দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা সেওংসু বা হংদে নয়, বরং স্থানীয়দের কাছে সবচেয়ে প্রিয় অনেক খাবারের ঠিকানা লুকিয়ে আছে পুরোনো আবাসিক অ্যাপার্টমেন্টের নিচের বাণিজ্যিক আর্কেডে। কোরিয়ান ভাষায় যেগুলো পরিচিত ‘সাংগা’ নামে। কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা এসব ছোট রেস্তোরাঁ ও দোকানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারের চেয়ে বেশি মূল্য পায় নিয়মিত ক্রেতাদের আস্থা এবং দীর্ঘদিনের সুনাম।
এই ধরনের সাংগার সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণগুলোর একটি সিউলের ইউনমা অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স। প্রায় অর্ধশতাব্দী পুরোনো এই আবাসিক এলাকা পুনর্নির্মাণ পরিকল্পনার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। ৪ হাজার ৪২৪টি আবাসিক ইউনিটের পাশাপাশি এখানে রয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৬০০ বর্গমিটারজুড়ে বিস্তৃত একটি বাণিজ্যিক আর্কেড, যেখানে প্রায় ৪০০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে বহু খাবারের দোকান কয়েক দশক ধরে স্থানীয়দের কাছে সমান জনপ্রিয়।
স্থানীয় কোরিয়ান খাবারের স্বাদ খুঁজতে দ্য কোরিয়া হেরাল্ড ঘুরে দেখেছে এই সাংগার তিনটি দীর্ঘদিনের জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান।
উইগিম আজেওশি: রাস্তার খাবারের পরিচিত ঠিকানা
সাংগার এ ব্লকের ৬৫ নম্বর দোকানে অবস্থিত ‘উইগিম আজেওশি’, যার অর্থ ‘ভাজা খাবারের কাকা’। দুপুরের খাবারের সময় দোকানটিতে শিক্ষার্থী, কর্মজীবী, অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘ সারি চোখে পড়ে।
এখানে মূল আকর্ষণ কোরিয়ার জনপ্রিয় ‘বুনসিক’ বা রাস্তার খাবার। ৫ হাজার ওনের কম দামে পাওয়া যায় স্কুইড, চিংড়ি, ডাম্পলিং, মিষ্টি আলু ও সি-উইড রোলের ভাজা পদ। একই দামে পরিবেশন করা হয় জনপ্রিয় ত্তকবোক্কিও।
প্রথমে একটি স্কুলের সামনে ফুড ট্রাক হিসেবে যাত্রা শুরু করা এই ব্যবসা ২০১৬ সালে ইউনমা সাংগায় আসে। দোকানটির সহ-স্বত্বাধিকারী পার্ক কি-জুন ২০১৭ সালে একটি জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠানে ত্তকবোক্কি তৈরির দক্ষতার জন্যও পরিচিতি পান।
ধীর প্রক্রিয়ায় তৈরি পিজ্জার জনপ্রিয়তা
উইগিম আজেওশির ঠিক বিপরীতে রয়েছে ‘পিজ্জা এন’বানে’। দোকানটির নাম এসেছে ধীরে ধীরে ময়দা মাখার কৌশল থেকে। এখানে হাতে তৈরি হয় পিজ্জার ডো, আর সসের জন্য টমেটোও প্রস্তুত করা হয় নিজস্ব পদ্ধতিতে।
অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই এটি আশপাশের বাসিন্দা ও দেচি-দং এলাকার শিক্ষার্থীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ‘মিটম্যানিয়া’ পিজ্জা সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়, যাতে পেপারোনি, বেকন ও চেডার চিজ সস ব্যবহার করা হয়।
