বহু বছর ধরে চলা বন ধ্বংসের পর ইন্দোনেশিয়ার মধ্য কালিমান্তানের সেবাঙ্গাউ বনকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল আরও বন উজাড় ঠেকিয়ে এই বিশাল বনভূমি ও এর জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা। কিন্তু দুই দশকেরও বেশি সময় পরও জাতীয় উদ্যানের সীমানার ভেতরে কৃষি সম্প্রসারণ, অবৈধ খনন ও অন্যান্য মানবিক কর্মকাণ্ডের কারণে বনভূমির অবক্ষয় অব্যাহত রয়েছে। ফলে প্রকৃতি সংরক্ষণে সরকারের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
কালিমান্তানের বনাঞ্চলের আদিবাসী দায়াক জনগোষ্ঠীর মধ্যে আজও একটি প্রাচীন প্রবাদ প্রচলিত রয়েছে—

“ইঙ্গাত পেতেহ তাতু হিয়াং, পেতাক দানুম আকান কোলুনেন হারিয়ান আনদাউ”
অর্থাৎ, “পূর্বপুরুষদের উপদেশ মনে রাখো; এই ভূমি ও জল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য।”
এক সময় এই দর্শনই ছিল তাদের জীবনযাপনের ভিত্তি। কিন্তু বোর্নিও দ্বীপের ইন্দোনেশীয় অংশ বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বন উজাড়ের কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের বন রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তা সংরক্ষণের বিশ্বাসও ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে শুরু করেছে। বন হারানোর সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে সেই জীবনদর্শনও।
মধ্য কালিমান্তানের বিস্তীর্ণ পিট-সোয়াম্প বা জলাভূমি বন সেবাঙ্গাউ আজ এমন এক উদাহরণ, যেখানে ২০০৪ সালে জাতীয় উদ্যান ঘোষণার পরও দ্রুত বন উজাড় ও দাবানল থামেনি। অথচ জাতীয় উদ্যানের মর্যাদা ইন্দোনেশিয়ায় পরিবেশ সংরক্ষণের সর্বোচ্চ আইনি স্বীকৃতি, যার উদ্দেশ্য একটি সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্র ও এর জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা।
দুই দশকেরও বেশি সময় পরে দেখা যাচ্ছে, জাকার্তা শহরের প্রায় আট গুণ বড় এই জাতীয় উদ্যান হাজার হাজার হেক্টর বনভূমি হারিয়েছে। অবৈধ দখল, জমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ এবং অনুপ্রবেশের কারণে বন ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার ৫৭টি জাতীয় উদ্যানের অনেকগুলোর ক্ষেত্রেই একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গেছে।
গত এপ্রিল মাসে দ্য জাকার্তা পোস্ট-এর প্রতিবেদকরা সেবাঙ্গাউর গভীরে গিয়ে দেখতে পান, জাতীয় উদ্যানের ভেতরে অবৈধ তেলপাম বাগান গড়ে উঠেছে। এসব বাগান থেকে উৎপাদিত পাম তেল বিশ্বের বড় বড় কোম্পানি—যেমন কারগিল ও নেসলে-এর সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ হয়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, দায়াক জনগোষ্ঠীর অন্যতম বড় উপগোষ্ঠী নগাজু জনগণ তাদের শতাব্দীপ্রাচীন বসতি থেকে কার্যত উৎখাত হয়েছে।

ধ্বংসযজ্ঞের দীর্ঘ ইতিহাস
সেবাঙ্গাউ বন মধ্য কালিমান্তান প্রদেশের রাজধানী পালাংকা রায়ার একেবারে কাছেই অবস্থিত। এর বিস্তৃতি কাতিংগান ও পুলাং পিসাউ জেলাতেও রয়েছে। সেবাঙ্গাউ, কাহায়ান ও কাতিংগান—এই তিনটি প্রাচীন নদী জাতীয় উদ্যানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বিশাল পিট-সোয়াম্প বনাঞ্চলকে টিকিয়ে রেখেছে।
এই বনাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অন্তত ৩৯টি গ্রাম ও উপ-জেলা। এর দুই-তৃতীয়াংশ এলাকায় দায়াক জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠ বসবাস। পশ্চিমাংশে ৬৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ কাতিংগান নদীর তীরেও তাদের বহু বসতি রয়েছে।
