মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এলান গ্রিনস্প্যানের মৃত্যু শুধু একজন অর্থনীতিবিদের বিদায় নয়, বরং একটি যুগের অবসানও। ১০০ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু বিশ্ব অর্থনীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা, স্বাধীনতা এবং বাজার ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘদিনের বিশ্বাসকে নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ এনে দিয়েছে।
দীর্ঘ সময় ধরে তিনি এমন এক কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছিলেন, যা রাজনৈতিক প্রভাব থেকে দূরে থেকে পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করেছে। একই সঙ্গে তাঁর অর্থনৈতিক দর্শন যেমন প্রশংসা পেয়েছে, তেমনি পরবর্তী সময়ে তীব্র সমালোচনারও মুখে পড়েছে।
স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন যুগ
গ্রিনস্প্যানের সবচেয়ে বড় অবদান হিসেবে বিবেচিত হয় আধুনিক স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারণাকে শক্তিশালী করা। তাঁর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার চেষ্টা হয়, যেখানে রাজনৈতিক চাপের পরিবর্তে অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও পেশাদার বিশ্লেষণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এই মডেল পরে বিশ্বের বহু দেশে অনুসরণ করা হয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে রাজনৈতিক স্বাধীনতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি, আর সেই ধারণা প্রতিষ্ঠায় গ্রিনস্প্যানের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সংকটে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার নজির
গ্রিনস্প্যানের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংকটে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য পরিচিত হয়ে ওঠে। বিশেষ করে শেয়ারবাজারে বড় ধাক্কা বা আর্থিক অস্থিরতার সময় তিনি দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন।
১৯৯০-এর দশকে তিনি বেকারত্বের হার অনেক নিচে নেমে গেলেও তাৎক্ষণিকভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়বে—এমন প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, মজুরি উন্নতি এবং স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা সম্ভব হয়েছিল বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।
প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির পরিবর্তনও তিনি দ্রুত বুঝতে পেরেছিলেন। উৎপাদনশীলতার নতুন ধারা সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন সে সময়ের অনেক প্রচলিত অর্থনৈতিক মডেলের চেয়ে এগিয়ে ছিল।
যেখানে বড় ভুল করেছিলেন
তবে তাঁর অর্থনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা প্রকাশ পায় নতুন শতাব্দীর শুরুতে। যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রবাহ এবং আর্থিক খাতের ঝুঁকি যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়াকে অনেকেই তাঁর বড় ভুল হিসেবে দেখেন।
তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বাস করতেন, বাজার নিজেই নিজের ভুল সংশোধন করতে সক্ষম। কিন্তু সেই ধারণাই পরবর্তী সময়ে আর্থিক ব্যবস্থার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট তাঁর সেই বিশ্বাসকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলে।
সংকটের পর তিনি নিজেও স্বীকার করেছিলেন, বাজারের আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সম্পর্কে তাঁর ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলেনি।
উত্তরাধিকার থেকে কী শেখার আছে
গ্রিনস্প্যানের জীবন ও কর্ম একদিকে দেখিয়েছে শক্তিশালী, স্বাধীন এবং পেশাদার কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেন প্রয়োজন। অন্যদিকে তাঁর অভিজ্ঞতা এটাও মনে করিয়ে দেয় যে শুধু বাজারের ওপর অন্ধ বিশ্বাস রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
আজকের বিশ্বে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বাধীনতা নানা ধরনের রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে। একই সময়ে আর্থিক খাতের কার্যকর তদারকির প্রয়োজনীয়তাও আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
তাই গ্রিনস্প্যানের উত্তরাধিকার কেবল তাঁর সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর ভুলগুলোও ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারকদের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে থাকবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















