০৩:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬
ঢাকাজুড়ে টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা, দুর্ভোগে নগরবাসী; আরও ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস মাঠজুড়ে ধীর পায়ে হাঁটা, কিন্তু সিদ্ধান্তের মুহূর্তে বজ্রপাত: মেসির ফুটবল বুদ্ধির প্রকৃত রহস্য বন্যার কারণে চট্টগ্রাম বোর্ডের ১৩, ১৫ ও ১৬ জুলাইয়ের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত দেশে ফেরার ঘোষণা দেওয়ার সাহসই রাষ্ট্রের ব্যর্থতা: তাজুল ইসলাম অন্ধকারের টানে বাড়ছে তারাদেখা ভ্রমণ, বিশ্বজুড়ে নতুন পর্যটন প্রবণতার উত্থান মুখের ইতিহাসে লুকিয়ে মানুষের পরিচয়, সৌন্দর্য ও সমাজের বদলে যাওয়া গল্প নিলামে পুরোনো চিত্রকর্মের জোয়ার: শতাব্দীপ্রাচীন শিল্পকর্মে ফিরছে সংগ্রাহকদের আগ্রহ পিলাটেসে বিশ্বজুড়ে নতুন উন্মাদনা, কেন হঠাৎ এত জনপ্রিয় এই ব্যায়াম? ট্রাম্পকে ঘিরে নতুন বইয়ের আলোড়ন, বাস্তবতা নাকি কল্পনার জগতে হোয়াইট হাউস? খরার মধ্যেও অটল বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু গাছ, বিস্ময়কর অভিযোজনের নতুন রহস্য উন্মোচন

মাঠজুড়ে ধীর পায়ে হাঁটা, কিন্তু সিদ্ধান্তের মুহূর্তে বজ্রপাত: মেসির ফুটবল বুদ্ধির প্রকৃত রহস্য

লিওনেল মেসিকে দেখলে অনেক সময় মনে হয়, তিনি যেন ম্যাচের তীব্রতার বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। অন্যরা দৌড়াচ্ছে, প্রেস করছে, ছুটে বেড়াচ্ছে; আর তিনি ধীরে ধীরে হাঁটছেন, কখনও বা স্থির হয়ে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করছেন। আধুনিক ফুটবলে, যেখানে গতি, উচ্চ-তীব্রতার প্রেসিং এবং অবিরাম দৌড়কে সাফল্যের প্রধান শর্ত হিসেবে ধরা হয়, সেখানে মেসির এই উপস্থিতি যেন প্রচলিত ধারণার বিপরীত।

কিন্তু এই দৃশ্যই বিভ্রান্তিকর। কারণ মেসির ফুটবল কখনওই দৌড়ের পরিমাপে ব্যাখ্যা করা যায় না। তিনি বলের কাছে যতটা কার্যকর, বলের বাইরে থেকেও ততটাই প্রভাবশালী। তাঁর ধীর গতি আসলে অলসতা নয়; এটি একটি পরিকল্পিত কৌশল, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপের লক্ষ্য থাকে প্রতিপক্ষের সংগঠনকে ভেঙে দেওয়া।

ফুটবলের ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তি খেলোয়াড় ছিলেন, যারা গতি দিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন। আবার কেউ কেউ শক্তি বা শারীরিক সামর্থ্য দিয়ে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। মেসি অন্য পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি প্রতিপক্ষের গতিকে নিজের অস্ত্র বানিয়েছেন। যত বেশি প্রতিপক্ষ দৌড়ায়, তত বেশি তাদের অবস্থান বদলায়। আর সেই পরিবর্তনের মধ্যেই তিনি খুঁজে নেন আক্রমণের সবচেয়ে দুর্বল ফাঁক।