পুরো এলাকার প্রায় ৮০ শতাংশই পিট বন। এটি ইন্দোনেশিয়ার বৃহত্তম পিটল্যান্ড বাস্তুতন্ত্রগুলোর একটি এবং বিপন্ন বোর্নিও ওরাংওটাং-এর অন্যতম প্রধান আবাসস্থল। বর্তমানে এখানে ৮ হাজার ৭০০-এরও বেশি ওরাংওটাং বাস করে।
সেবাঙ্গাউ ধ্বংসের ইতিহাস শুরু হয় ১৯৭০-এর দশক থেকে ২০০০ সালের শুরুর দিকে। সে সময় এলাকাটিকে শিল্পভিত্তিক বনায়ন প্রকল্প হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং অসংখ্য কাঠ আহরণ কোম্পানিকে ইজারা দেওয়া হয়।

কাঠ পরিবহনের সুবিধার্থে পিটভূমিতে ৪০০টিরও বেশি খাল কাটা হয়। জলাভূমির পানি নিষ্কাশন করা হয় এবং বিভিন্ন নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে একফসলি বনায়নের জন্য সেচব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়।
এই কর্মকাণ্ডে এত ব্যাপক ক্ষতি হয় যে সরকারি হিসাবেই বলা হয়, সেবাঙ্গাউর প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকা কার্যত উজাড় হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বনকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কয়েক শতাব্দী সময় লাগতে পারে।
এই বিপর্যয়ের পরই ২০০৪ সালে এলাকাটিকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়।
কিন্তু জাতীয় উদ্যানের মর্যাদা বন ধ্বংস থামাতে পারেনি।
পরিবেশবিষয়ক সংস্থা অরিগা নুসান্তারার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সেবাঙ্গাউ প্রায় ২৩ হাজার হেক্টর বনভূমি হারিয়েছে। আগের দশকের তুলনায় স্থায়ী বনহানির পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার হেক্টর বেড়েছে।
পিটভূমির অবস্থাও সমান উদ্বেগজনক।পিটভূমি নিয়ে কাজ করা সংগঠন পানতাউ গামবুত ২০২৫ সালের আগস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, মধ্য কালিমান্তানের ক্ষতিগ্রস্ত ৬ লাখ ৬৯ হাজার হেক্টর পিটভূমির প্রায় অর্ধেকই কাহায়ান ও সেবাঙ্গাউ নদী করিডরের মধ্যে অবস্থিত, যার বড় অংশ জাতীয় উদ্যানের সীমানার সঙ্গে মিলে গেছে।
সংস্থাটির অ্যাডভোকেসি, ক্যাম্পেইন ও কমিউনিকেশন ম্যানেজার ওয়াহ্যু পেরদানা বলেন,
“এই ক্ষতির বড় একটি অংশ জাতীয় উদ্যানের ভেতরেই পড়েছে। ফলে বন্যা ও বন আগুনের ঝুঁকি আরও বেড়ে যাচ্ছে।”
অবৈধ তেলপাম বাগানের বিস্তার
বর্তমানে সেবাঙ্গাউ জাতীয় উদ্যানের বন ধ্বংসের সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে উঠেছে তেলপাম চাষ। ইন্দোনেশিয়ার অন্যতম প্রধান পাম তেল উৎপাদনকারী অঞ্চল মধ্য কালিমান্তানে অবস্থিত হওয়ায় জাতীয় উদ্যানের বিভিন্ন অংশ দখল করে সেখানে অবৈধভাবে তেলপামের বাগান গড়ে তোলা হয়েছে।
পরিবেশ পর্যবেক্ষক সংস্থা অরিগা নুসান্তারার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শুধু ২০২৪ সালেই সেবাঙ্গাউ জাতীয় উদ্যান ও এর আশপাশের প্রায় ২ হাজার হেক্টর বনভূমি কেটে তেলপামের বাগানে রূপান্তর করা হয়েছে। এর ফলে ইন্দোনেশিয়ার ৫৭টি জাতীয় উদ্যানের মধ্যে তেলপাম অনুপ্রবেশের দিক থেকে সেবাঙ্গাউ ষষ্ঠ স্থানে উঠে এসেছে।
এসব বাগান আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ হলেও অনেক ক্ষেত্রেই এগুলোকে ক্ষুদ্র কৃষকের বাগান হিসেবে দেখানো হয়। বাস্তবে এসব বাগান থেকেই উৎপাদিত ফল দেশের বিশাল পাম তেল শিল্পে যুক্ত হচ্ছে, যে শিল্পে ২০০৭ সাল থেকে ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের শীর্ষ উৎপাদক।

বন্যপ্রাণীর জন্য বড় হুমকি
সেবাঙ্গাউ জাতীয় উদ্যানের প্রধান কর্মকর্তা রুসওয়ান্তো স্বীকার করেন, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে থাকা তেলপাম বাগান সম্পূর্ণ অবৈধ। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে জমির মালিকানা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে সরকারের বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, এসব বাগান ও খনির কারণে ওরাংওটাংসহ বহু বিরল প্রাণীর আবাসস্থল টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। প্রাণীদের চলাচলের করিডর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় তাদের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে উঠছে।
