একসময় বিশ্ব অটোমোবাইল শিল্পে নেতৃত্ব দেওয়া ইউরোপ এখন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। উৎপাদন কমছে, মুনাফা কমে যাচ্ছে, কারখানা বন্ধ হচ্ছে এবং হাজার হাজার কর্মী চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা, উচ্চ জ্বালানি ব্যয়, কঠোর পরিবেশনীতি এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে দ্রুত পরিবর্তনের কারণে ইউরোপের গাড়ি শিল্প এক অভূতপূর্ব চাপে পড়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক বড় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ব্যয় কমাতে কর্মী ছাঁটাই ও পুনর্গঠনের পথে হাঁটছে। এতে শুধু শিল্প খাতই নয়, ইউরোপের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও বাড়ছে চাপ।
সংকট কতটা গভীর?
করোনা মহামারির পর বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর সংকট এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা ইউরোপের গাড়ি শিল্পকে বড় ধাক্কা দেয়। সেই ধাক্কা পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে নির্মাতারা।

নতুন গাড়ির বিক্রি এখনও মহামারির আগের অবস্থায় ফিরতে পারেনি। একই সময়ে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি গাড়ি উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে।
এর ফলে বড় বড় নির্মাতারা উৎপাদন কমানো, কর্মী ছাঁটাই এবং বিভিন্ন কারখানায় কার্যক্রম সীমিত করার মতো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কোন দেশ?
গাড়ি শিল্প ইউরোপের অন্যতম বড় কর্মসংস্থানের উৎস। এই খাতে কোটি মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল। ফলে সংকটের প্রভাবও বিস্তৃত।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে জার্মানি। গত কয়েক বছরে দেশটিতে লক্ষাধিক চাকরি হারিয়েছে। ফ্রান্সেও গত এক দশকে গাড়ি শিল্পে কর্মসংস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ইতালিতে উৎপাদন খাতের দুর্বলতার পাশাপাশি অটোমোবাইল শিল্পেও হাজার হাজার চাকরি ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
স্পেন, চেক প্রজাতন্ত্র, স্লোভাকিয়া এবং হাঙ্গেরির মতো দেশগুলোও বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ এসব দেশের শিল্প উৎপাদনের বড় অংশই গাড়ি নির্মাণের ওপর নির্ভরশীল।
![]()
জ্বালানি ব্যয় কেন বড় সমস্যা?
ইউরোপের শিল্প খাত দীর্ঘদিন তুলনামূলক সস্তা জ্বালানির সুবিধা ভোগ করেছে। কিন্তু জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তনের পর উৎপাদন ব্যয় দ্রুত বেড়ে যায়।
গাড়ি তৈরিতে ব্যবহৃত ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, রাসায়নিক উপাদান এবং ব্যাটারি উৎপাদনে বিপুল পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন হয়। ফলে জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব পুরো উৎপাদন ব্যবস্থায় পড়েছে।
বিশেষ করে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি তৈরির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যয় ইউরোপীয় নির্মাতাদের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিয়েছে।
চীনের উত্থানে বাড়ছে প্রতিযোগিতা
বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে চীনের দ্রুত অগ্রগতি ইউরোপের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীনা নির্মাতারা কাঁচামাল থেকে ব্যাটারি উৎপাদন পর্যন্ত শক্তিশালী নিজস্ব সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। ফলে তাদের উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজারের কারণে তারা বেশি পরিমাণে উৎপাদন করতে পারছে, যা ব্যয় কমানোর পাশাপাশি প্রযুক্তিগত উন্নয়নও দ্রুত করছে।
অন্যদিকে ইউরোপে বিভিন্ন দেশের আলাদা নীতি ও বাজার কাঠামোর কারণে একই গতিতে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি শ্রম ব্যয় ও জ্বালানির উচ্চ মূল্য ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর প্রতিযোগিতা আরও কঠিন করে তুলেছে।

সবুজ নীতির বাড়তি চাপ
কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে ইউরোপ কঠোর পরিবেশনীতি গ্রহণ করেছে। আগামী বছরগুলোতে নতুন পেট্রোল ও ডিজেলচালিত গাড়ি ধাপে ধাপে বন্ধ করার পরিকল্পনার কারণে নির্মাতাদের বিপুল বিনিয়োগ করতে হচ্ছে।
নতুন ব্যাটারি কারখানা, সফটওয়্যার উন্নয়ন, উৎপাদন প্রযুক্তি এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির প্ল্যাটফর্ম তৈরিতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হলেও সেই বিনিয়োগের প্রত্যাশিত ফল এখনও পুরোপুরি আসেনি।
এদিকে বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা প্রত্যাশার তুলনায় ধীরগতিতে বাড়ায় নির্মাতারা দ্বৈত চাপের মধ্যে পড়েছেন।
ক্রেতারা কেন নতুন গাড়ি কিনছেন না?
উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ইউরোপের অনেক পরিবার বড় অঙ্কের কেনাকাটা থেকে সরে আসছে।
সুদের হার আগের তুলনায় বেশি থাকায় গাড়ির ঋণও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি নতুন গাড়ির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই পুরোনো গাড়ি ব্যবহার চালিয়ে যাচ্ছেন।
বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে চার্জিং অবকাঠামো, একবার চার্জে চলার দূরত্ব এবং ভবিষ্যৎ পুনর্বিক্রয় মূল্য নিয়ে ক্রেতাদের উদ্বেগ এখনও পুরোপুরি কাটেনি। অনেক দেশে সরকারি ভর্তুকিও কমে যাওয়ায় বিক্রি আরও ধীর হয়েছে।

সংকট মোকাবিলায় কী করছে ইউরোপ?
ইউরোপের বিভিন্ন সরকার এবং নীতিনির্ধারকেরা শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে নানা উদ্যোগ নিয়েছেন। বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ব্যাটারি উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো, চার্জিং অবকাঠামো উন্নয়ন, স্থানীয় শিল্পকে সহায়তা এবং পরিবেশবিষয়ক কিছু নিয়ম বাস্তবায়নে অতিরিক্ত সময় দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে স্থানীয় শিল্পকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে নতুন কৌশল নিয়েও আলোচনা চলছে।
ভবিষ্যতে কী হতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান ধারা দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব শুধু গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় ব্যবসা, আঞ্চলিক অর্থনীতি এবং রপ্তানি খাতও বড় ধাক্কা খাবে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ব্যাটারি প্রযুক্তিতে ইউরোপ যদি আরও পিছিয়ে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যতে এই শিল্পে তার ঐতিহ্যগত নেতৃত্ব হারানোর পাশাপাশি বিদেশি প্রযুক্তি ও আমদানির ওপর নির্ভরশীলতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















