দক্ষিণ চীনে টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় অন্তত ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশের পূর্ব উপকূলের দিকে শক্তিশালী টাইফুন বাভি ধেয়ে আসায় নতুন করে সতর্কতা জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকলেও অনেক এলাকায় এখনও বন্যার প্রভাব কাটেনি।
সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে গুয়াংশি অঞ্চলের হেংঝৌতে। সেখানে একটি জলাধারের বাঁধের অংশ ভেঙে যাওয়ার পর আকস্মিক ঢলে আশপাশের জনপদ প্লাবিত হয়। এতে অন্তত ২৬ জন নিহত হন। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, পুরো গুয়াংশি অঞ্চলে এখনও ৯ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
বন্যার মূল কারণ ছিল ট্রপিক্যাল স্টর্ম মেইসাক, যা গত শনিবার থেকে গুয়াংশিতে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত ঘটায়। অতিরিক্ত পানিতে জলাধার উপচে পড়ে, বহু বাড়িঘর প্লাবিত হয় এবং হাজারো মানুষ কয়েক দিন ধরে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আটকা পড়ে। মঙ্গলবার পর্যন্ত যেখানে ছয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছিল, পরে সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
উদ্ধার তৎপরতা জোরদার
বন্যাকবলিত এলাকায় সেনাবাহিনী, উদ্ধারকর্মী ও স্থানীয় প্রশাসন ব্যাপক উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। গুইগাং শহরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আটকে পড়া ১০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ও শিক্ষককে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের প্রচারিত ভিডিওতে দেখা গেছে, কমলা রঙের লাইফ জ্যাকেট পরা শিক্ষার্থীদের উদ্ধার নৌকায় তুলে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ড্রোন ও প্রায় ৫ হাজার ৭০০টি নৌকা ব্যবহার করে দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ পানি, জরুরি ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া এবং আটকে পড়া মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তর করা হয়েছে।
প্রাণীও বন্যার কবলে
বন্যার প্রভাব শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। গুইগাংয়ের একটি চিড়িয়াখানা জানিয়েছে, বন্যার পানিতে দুইটি জেব্রা, চারটি সজারুসহ শতাধিক প্রাণী নিখোঁজ হয়েছে।
অন্যদিকে হেংঝৌতে একটি সাপের খামার থেকে বিষধর সাপ বেরিয়ে যেতে পারে বলে বাসিন্দাদের সতর্ক করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ পর্যাপ্ত সাপের বিষের প্রতিষেধক মজুত করেছে এবং সাপের কামড় এড়াতে নিরাপত্তা নির্দেশনা দিয়েছে।
বিনইয়াং কাউন্টির একটি প্রাণী আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ২০০টি বিড়াল ও কয়েক ডজন কুকুরকে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। অনেক কুকুরকে গভীর পানি পেরিয়ে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়েছে, আর বিড়ালগুলো ছাদের বিমে উঠে আশ্রয় নিয়েছে।
ধীরে কমছে পানি, তবে বৃষ্টির আশঙ্কা রয়ে গেছে
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অনেক এলাকায় বন্যার পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। তবে আগামী দুই দিন কয়েকটি এলাকায় আরও বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।
হেংঝৌতে কাদা ও ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার, জীবাণুনাশক ছিটানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামতের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে ৬০ হাজারের বেশি পরিবারের বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপন করা হয়েছে।
চীনের জাতীয় আবহাওয়া কেন্দ্র জানিয়েছে, গত কয়েক দিনে গুয়াংশির বিভিন্ন এলাকায় ১০ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কিছু এলাকায় বৃষ্টির পরিমাণ ৯০ সেন্টিমিটারেরও বেশি ছিল।
এদিকে চলতি সপ্তাহের শুরুতে মধ্য চীনের হুবেই প্রদেশেও বজ্রঝড় ও টর্নেডোয় ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং বহু মানুষ গৃহহীন হয়েছেন।
নতুন টাইফুনের প্রস্তুতি
এদিকে টাইফুন বাভি উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে জাপানের কয়েকটি দূরবর্তী দ্বীপের কাছ দিয়ে তাইওয়ানের উত্তরাংশ অতিক্রম করে শনিবার চীনের ফুজিয়ান অথবা ঝেজিয়াং প্রদেশে আঘাত হানতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
যদিও এটি সুপার টাইফুনের শক্তি হারিয়েছে, তবুও তাইওয়ানের আবহাওয়া কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঝড়টির সর্বোচ্চ স্থায়ী বাতাসের গতি ঘণ্টায় ১৮৪ কিলোমিটার রয়েছে। সম্ভাব্য ঝড়ের আগে উত্তর তাইওয়ানের বন্দরে মাছ ধরার নৌকা নিরাপদে রাখা হয়েছে এবং বাসিন্দারা প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ফিলিপাইনের উত্তরাঞ্চলেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কয়েকটি শহরে শিক্ষা কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে এবং উত্তরাঞ্চলের বন্দরগুলো থেকে জাহাজ চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
চীনের দক্ষিণে ভয়াবহ বন্যায় ৩৯ জন নিহত। নতুন টাইফুন বাভি পূর্ব উপকূলের দিকে ধেয়ে আসায় উদ্ধার ও সতর্কতা জোরদার করেছে কর্তৃপক্ষ।
Sarakhon Report 


