এ কারণেই তাঁর হাঁটা কখনও উদ্দেশ্যহীন নয়। বরং এটি তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া। মাঠের প্রতিটি নড়াচড়া, ডিফেন্ডারদের অবস্থান, মিডফিল্ডের ফাঁকা জায়গা, আক্রমণভাগের দৌড়—সবকিছু তিনি যেন নীরবে বিশ্লেষণ করেন। অন্যরা যেখানে বলের দিকে তাকিয়ে থাকে, মেসি সেখানে পুরো মাঠের মানচিত্র পড়েন।

The Genius of Lionel Messi Just Walking Around | The New Yorker

এই অসাধারণ স্থান-অনুভূতিই তাঁকে আলাদা করে। তিনি এমন জায়গায় অবস্থান নেন, যেখানে প্রতিপক্ষের কেউ নিশ্চিত হতে পারে না—তাঁকে কে মার্ক করবে। মিডফিল্ডার এগোলে ডিফেন্সে ফাঁক তৈরি হয়, ডিফেন্ডার সামনে এলে পেছনে জায়গা খালি হয়ে যায়। ফলে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে তিনি সিদ্ধান্তের সংকটে ঠেলে দেন। আর ফুটবলে অনেক সময় ভুল সিদ্ধান্তই একটি ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে।

মেসির এই কৌশল আরও কার্যকর হয় যখন তাঁর সতীর্থরা ক্রমাগত দৌড়ে প্রতিপক্ষকে একদিকে টেনে নিয়ে যায়। তিনি নিজে অপ্রয়োজনীয়ভাবে সেই দৌড়ে অংশ নেন না। বরং অপেক্ষা করেন। যখন রক্ষণভাগের ভারসাম্য নষ্ট হয়, তখন মাত্র কয়েকটি পদক্ষেপে তিনি নিজেকে এমন অবস্থানে নিয়ে যান, যেখানে একটি পাসই পুরো ম্যাচের চিত্র পাল্টে দিতে পারে।

এই কারণেই তাঁর হাঁটা কখনও নিষ্ক্রিয়তা নয়; এটি সক্রিয় প্রস্তুতি।

বয়স অবশ্যই মেসির খেলায় পরিবর্তন এনেছে। তরুণ বয়সের বিস্ফোরক গতি বা দীর্ঘ ড্রিবল এখন আগের মতো দেখা যায় না। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি কখনও কেবল গতি ছিল না। তাঁর প্রকৃত শক্তি ছিল কখন গতি বাড়াতে হবে, আর কখন সেটিকে আটকে রাখতে হবে—এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।

এমন একজন খেলোয়াড়ের জন্য শক্তি সংরক্ষণও কৌশলের অংশ। পুরো ম্যাচ জুড়ে সমান তীব্রতায় দৌড়ানোর বদলে তিনি অপেক্ষা করেন সেই কয়েকটি মুহূর্তের জন্য, যখন একটি ত্বরিত দৌড়, একটি টার্ন বা একটি নিখুঁত ফিনিশ পুরো ম্যাচের ফল নির্ধারণ করতে পারে। অন্যদের মতো তিনি সুযোগ তৈরি করতে দৌড়ান না; বরং সুযোগ তৈরি হওয়ার মুহূর্তটি আগেভাগেই চিনে ফেলেন।

😳 Lionel Messi's genius isn't just in his feet, but in a “spatial x-ray” mind that processes the pitch faster than anyone else. Often criticized for walking, this low-energy “lull” is actually

এই মানসিক প্রস্তুতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ধৈর্য। আধুনিক ফুটবলে অনেক খেলোয়াড়ই প্রতিটি আক্রমণে নিজেকে জড়াতে চান। মেসি তেমন নন। তিনি জানেন, সব মুহূর্ত সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়। ফলে তিনি অপেক্ষা করেন সেই আক্রমণের জন্য, যেখানে তাঁর উপস্থিতির মূল্য সবচেয়ে বেশি।

