বিশ্ব রাজনীতির শক্তির ভারসাম্য দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, যুক্তরাষ্ট্র–চীন সম্পর্কের নতুন সমীকরণ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে অনিশ্চয়তার মধ্যে এশিয়ার মধ্যম শক্তিগুলো নিজেদের অবস্থান নতুনভাবে নির্ধারণের চেষ্টা করছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইন্দোনেশিয়া সফরকে কেবল একটি দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন ভারত ও ইন্দোনেশিয়া নিজেদের সম্পর্ককে আরও গভীর কৌশলগত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর সুযোগ পাচ্ছে।
দীর্ঘ সময় ধরে দুই দেশের সম্পর্ক কখনও ঘনিষ্ঠ হয়েছে, কখনও আবার স্থবিরতার মধ্যে পড়েছে। ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ থাকলেও সেই সম্ভাবনা বাস্তব অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতায় দীর্ঘদিন প্রতিফলিত হয়নি। তবে ২০১৮ সালে বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠার পর এবং বিশেষ করে ২০২৫ সালের শুরুতে প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তোর ভারত সফরের পর দুই দেশের সম্পর্ক নতুন গতি পেয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, এই গতি কি স্থায়ী রূপ নেবে, নাকি অতীতের মতো আবারও সম্ভাবনা অপূর্ণ থেকে যাবে?
এই সফরের গুরুত্ব বোঝার জন্য শুধু ভারত–ইন্দোনেশিয়া সম্পর্কের দিকে তাকালে চলবে না। মোদির এই সফর বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অংশ। একই সফরসূচিতে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড রয়েছে, আর এর আগে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরও আঞ্চলিক কূটনীতির নতুন সক্রিয়তার ইঙ্গিত দিয়েছে। ফলে চারটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশের সঙ্গে ভারতের ধারাবাহিক সংলাপ এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন ইন্দো-প্যাসিফিকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার এবং কোয়াডের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এই বাস্তবতায় ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে সমন্বয় শুধু দ্বিপক্ষীয় নয়, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম শক্তি হলো বড় ধরনের কোনো বিরোধ বা অমীমাংসিত দ্বন্দ্বের অনুপস্থিতি। সীমান্ত, নিরাপত্তা কিংবা রাজনৈতিক প্রশ্নে এমন কোনো জটিলতা নেই, যা সম্পর্কের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে। বরং দুই দেশের নেতৃত্বের মধ্যে ব্যক্তিগত বোঝাপড়াও ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করেছে। প্রবোও ভারতের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন ও প্রশাসনিক রূপান্তরের বিভিন্ন দিককে গুরুত্ব দিয়ে দেখেন, অন্যদিকে মোদি ইন্দোনেশিয়ার বর্তমান নেতৃত্বের ইন্দো-প্যাসিফিক এবং চীন-সম্পর্কিত তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানকে মূল্যায়ন করেন।
তবে কূটনৈতিক সদিচ্ছা একাই যথেষ্ট নয়। সম্পর্কের প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে বাস্তব সহযোগিতার ওপর। রাজনৈতিক যোগাযোগ যতই বাড়ুক, যদি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, জ্বালানি, সমুদ্র নিরাপত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি কিংবা শিক্ষা খাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হয়, তাহলে অংশীদারত্বের ঘোষণাগুলো কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের যৌথ কমিশনের বৈঠক এই বাস্তব দিকটিকেই সামনে এনেছে। সেখানে রাজনৈতিক সহযোগিতা থেকে প্রতিরক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, ওষুধশিল্প, স্বাস্থ্যসেবা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, জ্বালানি, মহাকাশ, যোগাযোগ, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ—প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা পর্যালোচনা করা হয়েছে। এখন প্রয়োজন এই পরিকল্পনাগুলোকে সময়সীমাবদ্ধ বাস্তব কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া।
তবে মোদির সফরের প্রকৃত তাৎপর্য আরও গভীরে নিহিত। বিশ্বব্যবস্থা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে কেবল অর্থনৈতিক সম্পর্ক নয়, আন্তর্জাতিক ঘটনাবলি সম্পর্কে অভিন্ন বা অন্তত ঘনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ইউক্রেন যুদ্ধ এবং উপসাগরীয় সংঘাত আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে নতুনভাবে বিভক্ত করেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্ভাব্য সম্পর্কোন্নয়ন যদি আরও এগোয়, তবে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্যেও তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় ভারত ও ইন্দোনেশিয়া উভয়ই এমন দুটি রাষ্ট্র, যারা নিজেদের স্বাধীন কৌশলগত অবস্থান বজায় রাখতে আগ্রহী। তারা কোনো একক শক্তির অনুসারী হতে চায় না; বরং বহুমাত্রিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে চায়। এই অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ভবিষ্যতে তাদের সহযোগিতাকে আরও অর্থবহ করে তুলতে পারে।
এশিয়ার ভবিষ্যৎ শুধু বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্ধারিত হবে না। বরং ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তিগুলো কতটা কার্যকরভাবে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তুলতে পারে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। যদি বর্তমান রাজনৈতিক সদিচ্ছা বাস্তব নীতি, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব এবং নিরাপত্তা সহযোগিতায় রূপ নেয়, তাহলে এই সম্পর্ক শুধু দুই দেশের জন্য নয়, সমগ্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্যও নতুন কৌশলগত ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
সেই কারণেই মোদির জাকার্তা সফর একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফরের চেয়ে অনেক বেশি। এটি এমন এক পরীক্ষার মুহূর্ত, যেখানে দেখা যাবে ভারত ও ইন্দোনেশিয়া অতীতের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে ভবিষ্যতের জন্য সত্যিকার অর্থে একটি শক্তিশালী কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে পারে কি না।
রাজীব ভাটিয়া 


















