বাংলাদেশ ব্যাংকের এআই নির্দেশনা এবার ব্যাংক খাতের ভেতরে ডেটা ব্যবহারের সীমা স্পষ্ট করল। ২৮ জুনের অফিস আদেশে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বলা হয়েছে, গোপন বা সংবেদনশীল ব্যাংকিং তথ্য কোনো অবস্থাতেই এআই সরঞ্জামে দেওয়া যাবে না। সরকারি কাজেও এআই ব্যবহার করতে হলে আগে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হবে। নির্দেশনাটি এসেছে এমন সময়ে, যখন সরকারি অফিসেও দ্রুত লেখা, সারাংশ তৈরি ও বিশ্লেষণের জন্য এআই ব্যবহার বাড়ছে।
এই সতর্কতার পেছনে আছে দ্রুত বদলে যাওয়া কর্মপদ্ধতি। চ্যাটজিপিটি, জেমিনি, ক্লড, গ্রোক ও ডিপসিকের মতো এআই সরঞ্জাম এখন নোট লেখা, ডেটা বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদন তৈরির কাজে ঢুকে পড়েছে। ব্যবহারকারীর কাছে এগুলো দ্রুত ও সুবিধাজনক। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানে একই সুবিধা বড় ঝুঁকিও তৈরি করে। একটি খসড়া নোট, একটি নীতি আলোচনার অংশ, বা একটি অনিরীক্ষিত ডেটা টেবিল ভুল জায়গায় গেলে তা শুধু অফিসের গোপনীয়তা ভাঙে না। এটি আর্থিক বাজারের আস্থা, তদারকি প্রক্রিয়া ও নীতিনির্ধারণের নিরপেক্ষতার ওপরও চাপ ফেলতে পারে। এমন তথ্য কখনও অসম্পূর্ণ থাকে, কখনও প্রাথমিক পর্যায়ে থাকে। তাই দ্রুততার সুবিধা নিয়ন্ত্রণহীন হলে ভুল ব্যাখ্যাও ছড়াতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এআই নির্দেশনা তাই শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের নিয়ম নয়। এটি সরকারি অফিসে লুকিয়ে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে ব্যবহার প্রবণতার বিরুদ্ধে একটি প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান। অনেক কর্মক্ষেত্রে কর্মীরা নিজের সুবিধার জন্য ব্যক্তিগত এআই অ্যাকাউন্টে অফিসের লেখা, হিসাব বা নথির অংশ ঢোকান। ওই তথ্য কোথায় সংরক্ষিত হয়, কোন সার্ভারে যায়, কীভাবে ভবিষ্যৎ মডেল উন্নয়নে ব্যবহৃত হতে পারে, এসব প্রশ্ন সাধারণ ব্যবহারকারীর কাছে অস্পষ্ট। আর্থিক খাতে সেই অস্পষ্টতা বেশি বিপজ্জনক। কারণ ব্যাংকিং তথ্য গ্রাহক, প্রতিষ্ঠান, নীতি ও বাজারের সঙ্গে একসঙ্গে যুক্ত। ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে কাজ করলে অফিসের অনুমোদন, নথিভুক্তি ও দায় নির্ধারণও দুর্বল হয়।
বাংলাদেশের পাঠকের জন্য বিষয়টি সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা, বীমা, পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম ও সরকারি আর্থিক সেবায় এখন ডিজিটাল নথি বাড়ছে। গ্রাহকের পরিচয়, হিসাব, লেনদেন, ঋণ, আমদানি-রপ্তানি ও সরকারি পেমেন্টের তথ্য একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত ও সংবেদনশীল। ব্যাংক খাতের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের এআই নির্দেশনা তাই অন্য দপ্তরগুলোর জন্যও ইঙ্গিত। শুধু এআই নিষেধ করলেই হবে না। কোথায় ব্যবহার করা যাবে, কোন ডেটা যাবে না, কে অনুমোদন দেবে, কাজ শেষে তথ্য কীভাবে মুছবে, এসব প্রশ্নে পরিষ্কার নীতি দরকার। না হলে দক্ষতার নামে ঝুঁকি প্রতিষ্ঠানেই থেকে যাবে। আর্থিক খাতের ওপর আস্থা নষ্ট হলে তার প্রভাব সঞ্চয়কারী, ব্যবসায়ী ও ডিজিটাল সেবা ব্যবহারকারীর ওপর পড়ে।
চারটি নির্দেশনার কেন্দ্রে আছে একটি বাস্তব সমস্যা। অফিসের কাজ এখন আগের চেয়ে দ্রুত, কিন্তু নিরাপত্তা সংস্কৃতি একই গতিতে তৈরি হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের এআই নির্দেশনা কার্যকর হবে তখনই, যখন কর্মীরা বুঝবেন কোন তথ্য সাধারণ আর কোনটি সংবেদনশীল। সামনে দেখার বিষয় হবে, এই আদেশ শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে থাকে, নাকি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বৃহত্তর এআই ব্যবহারের নীতিতে রূপ নেয়। পরবর্তী ধাপটি হবে প্রশিক্ষণ, অনুমোদনপ্রক্রিয়া ও নিয়মভঙ্গের জবাবদিহি কতটা স্পষ্ট করা হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