এই ধৈর্যই তাঁকে অফসাইড ফাঁদ থেকেও আলাদা সুবিধা দেয়। তিনি প্রায়ই রক্ষণভাগের সামনে অস্থিরভাবে দৌড়ান না। বরং এমনভাবে নিজের অবস্থান বদলান, যাতে প্রতিপক্ষ একসময় তাঁকে চোখের আড়াল করে ফেলে। তারপর ঠিক সময়ে একটি ছোট্ট গতি পরিবর্তন তাঁকে আবার খেলায় ফিরিয়ে আনে। সেই মুহূর্তে ডিফেন্ডারদের প্রতিক্রিয়া জানানোর সময়ই থাকে না।

প্রতিপক্ষের জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। তাঁকে কাছ থেকে মার্ক করতে গেলে পেছনে জায়গা তৈরি হয়। আবার দূরে থাকলে তিনি সহজেই বল গ্রহণ করে আক্রমণ শুরু করতে পারেন। অর্থাৎ তাঁকে আটকানোর প্রতিটি উপায়ের মধ্যেই নতুন ঝুঁকি লুকিয়ে থাকে।

এ কারণেই বিশ্বের সেরা ডিফেন্ডাররাও বছরের পর বছর ধরে স্বীকার করেছেন, মেসিকে থামানোর জন্য শুধু ব্যক্তিগত দক্ষতা যথেষ্ট নয়। পুরো দলের সমন্বয় দরকার। কারণ তিনি এমনভাবে নিজেকে অবস্থান করান, যেখানে একজনের ভুল পুরো রক্ষণব্যবস্থাকে বিপদে ফেলে দিতে পারে।

তবে তাঁর এই খেলায় একটি মূল্যও রয়েছে। বল হারানোর পর তিনি আগের মতো আক্রমণাত্মক প্রেসিং করেন না। রক্ষণে ফিরেও খুব বেশি কাজ করেন না। ফলে তাঁর সতীর্থদের অতিরিক্ত দায়িত্ব নিতে হয়। আধুনিক ফুটবলের অনেক কোচের কাছে এটি বড় আপস বলে মনে হতে পারে।

Messi inspires Argentina great escape over Egypt - New Straits Times Online

কিন্তু আর্জেন্টিনা বহুদিন ধরেই অন্য হিসাব করেছে। তারা বুঝেছে, মেসির কাছ থেকে পুরো মাঠে সমান শ্রম আদায় করার চেয়ে শেষ তৃতীয়াংশে তাঁর সৃজনশীলতাকে অক্ষুণ্ন রাখা অনেক বেশি লাভজনক। যদি দলের অন্য দশজনকে কিছুটা বেশি দৌড়াতে হয়, তবুও সেই মূল্য তারা দিতে প্রস্তুত। কারণ ম্যাচের নির্ণায়ক মুহূর্তে একজন মেসির অবদান প্রায়ই পুরো দলের অতিরিক্ত পরিশ্রমকে সার্থক করে তোলে।

এই দর্শন আসলে ফুটবলের একটি বড় সত্যও তুলে ধরে। সব অবদান সমানভাবে দৃশ্যমান নয়। কেউ দৌড়ে ম্যাচ বদলায়, কেউ শক্তি দিয়ে, আবার কেউ কেবল সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় উপস্থিত থেকে।

মেসি সেই বিরল শ্রেণির খেলোয়াড়, যিনি সময় ও স্থান—এই দুই উপাদানকে অন্যদের চেয়ে ভিন্নভাবে ব্যবহার করেন। তাঁর কাছে হাঁটা মানে বিশ্রাম নয়, পর্যবেক্ষণ। স্থির থাকা মানে নিষ্ক্রিয়তা নয়, হিসাব কষা। আর হঠাৎ গতি বাড়ানো মানে কেবল দৌড় নয়, প্রতিপক্ষের সমস্ত প্রস্তুতিকে এক মুহূর্তে অকার্যকর করে দেওয়া।

