সিঙ্গাপুরে কয়েক শ অভিবাসী শ্রমিক মাসের পর মাস বেতন না পেয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশি শ্রমিকও। বেতন না পাওয়ায় অনেকেই ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়েছেন, আর পরিবারের খরচ চালাতে স্বজনদের ধারদেনার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এই সংকটের কারণে শুধু শ্রমিকরাই নয়, তাঁদের পরিবারও আর্থিক ও মানসিক চাপের মুখে পড়েছে। বিভিন্ন সামাজিক ও শ্রমিক সহায়তা সংস্থা ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ালেও অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।
বেতন না পেয়ে ভেঙে পড়েছেন শ্রমিকরা
প্রায় ৪০০ অভিবাসী শ্রমিক কয়েক মাস ধরে বেতন না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। তাঁরা তিনটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন, যেগুলোর পরিচালনা একই ব্যক্তির অধীনে ছিল। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত চালাচ্ছে।
ভারতের শ্রমিক কান্ধা সামি রাগুপাথি প্রায় ২৭ বছর ধরে সিঙ্গাপুরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। আট মাস আগে নতুন প্রতিষ্ঠানে যোগ দিলেও শেষ তিন মাস ধরে কোনো বেতন পাননি। মাসে তিনি যে অর্থ উপার্জন করতেন, তার বড় অংশই দেশে থাকা দুই মেয়ের জন্য পাঠাতেন। এখন পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে উল্টো তাঁর মেয়েরাই তাঁকে টাকা পাঠিয়ে সহায়তা করছেন।
তিনি জানান, পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়েই বিদেশে এসেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের পরও বেতন না পাওয়ায় সেই স্বপ্ন আজ অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
বাংলাদেশি শ্রমিকদের দুর্ভোগ
বাংলাদেশি শ্রমিক ইসলাম মোহাম্মদ রাফিউল মাত্র ছয় মাস আগে সিঙ্গাপুরে কাজের উদ্দেশ্যে যান। সেখানে চাকরি পেতে তাঁকে প্রায় ১৩ হাজার ডলার দালালকে দিতে হয়েছে। মাসে ৮০০ থেকে ৮৫০ ডলার বেতন পেলেও গত তিন মাস ধরে কোনো অর্থ পাননি।
পরিবারে বাবা-মা, দাদা-দাদি এবং ছোট দুই ভাইবোনের দায়িত্ব তাঁর ওপরও ছিল। আগে প্রতি মাসে দেশে টাকা পাঠালেও এখন তা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। পরিবারের দুশ্চিন্তা বাড়বে ভেবে নিজের বর্তমান সংকটের কথাও তাঁদের জানাননি।
আরেক বাংলাদেশি শ্রমিক হুসাইন মোহাম্মদ সাব্বির ব্যবসায় প্রশাসনে পড়াশোনা ছেড়ে বিদেশে কাজের জন্য আসেন। তিনিও চাকরি পাওয়ার জন্য ১৩ হাজার ডলার খরচ করেন। কিন্তু সিঙ্গাপুরে আসার পর থেকে একদিনের বেতনও পাননি।
তিনি জানান, প্রতিদিন প্রায় ১৫ ঘণ্টা কাজ করতেন এবং মাত্র চার ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ মিলত। কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে ভালো আয়ের আশা করলেও বাস্তবে কোনো বেতনই পাননি। পরিবারের খরচ চালাতে বাধ্য হয়ে বন্ধুদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে দেশে টাকা পাঠাতে হয়েছে।
ঋণের ফাঁদে পরিবার

বেতন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক শ্রমিকের পরিবার ঋণ করে জীবনযাপন করছে। ভারতের আরেক শ্রমিক জয়শঙ্কর বিনোথকুমারের তিন মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। তাঁর স্ত্রী আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের কাছ থেকে ধার নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন।
পরিবারের বিভিন্ন প্রয়োজনে নেওয়া ঋণের পরিমাণ এখন প্রায় ২০ হাজার ডলারে পৌঁছেছে। এমনকি বোনের বিয়ের খরচ জোগাতে পরিবারকে অতিরিক্ত ঋণ নিতে হয়েছে এবং তাঁর স্ত্রী নিজের গয়নাও বিক্রি করেছেন।
সহায়তার হাত বাড়িয়েছে বিভিন্ন সংস্থা
সংকটে পড়া শ্রমিকদের সহায়তায় বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন, সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এগিয়ে এসেছে। ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের জন্য চাকরি খোঁজার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন কর্মী নিয়োগের লক্ষ্যে সাক্ষাৎকারও নিচ্ছে।
কিছু শ্রমিককে নগদ অর্থ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ভাউচার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দাতব্য উদ্যোগের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা সংগ্রহ করে ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
নতুন কাজের অপেক্ষায় শ্রমিকরা
অভিবাসী শ্রমিকদের অনেকেই এখন নতুন কর্মসংস্থানের আশায় দিন গুনছেন। তাঁদের আশা, দ্রুত নতুন চাকরি পেলে পরিবারকে আবার আর্থিকভাবে সহায়তা করতে পারবেন এবং দীর্ঘদিনের সংকট কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন।
বিদেশে উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করা এসব শ্রমিকের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো নিয়মিত কাজ, প্রাপ্য বেতন এবং পরিবারের মুখে আবারও স্বস্তির হাসি ফিরিয়ে আনা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















