বিশ্বের নিরাপত্তা রাজনীতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সামরিক শক্তির পরিমাপ আর শুধু যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ কিংবা ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। আজকের প্রতিযোগিতা নির্ধারিত হচ্ছে কে দ্রুত নতুন প্রযুক্তি তৈরি করতে পারে, কে দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে পারে এবং সবচেয়ে বড় কথা—কে নির্ভরযোগ্য অংশীদারদের সঙ্গে মিলিত হয়ে একটি কার্যকর উদ্ভাবনী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারে। যে রাষ্ট্র এই বাস্তবতা বুঝতে ব্যর্থ হবে, তার অর্থনৈতিক শক্তি কিংবা সামরিক ঐতিহ্য একসময় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে।
গত কয়েক বছরে ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের উত্তেজনা একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—আধুনিক যুদ্ধ কেবল অস্ত্রের লড়াই নয়, এটি শিল্প, প্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা এবং উদ্ভাবনের সক্ষমতারও প্রতিযোগিতা। একটি দেশ যত শক্তিশালীই হোক না কেন, দীর্ঘমেয়াদি উচ্চমাত্রার সংঘাতে একা প্রয়োজনীয় অস্ত্র, ড্রোন, গোলাবারুদ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থা কিংবা উন্নত ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
এই বাস্তবতার বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার বহু মিত্র এখনও প্রতিরক্ষা খাতকে মূলত জাতীয় শিল্পনীতি হিসেবে পরিচালনা করছে। প্রতিটি দেশ নিজেদের কারখানা, নিজস্ব সরবরাহব্যবস্থা এবং নিজস্ব প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই এর পেছনে রাজনৈতিক কারণ রয়েছে। সরকারগুলো কর্মসংস্থান ধরে রাখতে চায়, কৌশলগত শিল্পকে দেশের ভেতরে রাখতে চায় এবং বিদেশি নির্ভরতা কমাতে চায়। কিন্তু এই নীতির একটি বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এতে একই ধরনের প্রযুক্তির পুনরাবৃত্তি ঘটে, বিনিয়োগ ছড়িয়ে যায় এবং উদ্ভাবনের গতি কমে।
অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলো ভিন্ন পথে এগোচ্ছে। রাশিয়া, ইরান, উত্তর কোরিয়া ও চীনের মধ্যে প্রযুক্তি, অস্ত্র, শিল্প এবং কৌশলগত সহযোগিতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় গভীর হয়েছে। এক দেশের ড্রোন প্রযুক্তি অন্য দেশের উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, আবার আরেক দেশের সামরিক অভিজ্ঞতা প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করছে। এই সমন্বিত মডেল তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অথচ যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের হাতে আরও বড় একটি সম্পদ রয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি কোম্পানি, বিনিয়োগ তহবিল এবং উদ্ভাবনী স্টার্টআপের বড় অংশই এই দেশগুলোর মধ্যে অবস্থিত। সমস্যা সম্পদের অভাব নয়; সমস্যা এই সম্পদগুলোকে একসঙ্গে কাজে লাগানোর অক্ষমতা।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রচলিত ধারণা দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কের ওপর নির্ভর করেছে। অস্ত্র বিক্রি, যৌথ মহড়া কিংবা সামরিক চুক্তিই ছিল সহযোগিতার প্রধান মাধ্যম। কিন্তু প্রযুক্তির যুগে এই কাঠামো যথেষ্ট নয়। কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন, সাইবার নিরাপত্তা বা মহাকাশভিত্তিক প্রযুক্তির উদ্ভাবন এখন মূলত বেসরকারি খাতে হচ্ছে। যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত বহু প্রযুক্তির জন্ম হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে কিংবা ছোট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে, সরকারি প্রতিরক্ষা কারখানায় নয়।
ফলে প্রতিরক্ষা উদ্ভাবনের কেন্দ্রবিন্দুও বদলে যাচ্ছে। আজকের প্রশ্ন হলো, কোন সরকার সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করছে তা নয়; বরং কোন দেশ এমন পরিবেশ তৈরি করতে পারছে যেখানে বিভিন্ন দেশের গবেষক, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করতে পারবে।
এ ধরনের সহযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো এর স্থায়িত্ব। রাজনৈতিক সরকার বদলায়, কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়, কিন্তু ব্যবসায়িক ও গবেষণাভিত্তিক অংশীদারিত্ব অনেক সময় দীর্ঘস্থায়ী হয়। একটি যৌথ প্রযুক্তি প্রকল্প বা গবেষণা নেটওয়ার্ক কয়েক বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতাও টিকে থাকতে পারে। ফলে নিরাপত্তা সহযোগিতা শুধু কূটনীতির ওপর নির্ভরশীল থাকে না; এর সঙ্গে যুক্ত হয় অর্থনীতি, শিল্প এবং জ্ঞানভিত্তিক সম্পর্ক।

বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর কিছু ইতিবাচক উদাহরণ দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে ড্রোন, পানির নিচের স্বয়ংক্রিয় যান, সেন্সর প্রযুক্তি কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সামরিক ব্যবস্থা তৈরি করছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যেও যৌথ গবেষণা বাড়ছে। তবে এগুলো এখনও বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ। এগুলোকে বৃহত্তর কৌশলগত কাঠামোর অংশে পরিণত করা যায়নি।
এখানেই নীতিনির্ধারকদের বড় ভূমিকা রয়েছে। সরকার চাইলে এমন নিয়ম তৈরি করতে পারে যাতে বিশ্বস্ত অংশীদার দেশের কোম্পানিগুলো সহজে যৌথ গবেষণা করতে পারে, প্রযুক্তি বিনিময় করতে পারে এবং প্রতিরক্ষা বাজারে প্রবেশের সুযোগ পায়। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে যৌথ উৎপাদনকে উৎসাহিত করা সম্ভব।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে জাতীয় নিরাপত্তা কিংবা সংবেদনশীল প্রযুক্তির সুরক্ষা উপেক্ষা করতে হবে। বরং সহযোগিতার ক্ষেত্রটি হতে হবে বিশ্বাসযোগ্য ও অভিন্ন মূল্যবোধসম্পন্ন দেশগুলোর মধ্যে। প্রযুক্তি যেন প্রতিপক্ষের হাতে না যায়, সে জন্য রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, তথ্য নিরাপত্তা এবং মেধাস্বত্ব সুরক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। সহযোগিতা ও নিরাপত্তা—দুটি লক্ষ্যকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়াই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।
আধুনিক প্রতিরক্ষা শিল্পে প্রতিযোগিতাও নতুনভাবে ভাবতে হবে। বহু দেশে কয়েকটি বড় কোম্পানি কার্যত পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। এতে নতুন উদ্যোক্তা বা উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠান প্রবেশের সুযোগ কমে যায়। অথচ বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন প্রায়ই আসে ছোট প্রতিষ্ঠান বা নতুন গবেষণা উদ্যোগ থেকে। তাই প্রকৃত প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করতে সরকারি ক্রয়নীতি এমন হতে হবে, যাতে ছোট কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক উদ্ভাবন কিংবা নতুন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও সমান সুযোগ পায়।
এছাড়া আন্তঃসামঞ্জস্য বা ইন্টারঅপারেবিলিটিও ভবিষ্যতের অন্যতম শর্ত। মিত্র দেশগুলোর তৈরি অস্ত্র, সফটওয়্যার এবং যোগাযোগব্যবস্থা যদি একে অপরের সঙ্গে কাজ না করে, তাহলে যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামোর কার্যকারিতা কমে যাবে। এজন্য শুরু থেকেই উন্মুক্ত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড, অভিন্ন সফটওয়্যার স্থাপত্য এবং সমন্বিত প্রকৌশল নীতি গ্রহণ জরুরি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সরবরাহব্যবস্থা। সাম্প্রতিক বছরগুলো দেখিয়েছে, কাঁচামাল, বিরল খনিজ, সেমিকন্ডাক্টর কিংবা বিশেষায়িত যন্ত্রাংশের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে উন্নত অস্ত্র উৎপাদনও থেমে যেতে পারে। ফলে প্রতিরক্ষা শিল্পকে শুধু কারখানার প্রশ্ন হিসেবে দেখা যাবে না; এটি বৈশ্বিক সরবরাহ নেটওয়ার্কেরও প্রশ্ন। নির্ভরযোগ্য অংশীদারদের মধ্যে উৎপাদন ছড়িয়ে দিলে ঝুঁকি কমে এবং যুদ্ধকালেও উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।
এই প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মধ্যে একটি ভারসাম্য খুঁজে বের করতে হবে। নিজের দেশের শিল্পকে শক্তিশালী করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটি যদি আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বকে বাধাগ্রস্ত করে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি। কারণ আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির প্রতিটি উপাদান এক দেশে তৈরি হওয়া বাস্তবসম্মত নয়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কেবল অস্ত্র উৎপাদনের নয়; এটি বিশ্বাস, সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্বের। যে রাষ্ট্রগুলো নিজেদের সক্ষমতাকে অন্যদের শক্তির সঙ্গে যুক্ত করতে পারবে, তারাই ভবিষ্যতের প্রতিরক্ষা প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে। আর যারা এখনও একক আত্মনির্ভরতার পুরোনো ধারণায় আটকে থাকবে, তারা প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের গতি এবং বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে তাল মেলাতে ক্রমেই হিমশিম খাবে।
একবিংশ শতাব্দীর নিরাপত্তা পরিবেশ আমাদের একটি মৌলিক শিক্ষা দিচ্ছে—যুদ্ধের প্রস্তুতি আর একক কোনো রাষ্ট্রের প্রকল্প নয়। এটি উদ্ভাবন, শিল্প, গবেষণা, প্রযুক্তি ও বিশ্বস্ত অংশীদারদের সম্মিলিত শক্তিকে কাজে লাগানোর একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। ভবিষ্যতের প্রতিরক্ষা প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হবে সেই পক্ষ, যারা নিজেদের সামরিক শক্তির পাশাপাশি একটি বিস্তৃত আন্তর্জাতিক উদ্ভাবনী বাস্তুতন্ত্র গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
টোবিয়াস ভেস্টনার 


