এই কারণেই তাঁর খেলা বাইরে থেকে যত ধীর মনে হয়, ভেতরে তত দ্রুত। তাঁর শরীর হয়তো আগের মতো ছুটে চলে না, কিন্তু তাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়ার গতি, স্থান বোঝার ক্ষমতা এবং প্রতিপক্ষের দুর্বলতা শনাক্ত করার দক্ষতা এখনও বিশ্বের সেরাদের মধ্যে।

ফুটবলে অনেক খেলোয়াড় বলের সঙ্গে দ্রুত। মেসি তারও আগে দ্রুত—তিনি দ্রুত চিন্তা করেন। আর সেই কারণেই মাঠজুড়ে তাঁর দীর্ঘ হাঁটা কখনও সময় নষ্ট নয়; সেটিই আসলে তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।

জনপ্রিয় সংবাদ

ঢাকাজুড়ে টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা, দুর্ভোগে নগরবাসী; আরও ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস

মাঠজুড়ে ধীর পায়ে হাঁটা, কিন্তু সিদ্ধান্তের মুহূর্তে বজ্রপাত: মেসির ফুটবল বুদ্ধির প্রকৃত রহস্য

০২:০৪:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬

লিওনেল মেসিকে দেখলে অনেক সময় মনে হয়, তিনি যেন ম্যাচের তীব্রতার বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। অন্যরা দৌড়াচ্ছে, প্রেস করছে, ছুটে বেড়াচ্ছে; আর তিনি ধীরে ধীরে হাঁটছেন, কখনও বা স্থির হয়ে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করছেন। আধুনিক ফুটবলে, যেখানে গতি, উচ্চ-তীব্রতার প্রেসিং এবং অবিরাম দৌড়কে সাফল্যের প্রধান শর্ত হিসেবে ধরা হয়, সেখানে মেসির এই উপস্থিতি যেন প্রচলিত ধারণার বিপরীত।

কিন্তু এই দৃশ্যই বিভ্রান্তিকর। কারণ মেসির ফুটবল কখনওই দৌড়ের পরিমাপে ব্যাখ্যা করা যায় না। তিনি বলের কাছে যতটা কার্যকর, বলের বাইরে থেকেও ততটাই প্রভাবশালী। তাঁর ধীর গতি আসলে অলসতা নয়; এটি একটি পরিকল্পিত কৌশল, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপের লক্ষ্য থাকে প্রতিপক্ষের সংগঠনকে ভেঙে দেওয়া।

ফুটবলের ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তি খেলোয়াড় ছিলেন, যারা গতি দিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন। আবার কেউ কেউ শক্তি বা শারীরিক সামর্থ্য দিয়ে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। মেসি অন্য পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি প্রতিপক্ষের গতিকে নিজের অস্ত্র বানিয়েছেন। যত বেশি প্রতিপক্ষ দৌড়ায়, তত বেশি তাদের অবস্থান বদলায়। আর সেই পরিবর্তনের মধ্যেই তিনি খুঁজে নেন আক্রমণের সবচেয়ে দুর্বল ফাঁক।

এ কারণেই তাঁর হাঁটা কখনও উদ্দেশ্যহীন নয়। বরং এটি তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া। মাঠের প্রতিটি নড়াচড়া, ডিফেন্ডারদের অবস্থান, মিডফিল্ডের ফাঁকা জায়গা, আক্রমণভাগের দৌড়—সবকিছু তিনি যেন নীরবে বিশ্লেষণ করেন। অন্যরা যেখানে বলের দিকে তাকিয়ে থাকে, মেসি সেখানে পুরো মাঠের মানচিত্র পড়েন।

