বিশ্বজুড়ে চলমান মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার সেই ধাক্কার একটি অংশ সামাল দিচ্ছে।
প্রবৃদ্ধি কমলেও বড় ধসের আশঙ্কা নেই
আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ০ শতাংশে নেমে আসতে পারে। ২০২৭ সালে তা কিছুটা বেড়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। যদিও এই হার ২০২৪ ও ২০২৫ সালের গড় ৩ দশমিক ৫ শতাংশের তুলনায় কম, তবু আগের পূর্বাভাসের তুলনায় সামগ্রিক চিত্রে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।
তবে এই গড় হিসাবের আড়ালে দেশভেদে বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। যেসব দেশ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা বৈশ্বিক প্রযুক্তি সরবরাহ ব্যবস্থায় পিছিয়ে রয়েছে, তাদের অর্থনীতি তুলনামূলক বেশি চাপে পড়ছে।
মূল্যস্ফীতি আবারও বাড়ছে

বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি কমার যে ধারা ২০২৪ সালের শুরু থেকে দেখা গিয়েছিল, তা এখন থমকে গেছে। ২০২৬ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। ২০২৫ সালে এই হার ছিল ৪ দশমিক ১ শতাংশ। এরপর ২০২৭ সালে তা কমে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নামার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং যুদ্ধজনিত সরবরাহ সংকটই মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে।
সবচেয়ে বেশি ধাক্কায় মধ্যপ্রাচ্য
মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার অর্থনীতিই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাব বহন করছে। ২০২৬ সালে এ অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি মাত্র ০ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তবে পরিস্থিতির উন্নতি হলে ২০২৭ সালে প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
এই পূর্বাভাসের পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দীর্ঘ সময় বিঘ্নিত থাকার সম্ভাবনা এবং পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দ্রুত পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তেলনির্ভর দেশগুলোর ভিন্ন চিত্র
ইরাক, কুয়েত ও কাতারের অর্থনীতি ২০২৬ সালে সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও ২০২৭ সালে তারা আবারও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধিতে ফিরতে পারে।
সৌদি আরব তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে। বিকল্প রপ্তানি ব্যবস্থার কারণে দেশটির অর্থনীতি ২০২৬ সালে ১ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে।
অন্যদিকে ইরানের অর্থনীতি ২০২৬ সালে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। যদিও আগের তুলনায় দেশটির তেল রপ্তানির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় পরিস্থিতি প্রত্যাশার চেয়ে সামান্য ভালো বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জ্বালানি বাজারই বড় উদ্বেগ
গড় অপরিশোধিত তেলের স্পট মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৮৯ ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা আগের ধারণার তুলনায় প্রায় ৯ শতাংশ বেশি। এতে স্পষ্ট হয়েছে, যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক প্রভাব এখনো জ্বালানি বাজারের মাধ্যমেই বিশ্ব অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ছে।
এখন পর্যন্ত মজুত জ্বালানি ব্যবহার এবং বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা পরিস্থিতিকে কিছুটা সামাল দিয়েছে। তবে উৎপাদন, সরবরাহ শৃঙ্খল ও শিল্প কার্যক্রমের বিভিন্ন সূচক ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক গতি আরও দুর্বল হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বড় অর্থনীতিগুলোর চিত্র
উন্নত অর্থনীতিগুলোর সম্মিলিত প্রবৃদ্ধি ২০২৬ সালে ১ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ১ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৬ সালে ২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ২ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সরকারি ব্যয়, অনুকূল আর্থিক পরিবেশ এবং প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ এই প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করবে।
ইউরো অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি কমে ২০২৬ সালে ০ দশমিক ৯ শতাংশে নামতে পারে। যুক্তরাজ্যে একই বছরে প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ১ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে।
চীনের প্রবৃদ্ধি ২০২৬ সালে ৪ দশমিক ৬ শতাংশে ধীর হতে পারে। অন্যদিকে ভারত ৬ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল বড় অর্থনীতিগুলোর একটি হিসেবে অবস্থান ধরে রাখবে।
সামনে কী ঝুঁকি
বিশ্ব অর্থনীতির সামনে এখনো বড় অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও তীব্র হলে জ্বালানি ও পণ্যের দাম আবারও অস্থির হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ও আর্থিক বাজারেও নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে জ্বালানি বাজার দ্রুত স্বাভাবিক হওয়া, প্রযুক্তি খাতে আরও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সহযোগিতা বাড়ানো এবং কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়িত হলে বৈশ্বিক অর্থনীতির সম্ভাবনা আরও উন্নত হতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে যুদ্ধ ও প্রযুক্তি—দুটি বিপরীত শক্তিই আগামী কয়েক বছরের প্রবৃদ্ধির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















