল প্রতীকী নয়; এটি অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন। রাষ্ট্র কাকে কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তার ওপর নির্ভর করে কে ঋণ পাবে, কে বীমার আওতায় আসবে, কে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা ভোগ করবে এবং সংকটের সময় কার পাশে প্রশাসন দাঁড়াবে।

এই বাস্তবতার পরিবর্তনে মহারাষ্ট্রের সাম্প্রতিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি রাজ্য নারী কৃষকদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার লক্ষ্যে আইন পাস করেছে। কৃষিকাজের পাশাপাশি মৌচাষ, মৎস্যচাষ, পশুপালন এবং বনজ পণ্য সংগ্রহের মতো সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডেও যুক্ত নারীদের এই স্বীকৃতির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

Empowering Women Farmers and Promoting Climate Resilience in Indian  Agriculture

এই আইন একদিনে বৈষম্যের অবসান ঘটাবে—এমন দাবি করা যাবে না। এটি নারীদের হাতে জমির মালিকানা তুলে দিচ্ছে না, কিংবা কৃষিতে বিদ্যমান পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোকেও ভেঙে ফেলছে না। কিন্তু রাষ্ট্র যখন প্রথমবারের মতো নারীর কৃষিশ্রমকে স্বীকৃতি দেয়, তখন সেটি ভবিষ্যতের নীতিগত পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করে।

সমাজে বহু পরিবর্তনের শুরু হয়েছে স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে। গৃহস্থালির অবৈতনিক শ্রম নিয়ে যেমন একসময় আলোচনা ছিল না, আজ সেটি জননীতির আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে। নারী কৃষকদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, যদি এই স্বীকৃতি বাস্তব নীতিতে রূপ নেয়।

ভারতের কৃষি ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় নারীকে প্রান্তে রেখে এগোনোর সুযোগ আর নেই। কৃষিক্ষেত্রে তাদের অবদান কেবল উৎপাদনের নয়; গ্রামীণ অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতারও ভিত্তি। তাই নারী কৃষকদের স্বীকৃতি কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি দীর্ঘদিনের একটি অসমতা সংশোধনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।

প্রকৃত পরিবর্তন তখনই আসবে, যখন আইনের স্বীকৃতির সঙ্গে যুক্ত হবে জমির অধিকার, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। কারণ কৃষকের পরিচয় শুধু মাঠে কাজ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; রাষ্ট্রের কাছে সমান মর্যাদা পাওয়ার মধ্যেই তার পূর্ণতা।