তবে জাতীয় উদ্যান কর্তৃপক্ষের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। তাদের দায়িত্ব মূলত সংরক্ষিত এলাকা পরিচালনা করা; আইন প্রয়োগ বা অপরাধ দমন তাদের হাতে নয়। ফলে অবৈধ দখল রোধে তারা কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেন না।
সরকারের অভিযান
ইন্দোনেশিয়াজুড়ে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্যে অবৈধ তেলপাম বাগান ছড়িয়ে পড়ায় সরকার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তো ২০২৫ সালে ফরেস্ট এনফোর্সমেন্ট টাস্ক ফোর্স (সাতগাস পিকেএইচ) গঠন করেন।
সরকারের দাবি, এই টাস্ক ফোর্স ইতোমধ্যে সারা দেশে অবৈধভাবে দখল করা ৫৮ লাখ হেক্টর বনভূমি পুনরুদ্ধার করেছে। যার আনুমানিক মূল্য ৩৭১ ট্রিলিয়ন রুপিয়া বা প্রায় ২০ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এই অভিযানের আওতায় সেবাঙ্গাউ জাতীয় উদ্যানও ছিল।
গত বছরের জুলাইয়ে সামরিক বাহিনী, প্রসিকিউটর ও সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত টাস্ক ফোর্স পালাংকা রায়া শহরের বুকিত তুঙ্গাল, হাবারিং হুরুঙ ও বান্তুরুঙ এলাকায় হাজার হাজার হেক্টর অবৈধ তেলপাম বাগান জব্দ করে।
জব্দ করা জমিতে বড় বড় সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড টানিয়ে জানানো হয়, সেখানে আর কোনো ধরনের চাষাবাদ, দখল বা লেনদেন করা যাবে না।

বাস্তব চিত্র ভিন্ন
কিন্তু দ্য জাকার্তা পোস্ট-এর প্রতিবেদকরা ২০২৬ সালের ২৭ ও ৩০ এপ্রিল বান্তুরুঙ এলাকায় গিয়ে ভিন্ন চিত্র দেখতে পান।
যে ১ হাজার ৪৬২ হেক্টর জমি সরকার জব্দ করেছে বলে দাবি করা হয়েছে, সেখানে তখনও বিস্তীর্ণ তেলপামের বাগান অক্ষত অবস্থায় ছিল।
শুধু তাই নয়, প্রতিদিনের মতো ট্রাকে করে তাজা তেলপাম ফল (Fresh Fruit Bunches বা FFB) কারখানায় পাঠানো হচ্ছিল।
আকাশপথে পর্যবেক্ষণ করে এবং অরিগা নুসান্তারার যাচাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায়, এসব বাগান জাতীয় উদ্যানের পুনর্বাসন অঞ্চলের মধ্যেই অবস্থিত।
২০২৪ সালের প্রাকৃতিক সম্পদ ও বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ আইনে জাতীয় উদ্যানের পুনর্বাসন অঞ্চলসহ সংরক্ষিত এলাকার ভেতরে জমির ব্যবহার পরিবর্তন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

শ্রমিকদের বক্তব্য
বান্তুরুঙের এক বাগানশ্রমিক পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বলেন,
“আমি এ জায়গা সম্পর্কে কিছুই জানি না। আমি স্থানীয় নই। এখানে নতুন এসেছি।”
জাভা থেকে আসা ওই শ্রমিক জানান, তিনি ২০২৩ সাল থেকে এই বাগানে কাজ করছেন। তাঁর দাবি, শুধু এই বাগান থেকেই বছরে ৫০০ টনের বেশি তেলপাম ফল উৎপাদিত হয়।
আরেক শ্রমিক জানান, বান্তুরুঙ এলাকার অন্তত ১৪টি বাগান থেকে উৎপাদিত ফল পিটি পানচা মিত্রা কাতিংগান (PMK) নামের একটি কারখানায় পাঠানো হয়।
কাতিংগান জেলার ওই কারখানায় ফল প্রক্রিয়াজাত করে অপরিশোধিত পাম তেল (CPO) তৈরি করা হয়, যা ইন্দোনেশিয়ার অন্যতম প্রধান রপ্তানি পণ্য।
এক শ্রমিক বলেন,
“আমি তিন বছর ধরে এখানে কাজ করছি। এই সময়ে আমরা নিয়মিত টন টন ফল ওই কারখানায় পাঠিয়েছি।”
বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে সংযোগ
স্থানীয় এক পরিবেশকর্মীর দাবি, শুধু পিএমকে নয়, আরও কয়েকটি কারখানাও বহু বছর ধরে সেবাঙ্গাউ জাতীয় উদ্যানের ভেতর থেকে সংগৃহীত তেলপাম ফল কিনে আসছে।