The Genius of Lionel Messi Just Walking Around | The New Yorker

এই অসাধারণ স্থান-অনুভূতিই তাঁকে আলাদা করে। তিনি এমন জায়গায় অবস্থান নেন, যেখানে প্রতিপক্ষের কেউ নিশ্চিত হতে পারে না—তাঁকে কে মার্ক করবে। মিডফিল্ডার এগোলে ডিফেন্সে ফাঁক তৈরি হয়, ডিফেন্ডার সামনে এলে পেছনে জায়গা খালি হয়ে যায়। ফলে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে তিনি সিদ্ধান্তের সংকটে ঠেলে দেন। আর ফুটবলে অনেক সময় ভুল সিদ্ধান্তই একটি ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে।

মেসির এই কৌশল আরও কার্যকর হয় যখন তাঁর সতীর্থরা ক্রমাগত দৌড়ে প্রতিপক্ষকে একদিকে টেনে নিয়ে যায়। তিনি নিজে অপ্রয়োজনীয়ভাবে সেই দৌড়ে অংশ নেন না। বরং অপেক্ষা করেন। যখন রক্ষণভাগের ভারসাম্য নষ্ট হয়, তখন মাত্র কয়েকটি পদক্ষেপে তিনি নিজেকে এমন অবস্থানে নিয়ে যান, যেখানে একটি পাসই পুরো ম্যাচের চিত্র পাল্টে দিতে পারে।

এই কারণেই তাঁর হাঁটা কখনও নিষ্ক্রিয়তা নয়; এটি সক্রিয় প্রস্তুতি।

বয়স অবশ্যই মেসির খেলায় পরিবর্তন এনেছে। তরুণ বয়সের বিস্ফোরক গতি বা দীর্ঘ ড্রিবল এখন আগের মতো দেখা যায় না। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি কখনও কেবল গতি ছিল না। তাঁর প্রকৃত শক্তি ছিল কখন গতি বাড়াতে হবে, আর কখন সেটিকে আটকে রাখতে হবে—এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।

এমন একজন খেলোয়াড়ের জন্য শক্তি সংরক্ষণও কৌশলের অংশ। পুরো ম্যাচ জুড়ে সমান তীব্রতায় দৌড়ানোর বদলে তিনি অপেক্ষা করেন সেই কয়েকটি মুহূর্তের জন্য, যখন একটি ত্বরিত দৌড়, একটি টার্ন বা একটি নিখুঁত ফিনিশ পুরো ম্যাচের ফল নির্ধারণ করতে পারে। অন্যদের মতো তিনি সুযোগ তৈরি করতে দৌড়ান না; বরং সুযোগ তৈরি হওয়ার মুহূর্তটি আগেভাগেই চিনে ফেলেন।

😳 Lionel Messi's genius isn't just in his feet, but in a “spatial x-ray” mind that processes the pitch faster than anyone else. Often criticized for walking, this low-energy “lull” is actually

এই মানসিক প্রস্তুতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ধৈর্য। আধুনিক ফুটবলে অনেক খেলোয়াড়ই প্রতিটি আক্রমণে নিজেকে জড়াতে চান। মেসি তেমন নন। তিনি জানেন, সব মুহূর্ত সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়। ফলে তিনি অপেক্ষা করেন সেই আক্রমণের জন্য, যেখানে তাঁর উপস্থিতির মূল্য সবচেয়ে বেশি।

এই ধৈর্যই তাঁকে অফসাইড ফাঁদ থেকেও আলাদা সুবিধা দেয়। তিনি প্রায়ই রক্ষণভাগের সামনে অস্থিরভাবে দৌড়ান না। বরং এমনভাবে নিজের অবস্থান বদলান, যাতে প্রতিপক্ষ একসময় তাঁকে চোখের আড়াল করে ফেলে। তারপর ঠিক সময়ে একটি ছোট্ট গতি পরিবর্তন তাঁকে আবার খেলায় ফিরিয়ে আনে। সেই মুহূর্তে ডিফেন্ডারদের প্রতিক্রিয়া জানানোর সময়ই থাকে না।

