০৫:৩৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬
শেখার আনন্দ ফিরিয়ে আনতে হলে ‘সেরা’ হওয়ার চাপ কমাতে হবে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামল নিয়ে প্রচলিত ভাষ্য বদলে দিতে পারে তিনশ বছর আগের নথির যে সংগ্রহ রয়টার্সকে দেয়া শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার:  ডিসেম্বর নাগাদ  দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন হরমুজে জাহাজ চলাচল কমে অর্ধেকে, খামেনির জানাযার পর ফের মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান জাফলংয়ে ভারতীয় পণ্যের খোলাবাজার, ফেরার পথে জব্দ: পর্যটকদের প্রশ্নে বাড়ছে বিতর্ক সেবাঙ্গাউ: বন ও মানুষ—উভয়েরই বলিদান ট্রাম্পের ‘প্ল্যান সি’ কোথায়? ইরানে হামলা ও ভেঙে পড়া সমঝোতার পর নতুন অনিশ্চয়তায় ওয়াশিংটন হাম নিয়ন্ত্রণে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত দেশ, এখন সেখানে ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি আক্রান্ত বরিশালে হেফাজতে মৃত্যুর গুজব, থানায় হামলা: আহত ১২ গেমের মালিকানা কি শেষ হয়ে যাচ্ছে? ডিজিটাল যুগে সনির নতুন সিদ্ধান্তের বড় প্রশ্ন

রয়টার্সকে দেয়া শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার:  ডিসেম্বর নাগাদ  দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন

সারসংক্ষেপ

  • ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশের নেতা শেখ হাসিনা রয়টার্সকে বলেছেন, দেশে ফিরলে তাঁর মৃত্যুর ঝুঁকি রয়েছে।
  • তিনি বলেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন।
  • পরিকল্পিত প্রত্যাবর্তন নিয়ে ঢাকার সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ হয়নি বলে জানান তিনি।
  • আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন শেখ হাসিনা।

নয়াদিল্লি, ১০ জুলাই (রয়টার্স) — বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এবং নিজ দেশে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হওয়ার পর ভারতে নির্বাসিত অবস্থায় থাকা বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রয়টার্সকে বলেছেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা আগামী ডিসেম্বর নাগাদ দেশে ফিরে স্বেচ্ছায় আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন।

দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশের দীর্ঘতম সময় দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের সদস্যরা স্বেচ্ছায় সেই দেশে ফিরে যেতে চান, যেখান থেকে দুই বছর আগে তারা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। দেশে ফিরে তাঁরা আদালতে নিজেদের উপস্থিত করবেন, যা বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কীভাবে বিচার করা হয়, তার একটি বড় পরীক্ষা হবে।

প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী টেলিফোন সাক্ষাৎকারে বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে শুক্রবার পর্যন্ত কথা বলতে গিয়ে ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা বলেন,

“আমি ফিরে গেলে তারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি আমাকে হত্যা পর্যন্ত করতে পারে।”

তিনি আরও বলেন,

“তবুও আমাকে ফিরতেই হবে। আমার দলের নেতা-কর্মীরা ভয়াবহ দমন-পীড়নের শিকার হচ্ছেন। যদি মৃত্যুই আসে, তবে আমি চাই সেটি আমার নিজের মাটিতেই আসুক—যেখানে আমার বাবা-মা শায়িত আছেন এবং যেখানে তাঁদের রক্ত ঝরেছিল।”

নির্বাসন ঘিরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে টানাপোড়েন

২০২৪ সালে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাঁর টানা প্রায় ২০ বছরের শাসনের অবসান ঘটার পর শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। পরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত নভেম্বর মাসে ছাত্র আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে তাঁর অনুপস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ড দেন। নির্বাসন থেকে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

তাঁর দেশে প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে, যখন ঢাকার সরকার দুই বছরের অস্থিরতার পর স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, ভারতে তাঁর আশ্রয় নেওয়ার পর যে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অবনতি হয়েছে, সেটি উন্নতির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার ভারতকে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে।