তাঁর ভাষায়,
“এই কারখানাগুলো সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে উৎপাদিত ফল থেকেই অপরিশোধিত পাম তেল তৈরি করছে। অথচ এর বিরুদ্ধে কার্যত কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।”
পিএমকে কার মালিকানাধীন, তা স্পষ্ট নয়।
তবে গত বছর গ্রিনপিস প্রকাশিত Under the Eagle’s Shadow শীর্ষক প্রতিবেদনে পিএমকেকে ব্যবসায়িক গোষ্ঠী রয়্যাল গোল্ডেন ঈগল (RGE)-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। যদিও আরজিই এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে যোগসূত্র
দ্য জাকার্তা পোস্ট-এর নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পিএমকে মিলের নাম বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সরবরাহকারী তালিকায় রয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—
- পেপসিকো
- নেসলে
- কারগিল
- কাও
পেপসিকো জানিয়েছে, অভিযোগের বিষয়ে তারা তদন্ত শুরু করেছে এবং সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে।
নেসলেও একই ধরনের তদন্ত শুরুর কথা জানিয়েছে।
কারগিল স্বীকার করেছে, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পিএমকে মিল থেকে তারা পাম তেল সংগ্রহ করে থাকে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
অন্যদিকে জাপানের কাও জানিয়েছে, তাদের সঙ্গে পিএমকের সরাসরি ব্যবসায়িক সম্পর্ক নেই। যদিও পূর্বের একটি সরবরাহকারী তালিকায় পিএমকের নাম ছিল, সেটিকে তারা সম্ভাব্য সরবরাহকারীর তালিকা বলে ব্যাখ্যা করেছে।

দুর্বল আইন প্রয়োগ ও বন রক্ষার সংকট
সেবাঙ্গাউ জাতীয় উদ্যানের ভেতরে অবৈধ তেলপাম বাগানের বিস্তার প্রমাণ করে যে, কয়েক দশক ধরে কার্যকর আইন প্রয়োগের অভাবে ইন্দোনেশিয়ার পরিবেশ সংরক্ষণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। শুধু জমি দখল করলেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না; বন ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় একই ধরনের কার্যক্রম বারবার ফিরে আসছে।
ইন্দোনেশিয়ার বন মন্ত্রণালয়ের প্রাকৃতিক সম্পদ ও বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ বিভাগের মহাপরিচালক সাত্যাওয়ান পুদিয়াতমোকো স্বীকার করেন, সংরক্ষিত বনাঞ্চলে নজরদারির জন্য পর্যাপ্ত বনরক্ষী নেই।
বর্তমানে সারা দেশে বনরক্ষীর সংখ্যা পাঁচ হাজারেরও কম। ফলে একজন বনরক্ষীকে গড়ে প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর বনভূমি তদারক করতে হয়, যা আদর্শ মানের প্রায় দশ গুণ বেশি।
এই সংকট কাটাতে সরকার ২০২৭ সালের মধ্যে আরও ২১ হাজার বনরক্ষী নিয়োগের পরিকল্পনা করেছে।
সাত্যাওয়ানের ভাষায়,
“অবৈধ দখল করা বনভূমির ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখন আমাদের মূল কাজ হবে ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা।”
শুধু জমি উদ্ধার করলেই হবে না
ইন্দোনেশিয়ান ইন্ডিপেনডেন্ট ফরেস্ট মনিটরিং নেটওয়ার্ক (JPIK)-এর নির্বাহী পরিচালক মুহাম্মদ ইচওয়ানের মতে, অবৈধভাবে দখল করা জমি বাজেয়াপ্ত করাই যথেষ্ট নয়।
তিনি বলেন, যারা এসব অবৈধ বাগান পরিচালনা করছে কিংবা তাদের আর্থিকভাবে সহায়তা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা না নিলে বন ধ্বংস বন্ধ হবে না। একই সঙ্গে জাতীয় উদ্যানের ভেতরে চলমান জমি-সংক্রান্ত বিরোধেরও টেকসই সমাধান প্রয়োজন।
ইচওয়ানের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বন উজাড়ের সঙ্গে যুক্ত কৃষিপণ্য আমদানির ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হলেও, বাস্তবে সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে উৎপাদিত পণ্য এখনো আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে যাচ্ছে।