প্রতিপক্ষের জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। তাঁকে কাছ থেকে মার্ক করতে গেলে পেছনে জায়গা তৈরি হয়। আবার দূরে থাকলে তিনি সহজেই বল গ্রহণ করে আক্রমণ শুরু করতে পারেন। অর্থাৎ তাঁকে আটকানোর প্রতিটি উপায়ের মধ্যেই নতুন ঝুঁকি লুকিয়ে থাকে।

এ কারণেই বিশ্বের সেরা ডিফেন্ডাররাও বছরের পর বছর ধরে স্বীকার করেছেন, মেসিকে থামানোর জন্য শুধু ব্যক্তিগত দক্ষতা যথেষ্ট নয়। পুরো দলের সমন্বয় দরকার। কারণ তিনি এমনভাবে নিজেকে অবস্থান করান, যেখানে একজনের ভুল পুরো রক্ষণব্যবস্থাকে বিপদে ফেলে দিতে পারে।

তবে তাঁর এই খেলায় একটি মূল্যও রয়েছে। বল হারানোর পর তিনি আগের মতো আক্রমণাত্মক প্রেসিং করেন না। রক্ষণে ফিরেও খুব বেশি কাজ করেন না। ফলে তাঁর সতীর্থদের অতিরিক্ত দায়িত্ব নিতে হয়। আধুনিক ফুটবলের অনেক কোচের কাছে এটি বড় আপস বলে মনে হতে পারে।

Messi inspires Argentina great escape over Egypt - New Straits Times Online

কিন্তু আর্জেন্টিনা বহুদিন ধরেই অন্য হিসাব করেছে। তারা বুঝেছে, মেসির কাছ থেকে পুরো মাঠে সমান শ্রম আদায় করার চেয়ে শেষ তৃতীয়াংশে তাঁর সৃজনশীলতাকে অক্ষুণ্ন রাখা অনেক বেশি লাভজনক। যদি দলের অন্য দশজনকে কিছুটা বেশি দৌড়াতে হয়, তবুও সেই মূল্য তারা দিতে প্রস্তুত। কারণ ম্যাচের নির্ণায়ক মুহূর্তে একজন মেসির অবদান প্রায়ই পুরো দলের অতিরিক্ত পরিশ্রমকে সার্থক করে তোলে।

এই দর্শন আসলে ফুটবলের একটি বড় সত্যও তুলে ধরে। সব অবদান সমানভাবে দৃশ্যমান নয়। কেউ দৌড়ে ম্যাচ বদলায়, কেউ শক্তি দিয়ে, আবার কেউ কেবল সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় উপস্থিত থেকে।

মেসি সেই বিরল শ্রেণির খেলোয়াড়, যিনি সময় ও স্থান—এই দুই উপাদানকে অন্যদের চেয়ে ভিন্নভাবে ব্যবহার করেন। তাঁর কাছে হাঁটা মানে বিশ্রাম নয়, পর্যবেক্ষণ। স্থির থাকা মানে নিষ্ক্রিয়তা নয়, হিসাব কষা। আর হঠাৎ গতি বাড়ানো মানে কেবল দৌড় নয়, প্রতিপক্ষের সমস্ত প্রস্তুতিকে এক মুহূর্তে অকার্যকর করে দেওয়া।

এই কারণেই তাঁর খেলা বাইরে থেকে যত ধীর মনে হয়, ভেতরে তত দ্রুত। তাঁর শরীর হয়তো আগের মতো ছুটে চলে না, কিন্তু তাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়ার গতি, স্থান বোঝার ক্ষমতা এবং প্রতিপক্ষের দুর্বলতা শনাক্ত করার দক্ষতা এখনও বিশ্বের সেরাদের মধ্যে।

ফুটবলে অনেক খেলোয়াড় বলের সঙ্গে দ্রুত। মেসি তারও আগে দ্রুত—তিনি দ্রুত চিন্তা করেন। আর সেই কারণেই মাঠজুড়ে তাঁর দীর্ঘ হাঁটা কখনও সময় নষ্ট নয়; সেটিই আসলে তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।