নির্বাসনে যাওয়ার পর এতদিন তিনি কেবল লিখিত প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন। এবার প্রথমবারের মতো রয়টার্সকে সাক্ষাৎকার দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি কবে বা কীভাবে দেশে ফিরবেন, সে বিষয়ে কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেননি।

এটাই প্রথমবার তিনি দেশে ফেরার সম্ভাব্য সময়সূচি প্রকাশ করলেন, আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা জানালেন এবং বললেন যে নির্বাসনে থাকা আওয়ামী লীগের অন্য নেতারাও একইভাবে দেশে ফিরবেন।

তাঁদের মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও রয়েছেন, যিনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। তবে রয়টার্স অন্য নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি বা তাঁরা বর্তমানে কোথায় আছেন, তা নিশ্চিত করতে পারেনি।

শেখ হাসিনা বলেন,

“তারা আমাকে ফিরিয়ে নিতে চায়। আমাকে ফেরত পাঠানোর জন্য তারা বারবার ভারতকে চিঠি পাঠাচ্ছে। কিন্তু আমি নিজেই ফিরে যাব।”

বাংলাদেশ সরকারের মুখপাত্ররা শেখ হাসিনার এই বক্তব্যের বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেননি।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও কোনো মন্তব্য করেনি। তবে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ তারা পর্যালোচনা করছে এবং নতুন বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে চায়।

একসময়ের গণতন্ত্রের প্রতীক, পরে ভিন্নমত দমনের অভিযোগ

বাংলাদেশের স্বাধীনতার নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য ১৯৭৫ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হওয়ার পর শেখ হাসিনা জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন। এরপর প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে তিনি বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত।

রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে তিনি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনের অন্যতম নেতা হিসেবে পরিচিতি পান এবং ১৭ কোটির বেশি জনসংখ্যার মুসলিম-অধ্যুষিত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার কৃতিত্বও তাঁর সরকারকে দেওয়া হয়। তবে দীর্ঘ শাসনামলে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে ভিন্নমত দমন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল করা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট করার অভিযোগ ওঠে। শেখ হাসিনা এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছেন।

জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর সরকারের পতনের দিকে নিয়ে যাওয়া ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন দমনের সময় সর্বোচ্চ ১,৪০০ জন নিহত হন।

দিল্লিতে নির্বাসন থেকে রয়টার্সকে শেখ হাসিনা বলেন,

“আমাদের প্রায় সব নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং তাদের অনেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন। তাই আমি তাদের বলেছি, এবার আমি দেশে ফিরছি। আর তোমরাও সবাই ফিরে আসবে। আমরা সবাই একসঙ্গে আদালতে আত্মসমর্পণ করব।”

তবে তিনি দেশে ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ, ঠিক কখন আত্মসমর্পণ করবেন কিংবা কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন—এসব বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি।

তিনি বলেন,

“আমি ন্যায়বিচারে বিশ্বাস করি। বিচারিক কার্যক্রম শুরু হলে মানুষ নিজেরাই বুঝতে পারবে আদালতের এই প্রক্রিয়া কতটা প্রহসনের। আমি সেটিই প্রমাণ করতে চাই।”

জনগণই বিচার করুক

গণঅভ্যুত্থানে তাঁর সরকারের পতনের পর থেকে আওয়ামী লীগের বহু নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার, মামলা ও শারীরিক হামলার শিকার হয়েছেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এবং সরকারি কর্মকর্তাদের তথ্য উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, দেশে ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে তাঁর সঙ্গে ঢাকার কোনো ধরনের যোগাযোগ হয়নি।

তিনি বলেন,

“গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার এবং ন্যায়বিচার—এসব কোনো গোপন আলোচনার বিষয় নয়।”