ইউরোপের নতুন চাপ
ইউরোপীয় ইউনিয়ন বন উজাড় ঠেকাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডিফরেস্টেশন রেগুলেশন (EUDR) চালু করছে।
এই নীতিমালার আওতায় বড় ও মাঝারি কোম্পানিগুলোকে তাদের সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি কৃষিপণ্যের ভৌগোলিক অবস্থান (Geolocation) দেখাতে হবে, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে পণ্যটি বন উজাড় করা জমি থেকে আসেনি।
তবে ইন্দোনেশিয়াসহ কয়েকটি উৎপাদনকারী দেশ এই নীতির বিরোধিতা করেছে।
পূর্বপুরুষের ভূমি থেকে উৎখাত
সেবাঙ্গাউ জাতীয় উদ্যান ঘোষণার পর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এখানকার আদিবাসী দায়াক জনগোষ্ঠী।
জাতীয় উদ্যানের সীমানা নির্ধারণের সময় বহু প্রাচীন গ্রাম ও বনভূমি সংরক্ষিত এলাকার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যেসব বন, নদী ও জলাভূমি ব্যবহার করে তারা জীবিকা নির্বাহ করছিল, সেগুলোর বড় অংশে প্রবেশাধিকার হারিয়ে ফেলে।
এর ফলে সরকার ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ভূমি বিরোধের সৃষ্টি হয়।
সবচেয়ে আলোচিত বিরোধগুলোর একটি কাতিংগান জেলার পেতাক বাহানদাং গ্রামের নগাজু সম্প্রদায়কে ঘিরে।
গ্রামটি রাসাউ নদীর তীরে অবস্থিত, যা কাতিংগান নদীর একটি শাখা।
দুই ধরনের সীমানা
সরকার যেখানে স্যাটেলাইট মানচিত্র ব্যবহার করে জাতীয় উদ্যানের সীমানা নির্ধারণ করেছে, সেখানে দায়াক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব একটি ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি রয়েছে।
তাদের সমাজে নদীর তীরে বাজানো একটি গং-এর শব্দ যত দূর পর্যন্ত শোনা যায়, সেই এলাকাকেই ঐতিহ্যগতভাবে তাদের ব্যবহারের সীমা হিসেবে ধরা হয়।
অর্থাৎ তাদের কাছে ভূমির মালিকানা কেবল মানচিত্রের বিষয় নয়; এটি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ঐতিহ্যের অংশ।
দায়াক নেতা ডোবে বলেন,
“মাঠের বাস্তবতা দেখলে জাতীয় উদ্যানের সীমানা অন্যভাবে নির্ধারণ করা উচিত ছিল। কিন্তু আমাদের ভূমিকে শুধু জঙ্গল বলে ধরে নেওয়া হয়েছে।”
প্রতিবাদ থামেনি
২০১৪ সালে, জাতীয় উদ্যান প্রতিষ্ঠার এক দশক পর, অন্তত ৪৫০ জন নগাজু অধিবাসী একটি আবেদনে স্বাক্ষর করেন।
তাদের অভিযোগ ছিল, জাতীয় উদ্যান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাদের পূর্বপুরুষের জমি কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
এক দশক পেরিয়ে গেলেও সেই বিরোধের সমাধান হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জাতীয় উদ্যান ঘোষণার আগে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফ্রি, প্রায়র অ্যান্ড ইনফর্মড কনসেন্ট (FPIC) নীতি অনুসরণ করা হয়নি। অর্থাৎ, স্থানীয় জনগণের সম্মতি নেওয়া বা তাদের সঙ্গে যথাযথ আলোচনা করা হয়নি।
বিরোধ থেকে অবৈধ স্বর্ণখনি
ভূমি বিরোধের জের ধরে সেবাঙ্গাউর বিতর্কিত এলাকাগুলোতে ধীরে ধীরে অবৈধ স্বর্ণখনির বিস্তার ঘটে।
রাসাউ নদীর তীরজুড়ে অন্তত ১৩টি ঐতিহ্যবাহী স্বর্ণখনি বর্তমানে স্থানীয় বাসিন্দারা পরিচালনা করছেন।
এগুলোই পরবর্তীকালে জাতীয় উদ্যানের আরেকটি বড় পরিবেশগত সংকটে পরিণত হয়।

সোনার খোঁজে বনভূমির গভীরে
পেতাক বাহানদাং গ্রামের শেষ প্রান্ত থেকে রাসাউ নদী ধরে ঐতিহ্যবাহী কাঠের নৌকা বা ক্লোতক-এ প্রায় এক ঘণ্টা এগোলেই শোনা যায় ভারী যন্ত্রপাতির বিকট শব্দ। সেখানে চলছে সোনা উত্তোলনের কাজ। একসময় ঘন পিট বন ছিল যে এলাকায়, এখন সেখানে অসংখ্য ছোট ছোট খনির কার্যক্রম গড়ে উঠেছে।
