শিশু ও কিশোরদের জন্য নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ গড়ে তুলতে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কঠোর নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয়। বরং পরিবার, শিক্ষা, সচেতনতা এবং দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তোলাই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান—এমন মতই উঠে এসেছে তরুণদের এক আলোচনা থেকে।
আলোচনায় অংশ নেওয়া তরুণরা বলেন, বর্তমান প্রজন্ম অনলাইন ঝুঁকি, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য সম্পর্কে আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন। তাই তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে ভবিষ্যতের নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন।
মোবাইলের সহজ প্রাপ্তি থেকে আসক্তির শুরু
এক তরুণ নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানান, ছোটবেলায় পরিবারের কাছ থেকে মোবাইল ফোন পাওয়ার পর কোনো ধরনের ব্যবহারবিধি বা সীমাবদ্ধতা ছিল না। ফলে পড়াশোনা ও ঘুমের সময় বাদ দিয়েও তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটাতে শুরু করেন।
তিনি বলেন, শুরুতে বিষয়টি যে আসক্তিতে রূপ নিচ্ছে, তা তিনি নিজেও বুঝতে পারেননি। পরে পড়াশোনার ফল খারাপ হতে থাকে এবং অনিদ্রার সমস্যাও দেখা দেয়। তখন তিনি নিজেই পরিবারের সহায়তায় মোবাইল ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ করেন।
তরুণদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান
আলোচনায় অংশ নেওয়া তরুণদের মতে, শিশু ও কিশোরদের জন্য বয়সভিত্তিক ধাপে ধাপে অনলাইন প্রবেশাধিকার নির্ধারণ করা সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার চেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে। এতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক ও সামাজিক যোগাযোগও বজায় রাখা সম্ভব হবে।
তাদের মতে, আইন গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটি একা সমস্যার সমাধান করতে পারে না। পরিবারের সদস্যদেরও প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতন হতে হবে, যাতে তারা সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতে পারেন।
অভিভাবকদের ডিজিটাল শিক্ষা প্রয়োজন
আলোচনায় অংশ নেওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, অনেক অভিভাবক মনে করেন সন্তানরা অনলাইনের ঝুঁকি সম্পর্কে কিছুই বোঝে না। বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন। তরুণরা ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে জানে, তবে তারা দায়িত্বশীলভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করার জন্য পরিবারের সহযোগিতা ও বিশ্বাসও চায়।

এক শিক্ষার্থী জানান, শুরুতে পরিবারের কঠোর মোবাইল ব্যবহারের নিয়ম নিয়ে তার সঙ্গে মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল। পরে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে এমন একটি ব্যবস্থা করা হয়, যা নিরাপত্তা বজায় রাখার পাশাপাশি তার প্রয়োজনও পূরণ করেছে।
সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর জোর
অংশগ্রহণকারীদের মতে, নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজ—সব পক্ষের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। ক্ষতিকর অনলাইন কার্যক্রম দ্রুত মোকাবিলা, শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং দায়িত্বশীল ডিজিটাল সংস্কৃতি গড়ে তুলতে একসঙ্গে কাজ করাই সবচেয়ে কার্যকর পথ।
তাদের বিশ্বাস, শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকলেও প্রতিটি পরিবারের বাস্তবতা আলাদা। তাই অভিভাবক ও সন্তানের মধ্যে নিয়মিত আলোচনা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই প্রযুক্তি ব্যবহারের সঠিক ভারসাম্য তৈরি করা সম্ভব।
অনলাইন জগৎ প্রতিদিনই আরও বিস্তৃত হচ্ছে। তাই প্রযুক্তি থেকে শিশুদের পুরোপুরি দূরে রাখার পরিবর্তে নিরাপদ, সচেতন ও দায়িত্বশীল ব্যবহার শেখানোই ভবিষ্যতের সবচেয়ে কার্যকর বিনিয়োগ বলে মনে করছেন আলোচনায় অংশ নেওয়া তরুণরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















