বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু উষ্ণমণ্ডলীয় গাছ ডিপটেরোকার্প দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের কেন্দ্র। এত উঁচু গাছ কীভাবে মাটি থেকে শত মিটার ওপরে থাকা পাতায় পর্যাপ্ত পানি পৌঁছে দেয়, তা নিয়ে নানা ধারণা ছিল। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রকৃতির অসাধারণ অভিযোজন ক্ষমতার কারণে এই বিশাল গাছগুলো খরার সময়ও তুলনামূলকভাবে নিরাপদ থাকতে পারে।
উচ্চতা যেমন সুবিধা, তেমনি বড় চ্যালেঞ্জ
১০০ মিটারেরও বেশি উঁচু ডিপটেরোকার্প গাছ সূর্যালোক পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় সুবিধা ভোগ করে। আশপাশের অন্য গাছকে ছাপিয়ে ওপরে উঠে যাওয়ায় এগুলো বেশি আলো সংগ্রহ করতে পারে। তবে এত উচ্চতায় পানি পৌঁছে দেওয়া সহজ নয়। গাছ যত উঁচু হয়, শিকড় থেকে পাতা পর্যন্ত পানি পরিবহনের চাপও তত বেড়ে যায়। এতদিন ধারণা ছিল, এই কারণেই বড় গাছগুলো খরার সময় বেশি ঝুঁকিতে পড়ে।
গাছের ভেতরের প্রাকৃতিক পানি পরিবহন ব্যবস্থা
গাছের কাণ্ডের ভেতরে থাকা জাইলেম নামের বিশেষ নালির মাধ্যমে শিকড় থেকে পাতায় পানি পৌঁছায়। প্রাণীদের মতো গাছের কোনো হৃদ্যন্ত্র নেই। পাতার মাধ্যমে পানি বাষ্প হয়ে বেরিয়ে যাওয়ার ফলে এক ধরনের টান তৈরি হয়, যা নিচ থেকে নতুন পানি ওপরে তুলে আনে। পানির অণুগুলোর পারস্পরিক আকর্ষণ এবং জাইলেমের দেয়ালের সঙ্গে তাদের সংযোগ এই প্রক্রিয়াকে কার্যকর রাখে।
কিন্তু গাছের উচ্চতা বাড়লে দুটি সমস্যা দেখা দেয়। প্রথমত, ওপরে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পানির ওপর চাপ বেড়ে যায়, যা কখনও বায়ুর ফাঁপা অংশ তৈরি করে পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। দ্বিতীয়ত, পথ যত দীর্ঘ হয়, পানির প্রবাহে ঘর্ষণও তত বাড়ে।
গবেষণায় মিলল ভিন্ন চিত্র
গবেষকেরা উত্তর-পূর্ব বোর্নিওর বৃষ্টিঅরণ্যে ৩৮টি ডিপটেরোকার্প গাছ নিয়ে কয়েক মাস ধরে বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ করেন। পরে ২৭টি গাছের বৃদ্ধি প্রায় দুই বছরের বেশি সময় ধরে অনুসরণ করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, গাছগুলো উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে নিজস্ব কাঠামো পরিবর্তন করে। শীর্ষ থেকে নিচের দিকে নামার সঙ্গে সঙ্গে জাইলেমের নালি আরও প্রশস্ত হয়। এতে পানি পরিবহনের বাধা কমে যায় এবং দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েও পানি সহজে ওপরে উঠতে পারে।
একই সঙ্গে সবচেয়ে উঁচু পাতাগুলোতে বিশেষ ধরনের রাসায়নিক উপাদানের পরিমাণ বেশি থাকে, যা পানির স্বল্পতার মধ্যেও কোষের গঠন ঠিক রাখতে সাহায্য করে। ফলে গাছের ওপরের পাতাগুলো নিচের পাতার তুলনায় বেশি শুকিয়ে যায় না।

খরাতেও কমেনি বৃদ্ধির গতি
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফল হলো, দীর্ঘ ছয় মাসের খরার সময়ও গাছের উচ্চতা এবং বৃদ্ধির হারের মধ্যে নেতিবাচক কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ সবচেয়ে উঁচু গাছগুলোও খরার কারণে অন্যদের তুলনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।
এটি ইঙ্গিত দেয়, ডিপটেরোকার্প গাছের বিবর্তন এমনভাবে ঘটেছে, যাতে তারা উচ্চতার সুবিধা ধরে রেখেও পানির সংকট মোকাবিলা করতে পারে।
জলবায়ু গবেষণায় নতুন ভাবনার সুযোগ
পৃথিবীর বনাঞ্চলের সবচেয়ে উঁচু এক শতাংশ গাছেই মোট বনভিত্তিক কার্বনের অর্ধেকের বেশি সঞ্চিত থাকে। তাই এতদিন যেসব জলবায়ু মডেলে ধরে নেওয়া হয়েছে যে বড় গাছগুলো খরায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, নতুন এই গবেষণা সেই ধারণা নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশাল আকৃতির এই গাছগুলোর ভেতরের প্রাকৃতিক পানি পরিবহন ব্যবস্থা শুধু উদ্ভিদবিজ্ঞানের জন্য নয়, ভবিষ্যতের বন সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার কৌশল নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