আরও ভেতরে এগিয়ে গেলে দেখা যায়, এই স্বর্ণ অনুসন্ধান জাতীয় উদ্যানের সীমানার মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে।
সেখানে দেখা হয় আগুস রহমানের সঙ্গে। মধ্য জাভার বাসিন্দা আগুস তাঁর স্ত্রী উইতার সঙ্গে ২০২৩ সাল থেকে একটি পিটভূমিকে স্বর্ণখনিতে রূপান্তর করেছেন। উইতা নগাজু আদিবাসী সম্প্রদায়ের সদস্য।
আগুস বলেন, ভাগ্য ভালো থাকলে মাত্র চার দিনের খননেই তিনি ১২ কোটি রুপিয়া পর্যন্ত আয় করতে পারেন। আগে তেলপাম বাগানে কাজ করে যে আয় হতো, তার তুলনায় এটি বহু গুণ বেশি।
পারদের মারাত্মক ঝুঁকি
স্বর্ণ উত্তোলনের জন্য খনিশ্রমিকরা পারদ (মারকারি) ব্যবহার করছেন। এই বিষাক্ত ধাতু সোনার কণাকে আলাদা করতে কার্যকর হলেও পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
পারদের অবশিষ্টাংশ নদীতে মিশে খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করতে পারে। মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর মাধ্যমে তা মানুষের শরীরেও পৌঁছে যায়।
দীর্ঘদিন পারদের সংস্পর্শে থাকলে কিডনি বিকল হওয়াসহ নানা জটিল রোগ হতে পারে।
‘এটি আমাদের পূর্বপুরুষের জমি’
জাতীয় উদ্যান কর্তৃপক্ষ একাধিকবার আগুসকে খননকাজ বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে।
কিন্তু তিনি কাজ বন্ধ করতে রাজি নন।
তাঁর বক্তব্য,
“কিছুদিন আগে জাতীয় উদ্যানের কর্মকর্তারা এসে বলেছিলেন, নদীর এই এলাকা ছেড়ে দিতে। কিন্তু আমরা কেন ছেড়ে দেব? এটি আমাদের জমি। আমার শ্বশুর ছোটবেলা থেকেই এখানে বড় হয়েছেন। এখানে আমাদের রাবার বাগানও আছে। ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও গ্রহণযোগ্য সমাধান না হলে আমরা এখান থেকে যাব না।”
মহামারির পর সোনার জ্বর
পেতাক বাহানদাং যাওয়ার পথে রাস্তার পাশে বিশাল বিশাল বর্জ্যের স্তূপ চোখে পড়ে। এগুলো স্বর্ণ উত্তোলনের পর ফেলে রাখা মাটি।
স্থানীয়দের ভাষায়, কোভিড-১৯ মহামারির পর সোনার দাম দ্রুত বেড়ে যায়, অন্যদিকে রাবার ও পাম তেলের মতো কৃষিপণ্যের দাম কমে যায়।
ফলে অনেক পরিবার জীবিকার জন্য স্বর্ণ উত্তোলনের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
একসময় নগাজু জনগোষ্ঠী ছোট পরিসরে ঐতিহ্যগতভাবে সোনা সংগ্রহ করত। পাশাপাশি তারা রাবার, বেত ও আগর কাঠের মতো বনজ সম্পদের ওপর নির্ভর করত।
কিন্তু জাতীয় উদ্যান ঘোষণার পর তাদের সেই ঐতিহ্যগত জীবিকার বড় অংশ সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।

‘আমাদের সঙ্গে কেউ কথা বলেনি’
তাসিক পায়াওয়ানের দায়াক প্রধান (দামাং) হারদিয়ান্তো বলেন,
“সরকার কখনো আমাদের সঙ্গে বসে আলোচনা করেনি। তারা শুধু বনের মধ্যে সীমানা চিহ্ন বসিয়ে আমাদের জমি নিজেদের বলে ঘোষণা করেছে।”
তিনি আরও বলেন,
“ফলে আমাদের চাষাবাদের জমি কমে গেছে। জীবিকা নির্বাহের আর কোনো পথ না থাকায় অনেক দায়াক পরিবার স্বর্ণখনিতে কাজ শুরু করেছে। আমরা শুধু দর্শক হয়ে থাকতে চাই না।”
বৃহত্তর সংকট
সেন্ট্রাল কালিমান্তানের ইন্ডিজেনাস পিপলস অ্যালায়েন্স অব দ্য আর্কিপেলাগো (AMAN)-এর প্রধান আলফিয়ানুস জেনেসিয়ুস রিন্টিংয়ের মতে, সেবাঙ্গাউর ভূমি বিরোধ আসলে কালিমান্তানজুড়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের ভূমি হারানোর সমস্যার প্রতিচ্ছবি।
তিনি বলেন,
“ধীরে ধীরে আমাদের জমি দখল হয়েছে। সেই সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে বন, আর বন হারানোর সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের সংস্কৃতি ও পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য।”
তাঁর মতে, জাতীয় উদ্যান ঘোষণার ফলে আদিবাসীদের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
