পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসোর সঙ্গে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবার নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর ফ্রান্স তাদের সব কূটনীতিককে দেশে ফিরিয়ে নিয়েছে। একই সঙ্গে পারস্পরিক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে বুরকিনা ফাসোর কূটনৈতিক কর্মকর্তাদেরও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফ্রান্স ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ শুধু দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেই নয়, পুরো সাহেল অঞ্চলের ভূরাজনীতিতেও নতুন প্রভাব ফেলতে পারে।
সম্পর্ক ছিন্নের পর পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ
গত মাসে বুরকিনা ফাসোর অন্তর্বর্তী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্রান্সের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দেয়। দেশটির অভিযোগ, ফ্রান্স এখনও ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে বের হতে পারেনি এবং বিভিন্ন নাশকতামূলক নেটওয়ার্ক ও সশস্ত্র গোষ্ঠীকে পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে।
এর জবাবে ফ্রান্স অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করে এবং সেগুলোকে ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করে। পরে উভয় দেশই কূটনৈতিক পর্যায়ে পারস্পরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যার ফলে দুই দেশের কূটনীতিকদের নিজ নিজ দেশে ফিরে যেতে হয়।

ক্রমেই দূরে সরে যায় দুই দেশ
২০২২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওরে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ফ্রান্স ও বুরকিনা ফাসোর সম্পর্ক দ্রুত অবনতির দিকে যেতে শুরু করে।
নতুন সরকার ফ্রান্সের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বন্ধ করে দেয়। এর পরের বছর দেশটিতে অবস্থানরত ফরাসি সেনাদের প্রত্যাহার করা হয়। পরে ফরাসি রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করা হয় এবং প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত কর্মকর্তাদেরও দেশ ছাড়তে বলা হয়। গত বছর আরও কয়েকজন ফরাসি কূটনীতিককে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশ ত্যাগের নির্দেশ দেয় বুরকিনা ফাসো।
সাহেল অঞ্চলে ফ্রান্সের প্রভাব কমছে
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাহেল অঞ্চলের একাধিক দেশে সামরিক অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমূল বদলে গেছে। মালি, বুরকিনা ফাসো ও নাইজারে নতুন সামরিক নেতৃত্ব ক্ষমতায় এসে ফ্রান্সের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা সীমিত বা বন্ধ করে দেয়।

একসময় এই অঞ্চলে ফ্রান্সের বড় সামরিক উপস্থিতি থাকলেও ধাপে ধাপে মালি, বুরকিনা ফাসো, নাইজার এবং পরে চাদ থেকেও তাদের সেনা প্রত্যাহার করতে হয়েছে। দীর্ঘদিনের সামরিক অভিযানের পরও নিরাপত্তা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি না হওয়ায় স্থানীয় সরকারগুলো ফ্রান্সের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
নতুন জোটের পথে তিন দেশ
মালি, বুরকিনা ফাসো ও নাইজার এখন নিজেদের মধ্যে নতুন আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করছে। তিন দেশ একসঙ্গে নতুন নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার কাঠামো গড়ে তুলেছে এবং আগের কিছু আন্তর্জাতিক কাঠামো থেকেও সরে এসেছে।
একই সঙ্গে তারা নতুন আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এর ফলে সাহেল অঞ্চলে কৌশলগত ভারসাম্য দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
ফ্রান্স ও বুরকিনা ফাসোর সাম্প্রতিক কূটনৈতিক বিরোধ তাই শুধু দুই দেশের সম্পর্কের বিষয় নয়, বরং আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে পরিবর্তিত ভূরাজনীতি, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারের নতুন বাস্তবতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















