কোনো দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি শুধু অবকাঠামো, বিনিয়োগ বা শিল্পায়ন নয়; তার প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। যে শিক্ষা একটি প্রজন্মকে শুধু ডিগ্রি দেয়, কিন্তু পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলানোর সক্ষমতা দেয় না, সেই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত জাতীয় অগ্রগতির পথেও বাধা হয়ে দাঁড়ায়। একবিংশ শতাব্দীর অর্থনীতি এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে কর্মসংস্থানের সীমানা আর জাতীয় ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়। ফলে শিক্ষাব্যবস্থাকেও স্থানীয় চাকরির প্রস্তুতির বাইরে গিয়ে বৈশ্বিক কর্মবাজারের উপযোগী মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্য গ্রহণ করতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের মতো শ্রীলঙ্কার শিক্ষাব্যবস্থাও পরীক্ষাকেন্দ্রিক সংস্কৃতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। শিক্ষার্থীর সাফল্যকে মাপা হয় পরীক্ষার ফল, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কিংবা মুখস্থভিত্তিক জ্ঞানের মাধ্যমে। এই কাঠামো কিছু ক্ষেত্রে একাডেমিক মান বজায় রাখতে সহায়ক হলেও বাস্তব জীবনের দক্ষতা, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে। এর ফল হিসেবে অনেক শিক্ষিত তরুণ কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের পর দেখতে পান, তাঁদের অর্জিত জ্ঞান এবং নিয়োগকর্তাদের প্রত্যাশার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে।
এদিকে কর্মসংস্থানের বৈশ্বিক মানচিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, রোবোটিকস, ডিজিটাল যোগাযোগ ও তথ্যনির্ভর অর্থনীতি নতুন ধরনের দক্ষতার চাহিদা তৈরি করেছে। বহু প্রচলিত পেশার চরিত্র বদলে গেছে, আবার অসংখ্য নতুন পেশার জন্ম হয়েছে। এই বাস্তবতায় কেবল পাঠ্যবইভিত্তিক জ্ঞান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সৃজনশীলতা, অভিযোজনের সক্ষমতা এবং দলগতভাবে কাজ করার দক্ষতা।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষাক্রমে প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দিতে হবে। কম্পিউটার ব্যবহার জানা এখন আর বাড়তি যোগ্যতা নয়; এটি মৌলিক প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের অল্প বয়স থেকেই কোডিং, তথ্য বিশ্লেষণ, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মৌলিক ধারণা এবং ডিজিটাল যোগাযোগের দক্ষতা শেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে। প্রযুক্তিকে শুধু একটি বিষয় হিসেবে নয়, শেখার একটি মাধ্যম হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এতে শিক্ষার্থীরা শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, নতুন উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা হওয়ার সক্ষমতাও অর্জন করবে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের জন্য ভাষাগত দক্ষতার গুরুত্বও সমানভাবে বিবেচনা করা জরুরি। ইংরেজি আজও আন্তর্জাতিক ব্যবসা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রধান ভাষা। অথচ বহু শিক্ষার্থী দীর্ঘ শিক্ষাজীবন শেষ করেও কার্যকরভাবে ইংরেজিতে যোগাযোগ করতে পারে না। ফলে আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। ভাষা শিক্ষায় ব্যাকরণের পাশাপাশি বাস্তব যোগাযোগ, উপস্থাপনা, পেশাগত লেখালেখি এবং আলোচনায় অংশগ্রহণের সক্ষমতার ওপর জোর দিতে হবে।
একই সঙ্গে তথাকথিত ‘সফট স্কিল’ বা মানবিক দক্ষতার মূল্যও আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। যোগাযোগ, নেতৃত্ব, সময় ব্যবস্থাপনা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, সহযোগিতামূলক কাজ এবং জটিল পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এখন কর্মক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা। এসব দক্ষতা কেবল পাঠ্যবই পড়ে অর্জন করা যায় না। বিতর্ক, দলীয় প্রকল্প, সামাজিক উদ্যোগ, নেতৃত্ব কর্মসূচি ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে এগুলো বিকশিত হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হওয়া উচিত কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে। বহু সমাজে এখনও বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিকেই একমাত্র সাফল্যের পথ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু আধুনিক অর্থনীতিতে দক্ষ প্রযুক্তিবিদ, স্বাস্থ্যকর্মী, প্রকৌশলী, ডিজিটাল বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন পেশাভিত্তিক কর্মীর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা গড়ে তোলা গেলে শিক্ষার্থীরা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনও আগে থেকেই বুঝতে পারবে।

ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে সবাই চাকরি করবে—এমন ধারণাও আর বাস্তবসম্মত নয়। অনেক তরুণ নিজেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, নতুন ব্যবসা গড়ে তুলবে কিংবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক উদ্যোগে যুক্ত হবে। তাই আর্থিক সাক্ষরতা, ব্যবসা পরিকল্পনা, বাজার বিশ্লেষণ এবং উদ্ভাবন ব্যবস্থাপনা শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া উচিত। উদ্যোক্তা মানসিকতা গড়ে তোলা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করে।
শিক্ষা মূল্যায়নের পদ্ধতিও নতুনভাবে ভাবতে হবে। শুধু লিখিত পরীক্ষার নম্বর একজন শিক্ষার্থীর সামগ্রিক সক্ষমতা প্রকাশ করে না। গবেষণা, ব্যবহারিক কাজ, উপস্থাপনা, প্রকল্পভিত্তিক মূল্যায়ন এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর দক্ষতা যাচাই করলে শেখার মানও উন্নত হবে এবং মুখস্থনির্ভর প্রবণতাও কমবে।
এই রূপান্তরের কেন্দ্রে রয়েছেন শিক্ষকরা। আধুনিক শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করলেই পরিবর্তন আসবে না, যদি শিক্ষকরা পুরোনো পদ্ধতিতে পড়াতে বাধ্য হন। তাঁদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ এবং সমসাময়িক শিক্ষাদর্শ সম্পর্কে ধারাবাহিক দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্ব এখন ক্রমেই আন্তঃসংযুক্ত। তাই শিক্ষার্থীদের শুধু নিজ দেশের বাস্তবতা নয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, পরিবেশ, সংস্কৃতি এবং বহুসাংস্কৃতিক কর্মপরিবেশ সম্পর্কেও সচেতন করে তুলতে হবে। বৈচিত্র্যের সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা আজ আন্তর্জাতিক কর্মবাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা।
একই সঙ্গে শিক্ষানীতি প্রণয়নে শিল্পখাত, পেশাজীবী সংগঠন এবং নিয়োগকর্তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। শ্রমবাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষাক্রম নিয়মিত হালনাগাদ না হলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া সনদধারীরা বাস্তব অর্থনীতির সঙ্গে বিচ্ছিন্নই থেকে যাবে।
শ্রীলঙ্কার বিনামূল্যের শিক্ষা ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক অর্জন। কিন্তু অতীতের সাফল্য ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নয়। প্রযুক্তিনির্ভর, প্রতিযোগিতামূলক এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির যুগে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে দক্ষতা, উদ্ভাবন, অভিযোজন এবং বাস্তব সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দেয়। শিক্ষায় এই পরিবর্তন কেবল পাঠ্যক্রম সংশোধনের বিষয় নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এবং আগামী প্রজন্মের সম্ভাবনা নির্ধারণের কৌশলগত বিনিয়োগ।
সাহান উইরাসুরিয়া 



