তিনি আরও বলেন, কারাগারে যেতে হলে তিনি উদ্বিগ্ন নন, কারণ অতীতেও তাঁকে একাধিকবার কারাবন্দি হতে হয়েছে।

১৯৮১ সালে বাবার হত্যাকাণ্ডের পর নির্বাসন থেকে দেশে ফিরে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে তাঁকে বারবার আটক করা হয়। পরে ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুর্নীতির অভিযোগে তাঁকে আবার কারাবন্দি করে। পরবর্তীতে তিনি মুক্তি পান এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হন।

২০২৪ সালে এবার দেশ ছাড়ার প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর বাসভবনের দিকে জনতা এগিয়ে আসার সময় তাঁর জীবনের ওপর গুরুতর হুমকি তৈরি হয়েছিল।

তিনি বলেন,

“কোনো সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে ভুল হতেই পারে। কোনো সরকারই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু একটি সরকার ভালো না খারাপ কাজ করেছে, সঠিক না ভুল করেছে—সেই বিচার করার অধিকার জনগণের। আমি সেই বিচার জনগণের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি।”

শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তিনি অনলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টির নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

তিনি বলেন,

“তারা আমাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে, তাই হয়তো আমি নির্বাচনে অংশ নিতে পারব না। কিন্তু আওয়ামী লীগকে কেন স্থগিত বা নিষিদ্ধ করা হবে? যদি আমরা খারাপ কাজ করে থাকি, তাহলে সেই বিচার জনগণই করুক।”

প্রতিবেদন: কৃষ্ণ এন. দাস, নয়াদিল্লি
অতিরিক্ত প্রতিবেদন: রুমা পাল, ঢাকা
সম্পাদনা: উইলিয়াম ম্যালার্ড

প্রতিবেদক পরিচিতি

কৃষ্ণ এন. দাস ভারতে রয়টার্সের রাজনীতি ও সাধারণ সংবাদবিষয়ক সম্পাদক।

তিনি এমন একাধিক প্রতিবেদক দলের সদস্য ছিলেন, যারা সোসাইটি অব পাবলিশার্স ইন এশিয়া (SOPA) পুরস্কার অর্জন করে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী বিষাক্ত কফ সিরাপ কেলেঙ্কারি নিয়ে রয়টার্সের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য পুরস্কার।
  • ২০১৮ সালে রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের কভারেজের জন্য পুরস্কার।
  • ২০১৭ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার প্রতিবেদনের জন্য পুরস্কার।

২০১৯ ও ২০২০ সালে তিনি রয়টার্সের মালয়েশিয়া ব্যুরোপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি ভারতে ফিরে বর্তমান দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

শেখার আনন্দ ফিরিয়ে আনতে হলে ‘সেরা’ হওয়ার চাপ কমাতে হবে

রয়টার্সকে দেয়া শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার:  ডিসেম্বর নাগাদ  দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন

০৪:৩৫:২১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

সারসংক্ষেপ

  • ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশের নেতা শেখ হাসিনা রয়টার্সকে বলেছেন, দেশে ফিরলে তাঁর মৃত্যুর ঝুঁকি রয়েছে।
  • তিনি বলেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন।
  • পরিকল্পিত প্রত্যাবর্তন নিয়ে ঢাকার সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ হয়নি বলে জানান তিনি।
  • আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন শেখ হাসিনা।

নয়াদিল্লি, ১০ জুলাই (রয়টার্স) — বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এবং নিজ দেশে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হওয়ার পর ভারতে নির্বাসিত অবস্থায় থাকা বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রয়টার্সকে বলেছেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা আগামী ডিসেম্বর নাগাদ দেশে ফিরে স্বেচ্ছায় আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন।

দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশের দীর্ঘতম সময় দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের সদস্যরা স্বেচ্ছায় সেই দেশে ফিরে যেতে চান, যেখান থেকে দুই বছর আগে তারা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। দেশে ফিরে তাঁরা আদালতে নিজেদের উপস্থিত করবেন, যা বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কীভাবে বিচার করা হয়, তার একটি বড় পরীক্ষা হবে।