অনেক ক্ষেত্রেই জাতীয় উদ্যান প্রতিষ্ঠার আগে স্থানীয় জনগণের মতামত নেওয়া হয়নি, যদিও সেই সীমানার মধ্যে তাদের শতাব্দীপ্রাচীন বসতি অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তিনি বলেন,
“মনে হয়েছে যেন অফিসে বসেই মানচিত্রে দাগ টেনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বনকে তারা জনশূন্য এলাকা ভেবেছে, অথচ বাস্তবে সেখানে বহু প্রজন্ম ধরে মানুষ বসবাস করছে।”
কর্তৃপক্ষের অবস্থান
সেবাঙ্গাউ জাতীয় উদ্যানের প্রধান রুসওয়ান্তো জানান, স্থানীয় জনগণকে জাতীয় উদ্যানের সীমানা সম্পর্কে সচেতন করতে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে গ্রাম প্রশাসন, পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর সমন্বয়ে অবৈধ স্বর্ণখনির বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
তবে তাঁর মতে, স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে কঠোরতার পাশাপাশি সমঝোতামূলক ও সংলাপনির্ভর পদ্ধতি অনুসরণ করাও জরুরি।
একই সময়ে সংরক্ষণ কার্যক্রমের ফলে সেবাঙ্গাউতে বন্য ওরাংওটাংয়ের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৮ হাজারে পৌঁছেছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এটি পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর সঙ্গে যৌথ সংরক্ষণ উদ্যোগের একটি ইতিবাচক ফল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

জাতীয় উদ্যান থেকে আয়—কার স্বার্থে?
সেবাঙ্গাউ থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে জাকার্তায় এ বছরের শুরুতে ইন্দোনেশিয়া সরকার একটি নতুন ন্যাশনাল পার্ক ফাইন্যান্সিং টাস্ক ফোর্স গঠন করে। এর লক্ষ্য, দেশের বিভিন্ন জাতীয় উদ্যানকে ঘিরে নতুন আয়ের উৎস তৈরি করা।
প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তো এক প্রেসিডেন্সিয়াল ডিক্রির মাধ্যমে এই টাস্ক ফোর্স গঠন করেন। নতুন নীতির আওতায় জাতীয় উদ্যানের নির্দিষ্ট এলাকায় কার্বন বাণিজ্য এবং ইকো-ট্যুরিজম প্রকল্প চালুর সুযোগ রাখা হয়েছে।
টাস্ক ফোর্সের নেতৃত্বে রয়েছেন প্রেসিডেন্টের ছোট ভাই ও খনি ব্যবসায়ী হাশিম জোজোহাদিকুসুমো। তাঁর সঙ্গে বনমন্ত্রী রাজা জুলি আন্তোনি এবং অর্থনীতিবিদ মারি এলকা পাঙ্গেস্তুও নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করছেন।
সরকারের দাবি, রাষ্ট্রের বাজেট দিয়ে সব জাতীয় উদ্যানের কার্যকর ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়। তাই বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের নতুন মডেল গড়ে তোলা হবে।
বন মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক সাত্যাওয়ান পুদিয়াতমোকো বলেন,
“অনেক জাতীয় উদ্যানের ব্যবস্থাপনা এখনো প্রত্যাশিত মানে পৌঁছায়নি। এগুলোর উন্নয়নে বিপুল অর্থের প্রয়োজন, যা শুধু সরকারি বাজেট থেকে জোগান দেওয়া সম্ভব নয়।”
সেবাঙ্গাউও তালিকায়
টাস্ক ফোর্স ইতোমধ্যে ১৩টি জাতীয় উদ্যানকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, যেখানে ভবিষ্যতে কার্বন প্রকল্প ও পরিবেশভিত্তিক পর্যটন চালু করা হবে।
সেবাঙ্গাউও সেই তালিকায় রয়েছে।
কার্বন বাজারে দূষণকারী দেশ বা প্রতিষ্ঠান বন সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারে অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে কার্বন ক্রেডিট কিনে নিজেদের নির্গমন ভারসাম্য করার সুযোগ পায়।
সেবাঙ্গাউর কাছেই বিশ্বের অন্যতম বড় কার্বন প্রকল্প কাতিংগান REDD+ পরিচালিত হচ্ছে। প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর বনভূমি নিয়ে গড়ে ওঠা এই প্রকল্পের কার্বন ক্রেডিট কিনেছে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান শেল এবং নেদারল্যান্ডসের বিমান সংস্থা কেএলএমসহ আরও অনেক কোম্পানি।
