নিয়মিত ব্যায়াম যে শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই। হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি কমাতে শারীরিক সক্রিয়তার ভূমিকা সুপ্রতিষ্ঠিত। তবে নতুন গবেষণাগুলো বলছে, স্বাস্থ্য উপকারিতা পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যায়াম করতেই হবে—এমন ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। প্রতিদিন মাত্র কয়েক মিনিটের জোরালো শারীরিক নড়াচড়াও উল্লেখযোগ্য সুফল এনে দিতে পারে।
অল্প ব্যায়ামও আনতে পারে বড় পরিবর্তন
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম এবং সপ্তাহে দুই দিন পেশিশক্তি বাড়ানোর অনুশীলনের পরামর্শ দেয়। কিন্তু বাস্তবে অনেক মানুষই এই লক্ষ্য পূরণ করতে পারেন না।
সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো দেখাচ্ছে, নির্ধারিত মাত্রায় পৌঁছানো সম্ভব না হলেও একেবারে নিষ্ক্রিয় থাকার চেয়ে অল্প ব্যায়াম অনেক বেশি উপকারী। বরং স্বাস্থ্যগত সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা যায় তখনই, যখন একজন ব্যক্তি সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন থেকে সামান্য হলেও নিয়মিত নড়াচড়া শুরু করেন।
মৃত্যুঝুঁকি কমানোর ইঙ্গিত
প্রায় ছয় লাখ ৬০ হাজার মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে করা একটি বৃহৎ গবেষণায় দেখা গেছে, যারা একেবারেই ব্যায়াম করেন না, তাদের তুলনায় সুপারিশকৃত মাত্রার চেয়েও কম ব্যায়াম করা ব্যক্তিদের মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ২০ শতাংশ কম ছিল।
যারা সুপারিশকৃত মাত্রার এক থেকে দুই গুণ ব্যায়াম করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমেছে ৩১ শতাংশ। আর দুই থেকে তিন গুণ বেশি ব্যায়ামকারীদের ক্ষেত্রে এই হার দাঁড়িয়েছে ৩৭ শতাংশ। অর্থাৎ, একেবারে শূন্য থেকে সামান্য ব্যায়াম শুরু করার সুফল তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।
দৈনন্দিন কাজেই লুকিয়ে থাকতে পারে ব্যায়াম
আগের অনেক গবেষণা মানুষের নিজের দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করলেও, নতুন গবেষণায় পরিধানযোগ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, প্রতিদিনের জীবনেই কয়েক মিনিটের জোরালো শারীরিক কর্মকাণ্ড উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্য উপকার বয়ে আনতে পারে।
গবেষকেরা বিশেষভাবে নজর দিয়েছেন এমন স্বল্প সময়ের তীব্র নড়াচড়ার দিকে, যা আলাদা করে ব্যায়াম হিসেবে পরিকল্পিত নয়। যেমন বাস ধরতে দ্রুত দৌড়ানো, দ্রুতগতিতে সিঁড়ি বেয়ে ওঠা বা অল্প সময়ের জন্য জোরে হাঁটা।

প্রায় ২৫ হাজার মানুষের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, যাদের গড়ে প্রতিদিন মাত্র ৪ দশমিক ৪ মিনিট এমন তীব্র শারীরিক কার্যক্রম ছিল, তাদের পরবর্তী কয়েক বছরে যেকোনো কারণে মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কম ছিল।
‘ব্যায়ামের ছোট বিরতি’ হতে পারে কার্যকর সমাধান
গবেষকেরা এখন এমন ধারণাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন, যাকে বলা হচ্ছে ‘ব্যায়ামের ছোট বিরতি’। ব্যস্ত জীবনেও এটি সহজে করা সম্ভব। যেমন পানি গরম হওয়ার অপেক্ষায় কয়েকটি স্কোয়াট করা, কাজের ফাঁকে কয়েক মিনিট লাফানো বা দ্রুত কিছু শরীরচর্চা করে নেওয়া।
কেন এত অল্প সময়ের ব্যায়াম এত কার্যকর, তার পুরো ব্যাখ্যা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে ধারণা করা হচ্ছে, এটি উচ্চমাত্রার বিরতিভিত্তিক ব্যায়ামের মতোই শরীরে ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে।
নিয়মিত নড়াচড়াই আসল বার্তা
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় ব্যায়াম করতে না পারলেও হতাশ হওয়ার কারণ নেই। প্রতিদিনের ছোট ছোট শারীরিক কর্মকাণ্ডও দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই ব্যস্ততার মাঝেও শরীরকে সচল রাখা এবং নিয়মিত নড়াচড়ার অভ্যাস গড়ে তোলাই সুস্থ জীবনের অন্যতম সহজ উপায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