মিয়ানমারের কর্মী থুতা মিন জানান, শুরুতে অল্প কয়েকজন কর্মী নিয়ে ব্যবসা শুরু হলেও ক্রেতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও কর্মী যুক্ত করতে হয়েছে। আশপাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়া শিক্ষার্থীরাই এই দোকানের বড় একটি ক্রেতাগোষ্ঠী।

স্থানীয় উদ্যোক্তার কফিশপ
খাবারের পর কফির জন্য জনপ্রিয় আরেকটি ঠিকানা ‘ইউনমা কফি’। ড্রিপ কফি, ক্রিম কফি ও সল্ট কফির জন্য পরিচিত এই ক্যাফে বিভিন্ন ধরনের কফি বিন ব্যবহার করে স্বতন্ত্র স্বাদের পানীয় তৈরি করে।
ক্যাফের মালিক লি বো-রা এই এলাকাতেই বড় হয়েছেন। তাঁর পরিবারের ব্যবসাও কয়েক দশক ধরে এখানেই ছিল। ২০২০ সালে কফি রোস্টারি চালুর পর প্রায় দেড় বছর আগে তিনি ক্যাফে চালু করেন। তাঁর ভাষায়, পাশের জনপ্রিয় খাবারের দোকানের দীর্ঘ অপেক্ষমাণ লাইনের ক্রেতাদের কথা ভেবেই এই অবস্থান বেছে নেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি তুলনামূলক কম ভাড়াও একটি বড় সুবিধা।
এক ছাদের নিচে স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতি
সাংগায় শুধু রেস্তোরাঁ নয়, পাওয়া যায় প্রতিদিনের খাবারের জন্য প্রয়োজনীয় নানা ধরনের ‘বানচান’ বা কোরিয়ান সাইড ডিশও। ১০ হাজার ওনে চার ধরনের বানচান কেনা যায়। মিষ্টি আলুর সালাদ, জাপচে, ভাজা অ্যাঙ্কোভি, ডিমের রোলসহ রয়েছে নানা বিকল্প।
এ ছাড়া প্রায় চার দশক ধরে ‘জিওন’ বা কোরিয়ান প্যানকেক বিক্রি করে আসছে কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী দোকান। মাংস, মাছ, সবজি ও কিমচি দিয়ে তৈরি এসব খাবার দৈনন্দিন খাবারের পাশাপাশি উৎসব ও পারিবারিক অনুষ্ঠানেও সমান জনপ্রিয়।
মৌসুমি ফলের মধ্যেও বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে কোরিয়ায় উদ্ভাবিত ‘শিনবি’ পিচ, যাকে ‘হোয়াইট নেকটারিন’ও বলা হয়। নরম খোসা ও মিষ্টি রসের জন্য পরিচিত এই ফল পাওয়া যায় মাত্র জুনের মাঝামাঝি থেকে জুলাইয়ের শুরু পর্যন্ত প্রায় দুই সপ্তাহ।
হারিয়ে যেতে বসেছে এক ঐতিহ্য
দক্ষিণ কোরিয়ায় বড় বড় আবাসিক কমপ্লেক্সের সাংগা বহু বছর ধরে স্থানীয় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রয়োজনীয় কেনাকাটা থেকে শুরু করে পারিবারিক খাবার—সবকিছুর কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল এসব আর্কেড।
ইউনমা অ্যাপার্টমেন্টের পুনর্নির্মাণ কাজ ২০৩০ সালের দিকে শুরু হওয়ার কথা। নতুন ভবনে অনেক দোকান ফিরলেও বর্তমানের গোলকধাঁধার মতো করিডর আর কয়েক দশকের পুরোনো পরিবেশ হয়তো আর ফিরে আসবে না। সিউলের পুরোনো আবাসিক এলাকা একে একে নবায়ন হওয়ায় এই ধরনের সাংগাও ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে। তবে জামসিল, আপগুজিয়ং ও ইয়েওইদোর কয়েকটি পুরোনো অ্যাপার্টমেন্টে এখনো সেই ঐতিহ্যের কিছুটা অস্তিত্ব টিকে আছে।
সিউলের পুরোনো অ্যাপার্টমেন্টের নিচের সাংগায় দশকের পর দশক ধরে স্থানীয়দের প্রিয় খাবারের দোকানগুলো এখনো কোরিয়ার দৈনন্দিন খাদ্যসংস্কৃতির জীবন্ত স্মৃতি বহন করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















