প্রতিদিন অন্তত আট ঘণ্টা ঘুম না হলে শরীরের ক্ষতি হবে—এমন ধারণা দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ বলছে, সবার জন্য আট ঘণ্টা ঘুম বাধ্যতামূলক নয়। বরং অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে নিয়মিত সাত ঘণ্টার মানসম্মত ঘুমই সুস্থ থাকার জন্য যথেষ্ট হতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঘুমের সময় নয়, বরং ঘুমের গুণগত মান এবং নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস।
ঘুমের কাজ শুধু বিশ্রাম নয়
ঘুমের সময় শরীরে নানা গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। রাতের প্রথম ভাগে নিঃসৃত হয় গ্রোথ হরমোন, যা পেশি পুনর্গঠনে সাহায্য করে। এ সময় রক্তচাপও কমে যায়, ফলে হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালিগুলো কিছুটা বিশ্রাম পায়।
এ ছাড়া মস্তিষ্কে থাকা বিশেষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থা ঘুমের সময় সক্রিয় হয়ে ক্ষতিকর বর্জ্য অপসারণে কাজ করে। এসব কারণেই ভালো ঘুমকে সুস্বাস্থ্যের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়।
আট ঘণ্টা নয়, সাত ঘণ্টার কাছাকাছি সবচেয়ে কম ঝুঁকি
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের নির্দিষ্ট কোনো ‘জাদুকরি সংখ্যা’ নেই, যার নিচে নামলেই হঠাৎ স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যায়। বরং বহু গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মৃত্যুঝুঁকি সবচেয়ে কম থাকে সাধারণত সাত ঘণ্টার আশপাশে ঘুমানো মানুষের মধ্যে।
অন্যদিকে খুব কম ঘুমের পাশাপাশি অতিরিক্ত দীর্ঘ সময় ঘুমানোর সঙ্গেও কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ঘুমানো নিজেই ঝুঁকির কারণ নয়। অনেক ক্ষেত্রে অসুস্থতা, দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যা বা বিষণ্নতার কারণে মানুষ বেশি সময় ঘুমিয়ে থাকেন। তাই দীর্ঘ ঘুমকে সরাসরি মৃত্যুঝুঁকির কারণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
ঘুমের সময়ের চেয়ে নিয়মিত অভ্যাস বেশি গুরুত্বপূর্ণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং একই সময়ে জেগে ওঠার অভ্যাস শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
নিয়মিত ও গভীর সাড়ে ছয় ঘণ্টার ঘুম অনেক সময় অনিয়মিত, ভাঙাচোরা আট ঘণ্টার ঘুমের চেয়ে বেশি উপকার দিতে পারে। তাই শুধু ঘুমের ঘণ্টা গুনে উদ্বিগ্ন হওয়ার পরিবর্তে ঘুমের মান উন্নত করার দিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
সবার প্রয়োজন এক রকম নয়
ঘুমের প্রয়োজন বয়স, লিঙ্গ, শারীরিক পরিশ্রম, মানসিক চাপ, জীবনযাপন এবং ব্যক্তিগত শারীরিক বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হতে পারে।

কারও সাত ঘণ্টা ঘুমেই পর্যাপ্ত বিশ্রাম হয়, আবার কারও আট বা তারও বেশি সময় প্রয়োজন হতে পারে। তাই অন্যের সঙ্গে নিজের ঘুমের সময় তুলনা করার কোনো প্রয়োজন নেই।
ঘুম নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগও সমস্যা
অনেক মানুষ এখন ঘুমের সময়, ঘুমের স্কোর বা বিভিন্ন যন্ত্রের তথ্য নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তিত থাকেন। চিকিৎসকদের মতে, এই মানসিক চাপই অনেক সময় ভালো ঘুমের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
অর্থাৎ পর্যাপ্ত ঘুমের চেষ্টা করতে গিয়ে যদি উদ্বেগই বেড়ে যায়, তাহলে ঘুমের মান উল্টো খারাপ হতে পারে।
কম ঘুমের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
তবে দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিদিন ছয় ঘণ্টার কম ঘুম অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন এমন ঘুমের অভ্যাস থাকলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিভ্রংশ বা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
যদিও এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যায় না, কম ঘুম সরাসরি এই রোগের কারণ, নাকি এটি রোগের প্রাথমিক লক্ষণ। তবুও গবেষকেরা মনে করছেন, অপর্যাপ্ত ঘুম এবং মস্তিষ্কের অবক্ষয়ের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক থাকতে পারে।
বাস্তব জীবনে ভারসাম্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
কাজ, পরিবার, ব্যায়াম, সামাজিক জীবন এবং ব্যক্তিগত সময়—সবকিছু সামলাতে গিয়ে অনেকেরই প্রতিদিন একই পরিমাণ ঘুম সম্ভব হয় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঝে মধ্যে এমনটা হওয়া স্বাভাবিক।
মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নিয়মিত ভালো মানের ঘুম নিশ্চিত করা, নিজের শরীরের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া এবং ঘুম নিয়ে অযথা অপরাধবোধে না ভোগা।
স্বাস্থ্যকর জীবনের জন্য ঘুম অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। আধুনিক গবেষণার বার্তা হলো, সাত ঘণ্টার আশপাশে নিয়মিত, শান্ত ও মানসম্মত ঘুমই অধিকাংশ মানুষের জন্য যথেষ্ট হতে পারে। তাই আট ঘণ্টার সংখ্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার বদলে নিজের শরীরের সংকেত শুনে স্বাস্থ্যকর ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলাই সবচেয়ে কার্যকর পথ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