প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী টেলিফোন সাক্ষাৎকারে বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে শুক্রবার পর্যন্ত কথা বলতে গিয়ে ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা বলেন,

“আমি ফিরে গেলে তারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি আমাকে হত্যা পর্যন্ত করতে পারে।”

তিনি আরও বলেন,

“তবুও আমাকে ফিরতেই হবে। আমার দলের নেতা-কর্মীরা ভয়াবহ দমন-পীড়নের শিকার হচ্ছেন। যদি মৃত্যুই আসে, তবে আমি চাই সেটি আমার নিজের মাটিতেই আসুক—যেখানে আমার বাবা-মা শায়িত আছেন এবং যেখানে তাঁদের রক্ত ঝরেছিল।”

নির্বাসন ঘিরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে টানাপোড়েন

২০২৪ সালে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাঁর টানা প্রায় ২০ বছরের শাসনের অবসান ঘটার পর শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। পরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত নভেম্বর মাসে ছাত্র আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে তাঁর অনুপস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ড দেন। নির্বাসন থেকে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

তাঁর দেশে প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে, যখন ঢাকার সরকার দুই বছরের অস্থিরতার পর স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, ভারতে তাঁর আশ্রয় নেওয়ার পর যে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অবনতি হয়েছে, সেটি উন্নতির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার ভারতকে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে।

নির্বাসনে যাওয়ার পর এতদিন তিনি কেবল লিখিত প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন। এবার প্রথমবারের মতো রয়টার্সকে সাক্ষাৎকার দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি কবে বা কীভাবে দেশে ফিরবেন, সে বিষয়ে কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেননি।

এটাই প্রথমবার তিনি দেশে ফেরার সম্ভাব্য সময়সূচি প্রকাশ করলেন, আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা জানালেন এবং বললেন যে নির্বাসনে থাকা আওয়ামী লীগের অন্য নেতারাও একইভাবে দেশে ফিরবেন।

তাঁদের মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও রয়েছেন, যিনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। তবে রয়টার্স অন্য নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি বা তাঁরা বর্তমানে কোথায় আছেন, তা নিশ্চিত করতে পারেনি।

শেখ হাসিনা বলেন,

“তারা আমাকে ফিরিয়ে নিতে চায়। আমাকে ফেরত পাঠানোর জন্য তারা বারবার ভারতকে চিঠি পাঠাচ্ছে। কিন্তু আমি নিজেই ফিরে যাব।”

বাংলাদেশ সরকারের মুখপাত্ররা শেখ হাসিনার এই বক্তব্যের বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেননি।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও কোনো মন্তব্য করেনি। তবে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ তারা পর্যালোচনা করছে এবং নতুন বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে চায়।

একসময়ের গণতন্ত্রের প্রতীক, পরে ভিন্নমত দমনের অভিযোগ

বাংলাদেশের স্বাধীনতার নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য ১৯৭৫ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হওয়ার পর শেখ হাসিনা জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন। এরপর প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে তিনি বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত।

রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে তিনি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনের অন্যতম নেতা হিসেবে পরিচিতি পান এবং ১৭ কোটির বেশি জনসংখ্যার মুসলিম-অধ্যুষিত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার কৃতিত্বও তাঁর সরকারকে দেওয়া হয়। তবে দীর্ঘ শাসনামলে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে ভিন্নমত দমন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল করা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট করার অভিযোগ ওঠে। শেখ হাসিনা এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছেন।

জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর সরকারের পতনের দিকে নিয়ে যাওয়া ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন দমনের সময় সর্বোচ্চ ১,৪০০ জন নিহত হন।