পরিবেশবাদীদের আশঙ্কা
ইন্দোনেশিয়ান ইন্ডিপেনডেন্ট ফরেস্ট মনিটরিং নেটওয়ার্ক (JPIK)-এর নির্বাহী পরিচালক মুহাম্মদ ইচওয়ানের মতে, আইন প্রয়োগ দুর্বল থাকলে নতুন অর্থায়ন কাঠামো কোনো স্থায়ী সমাধান আনবে না।
তিনি বলেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করে নতুন প্রকল্প চালু করলে স্থানীয় ও আদিবাসী জনগোষ্ঠী এর সুফল পাবে না। বরং জাতীয় উদ্যান ধ্বংস ও মানুষের বঞ্চনা আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।
অন্যদিকে পানতাউ গামবুত-এর ওয়াহ্যু পেরদানা মনে করেন, বনকে শুধু কার্বনের মূল্য দিয়ে বিচার করা বিপজ্জনক।
তাঁর ভাষায়,
“সংরক্ষিত বনকে শুধু কার্বনের বাজারমূল্যে পরিণত করলে প্রকৃত পরিবেশ পুনরুদ্ধার নিশ্চিত হয় না। এতে বাস্তুতন্ত্রকে একটি পণ্যে পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি হয়।”
তিনি আরও সতর্ক করেন, কার্বন প্রকল্পের নামে বড় বড় বনাঞ্চল সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নিলে সেখানে বসবাসকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠী আরও বেশি উচ্ছেদের মুখে পড়তে পারে।
সরকারের জবাব
এসব সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে সাত্যাওয়ান বলেন, সরকারের উদ্দেশ্য জাতীয় উদ্যানকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা নয়।
বরং পরিবেশ সংরক্ষণ অক্ষুণ্ন রেখে ইকো-ট্যুরিজম ও কার্বন প্রকল্পের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহ করে জাতীয় উদ্যানের ব্যবস্থাপনা উন্নত করা হবে।
তিনি বলেন,
“আমাদের প্রকৃত লক্ষ্য হলো জাতীয় উদ্যানের সুশাসন নিশ্চিত করা, পরিবেশগত সেবার মান উন্নত করা এবং স্থানীয় জনগণ যেন এসব উদ্যান থেকে আরও বেশি উপকৃত হয়, তা নিশ্চিত করা।”

দুই দশকের ক্ষোভ
এ বছরের এপ্রিলের শেষ দিকে পেতাক বাহানদাং গ্রামে নগাজু সম্প্রদায়ের প্রবীণ নেতারা আবারও একত্রিত হন।
তাদের আলোচনার বিষয় ছিল—গত দুই দশকে সেবাঙ্গাউ জাতীয় উদ্যান তাদের জীবনে কী পরিবর্তন এনেছে।
তাদের মতে, এই জাতীয় উদ্যান বনকে রক্ষা করেছে, কিন্তু বননির্ভর মানুষকে নয়।
নগাজু নেতা ডোবে বলেন,
“যদি সরকার সত্যিই আমাদের প্রথাগত আইন ও ভূমির অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে একটি ন্যায্য সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। তা না হলে এই বিরোধ কখনো শেষ হবে না। আমাদের মানুষ তাদের পূর্বপুরুষের অধিকার রক্ষায় লড়াই চালিয়েই যাবে।”
শেষ পর্যন্ত তাঁর আহ্বান ছিল—
“সেবাঙ্গাউ জাতীয় উদ্যান কর্তৃপক্ষ এবং আদিবাসী জনগণের মধ্যে অবশ্যই একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতা তৈরি করতে হবে।”
সেবাঙ্গাউর গল্প শুধু একটি বন বা একটি জাতীয় উদ্যানের গল্প নয়। এটি দেখায়, পরিবেশ সংরক্ষণ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আদিবাসী জনগণের ভূমি অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা কতটা কঠিন।
দুই দশক আগে যে বনকে রক্ষার অঙ্গীকার নিয়ে সেবাঙ্গাউকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়েছিল, আজও সেখানে বন উজাড়, অবৈধ তেলপাম বাগান, স্বর্ণখনি, জমি দখল এবং মানুষের উচ্ছেদ চলছেই। অন্যদিকে সরকার নতুন অর্থায়ন ও কার্বন বাণিজ্যের মাধ্যমে সংরক্ষণ জোরদার করতে চাইছে, আর আদিবাসীরা তাদের পূর্বপুরুষের ভূমির স্বীকৃতি ও ন্যায্য অধিকার দাবি করে চলেছে।
সেবাঙ্গাউর ভবিষ্যৎ তাই নির্ভর করবে শুধু বন রক্ষার ওপর নয়; বরং প্রকৃতি সংরক্ষণ এবং বননির্ভর মানুষের ন্যায়সঙ্গত অধিকার—এই দুইয়ের মধ্যে টেকসই সমন্বয় গড়ে তোলার ওপর।
গেমবং হানুং 


















