মাত্র পাঁচ মাস বয়সে শ্রবণপ্রতিবন্ধকতা ধরা পড়েছিল। স্কুলজীবনে বারবার ভুল বোঝাবুঝি, একাকীত্ব আর নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতাকেই শক্তিতে পরিণত করে এখন বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বৃত্তি অর্জন করেছেন সিঙ্গাপুরের তরুণ নাট্যকর্মী জেড ও। আগামী সেপ্টেম্বরে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা শুরু করবেন। তাঁর লক্ষ্য, নাটক ও চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী মানুষের পরিচয়, অধিকার এবং অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা।
প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে বেড়ে ওঠার গল্প
জেড জানান, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় প্রায়ই এমন হতো যে শিক্ষক শ্রেণিকক্ষ পরিবর্তনের ঘোষণা দিলেও তিনি তা শুনতে পেতেন না। বিরতির পর খালি শ্রেণিকক্ষে ফিরে এসে পরে বুঝতেন, পুরো ক্লাস অন্য কক্ষে চলে গেছে। এমন অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে বহুবার ঘটেছে।
শ্রবণযন্ত্র ব্যবহার করলেও তা তাঁর জন্য সব সময় স্বস্তিদায়ক ছিল না। বরং আশপাশের শব্দ বেড়ে যাওয়ায় মানুষের কথা বোঝা আরও কঠিন হয়ে পড়ত। শেষ পর্যন্ত কলেজজীবন শেষ হওয়ার পর তিনি শ্রবণযন্ত্র ব্যবহার বন্ধ করে দেন। এরপর ঠোঁটের নড়াচড়া দেখে কথা বোঝার দক্ষতা গড়ে তোলেন, যদিও এর জন্য সব সময় বক্তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো।
একাকীত্ব থেকে আত্মবিশ্বাসের পথে
জেডের বাবা জানান, মেয়েকে স্কুলে দীর্ঘ সময় একা কাটাতে হতো। বিরতির সময় অন্যরা যখন বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাত, তখন জেড প্রায়ই একাই থাকতেন। তবে কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সহযোগিতা তাঁকে মানসিকভাবে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।
মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। প্রথমে চলচ্চিত্র নির্মাণ, পরে আলোকচিত্র, ক্যালিগ্রাফি এবং নাটকের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। মোবাইল ফোনে ছোট চলচ্চিত্র নির্মাণ থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে তিনি গল্প বলার জগতে নিজের জায়গা তৈরি করেন।
নাটকের মঞ্চে খুঁজে পেলেন নিজের কণ্ঠ
শুরুতে অভিনয়ে অংশ নিতে দ্বিধা ছিল। নিজের উচ্চারণ নিয়ে আত্মবিশ্বাসের অভাব তাঁকে পিছিয়ে রাখত। পরে বন্ধুদের উৎসাহে তিনি নাট্যচর্চায় আরও সক্রিয় হন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যবিদ্যাকে পড়াশোনার বিষয় হিসেবে বেছে নেন।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি প্রতিবন্ধী ও ভিন্ন সক্ষমতার শিল্পীদের জন্য পরিচালিত একটি বিশেষ নাট্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে যোগ দেন। নিয়মিত মহড়া, পড়াশোনা এবং ব্যক্তিগত সংগ্রামের মধ্যে দিয়েই তিনি নিজেকে গড়ে তোলেন। কঠোর পরিশ্রমের ফল হিসেবে একের পর এক নাটকে অভিনয় এবং নাট্যরচনা করার সুযোগ পান।
সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর চেষ্টা
জেডের লেখা অন্যতম আলোচিত নাটকে একজন শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর চোখে সমাজের প্রত্যাশা, শিক্ষাজীবনের চাপ এবং আত্মপরিচয়ের সংকট তুলে ধরা হয়েছে। এই প্রযোজনা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রদর্শিত হচ্ছে, যাতে তরুণদের মধ্যে অন্তর্ভুক্তি ও সহমর্মিতার বার্তা পৌঁছে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে অসাধারণ শিক্ষাগত সাফল্যের জন্য তিনি একাধিক সম্মাননা অর্জন করেছেন। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী তরুণদের পেশাগত উন্নয়নে পরামর্শদাতা হিসেবেও কাজ করছেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি জনসচেতনতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের উদ্যোগে অংশ নিচ্ছেন।
অক্সফোর্ডে নতুন লক্ষ্য
মর্যাদাপূর্ণ বৃত্তি অর্জনের মাধ্যমে জেড এখন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী পরিচয় এবং নাটক ও চলচ্চিত্রের নান্দনিকতা নিয়ে উচ্চতর গবেষণা করবেন। পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে প্রতিবন্ধী শিল্পীদের নেতৃত্ব বিকাশ, শিল্পচর্চায় সমান সুযোগ সৃষ্টি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে কাজ করার আশা প্রকাশ করেছেন।
জেডের ভাষায়, প্রতিবন্ধী মানুষ শুধু দর্শক হয়ে থাকবে না, বরং নেতৃত্বের আসনেও তাদের সমানভাবে এগিয়ে আসার সময় এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