দিল্লিতে নির্বাসন থেকে রয়টার্সকে শেখ হাসিনা বলেন,

“আমাদের প্রায় সব নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং তাদের অনেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন। তাই আমি তাদের বলেছি, এবার আমি দেশে ফিরছি। আর তোমরাও সবাই ফিরে আসবে। আমরা সবাই একসঙ্গে আদালতে আত্মসমর্পণ করব।”

তবে তিনি দেশে ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ, ঠিক কখন আত্মসমর্পণ করবেন কিংবা কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন—এসব বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি।

তিনি বলেন,

“আমি ন্যায়বিচারে বিশ্বাস করি। বিচারিক কার্যক্রম শুরু হলে মানুষ নিজেরাই বুঝতে পারবে আদালতের এই প্রক্রিয়া কতটা প্রহসনের। আমি সেটিই প্রমাণ করতে চাই।”

জনগণই বিচার করুক

গণঅভ্যুত্থানে তাঁর সরকারের পতনের পর থেকে আওয়ামী লীগের বহু নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার, মামলা ও শারীরিক হামলার শিকার হয়েছেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এবং সরকারি কর্মকর্তাদের তথ্য উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, দেশে ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে তাঁর সঙ্গে ঢাকার কোনো ধরনের যোগাযোগ হয়নি।

তিনি বলেন,

“গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার এবং ন্যায়বিচার—এসব কোনো গোপন আলোচনার বিষয় নয়।”

তিনি আরও বলেন, কারাগারে যেতে হলে তিনি উদ্বিগ্ন নন, কারণ অতীতেও তাঁকে একাধিকবার কারাবন্দি হতে হয়েছে।

১৯৮১ সালে বাবার হত্যাকাণ্ডের পর নির্বাসন থেকে দেশে ফিরে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে তাঁকে বারবার আটক করা হয়। পরে ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুর্নীতির অভিযোগে তাঁকে আবার কারাবন্দি করে। পরবর্তীতে তিনি মুক্তি পান এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হন।

২০২৪ সালে এবার দেশ ছাড়ার প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর বাসভবনের দিকে জনতা এগিয়ে আসার সময় তাঁর জীবনের ওপর গুরুতর হুমকি তৈরি হয়েছিল।

তিনি বলেন,

“কোনো সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে ভুল হতেই পারে। কোনো সরকারই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু একটি সরকার ভালো না খারাপ কাজ করেছে, সঠিক না ভুল করেছে—সেই বিচার করার অধিকার জনগণের। আমি সেই বিচার জনগণের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি।”

শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তিনি অনলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টির নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

তিনি বলেন,

“তারা আমাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে, তাই হয়তো আমি নির্বাচনে অংশ নিতে পারব না। কিন্তু আওয়ামী লীগকে কেন স্থগিত বা নিষিদ্ধ করা হবে? যদি আমরা খারাপ কাজ করে থাকি, তাহলে সেই বিচার জনগণই করুক।”

প্রতিবেদন: কৃষ্ণ এন. দাস, নয়াদিল্লি
অতিরিক্ত প্রতিবেদন: রুমা পাল, ঢাকা
সম্পাদনা: উইলিয়াম ম্যালার্ড

প্রতিবেদক পরিচিতি

কৃষ্ণ এন. দাস ভারতে রয়টার্সের রাজনীতি ও সাধারণ সংবাদবিষয়ক সম্পাদক।

তিনি এমন একাধিক প্রতিবেদক দলের সদস্য ছিলেন, যারা সোসাইটি অব পাবলিশার্স ইন এশিয়া (SOPA) পুরস্কার অর্জন করে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী বিষাক্ত কফ সিরাপ কেলেঙ্কারি নিয়ে রয়টার্সের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য পুরস্কার।
  • ২০১৮ সালে রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের কভারেজের জন্য পুরস্কার।
  • ২০১৭ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার প্রতিবেদনের জন্য পুরস্কার।

২০১৯ ও ২০২০ সালে তিনি রয়টার্সের মালয়েশিয়া ব্যুরোপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি ভারতে ফিরে বর্তমান দায়িত্ব গ্রহণ করেন।