শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন কেবল সরকার বদলের ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন বদলের একটি সামাজিক দাবি। ভোটাররা শুধু নতুন নেতৃত্ব চাননি, তারা এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রত্যাশা করেছেন যেখানে রাজনৈতিক ক্ষমতা আর আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে না, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হবে এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় প্রভাবের পরিবর্তে সাংবিধানিক দায়িত্ব অনুযায়ী কাজ করবে। সেই প্রত্যাশা পূরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের সফলতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা অটুট রাখার ওপর।
বিগত কয়েক দশক ধরে শ্রীলঙ্কার জনজীবনে যে দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা শুধু দুর্নীতিকে উৎসাহিত করেনি; রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের বিশ্বাসও ক্ষয় করেছে। বহু অভিযোগ, তদন্ত এবং আদালতে থাকা মামলা বছরের পর বছর অগ্রসর হয়নি। অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উঠেছে, আবার অসংখ্য মামলা রাষ্ট্রপক্ষের উদ্যোগেই প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা দৃঢ় হয়েছে যে রাজনৈতিক ক্ষমতা থাকলে বিচার এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।
২০২৪ সালের নির্বাচনে জনগণের রায় সেই বাস্তবতার বিরুদ্ধে ছিল। অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্তি যেমন ছিল ভোটারদের অগ্রাধিকার, তেমনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়াও ছিল অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা। অর্থাৎ অর্থনীতি ও সুশাসনের প্রশ্নকে জনগণ আলাদা করে দেখেননি; বরং তারা উপলব্ধি করেছেন যে দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কার ছাড়া অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারও টেকসই হবে না।

এই কারণেই বর্তমানে পুলিশ, দুর্নীতি দমনকারী সংস্থা, অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তর এবং আদালতের সক্রিয় ভূমিকা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অতীতে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে যাচ্ছে। এটি কেবল কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনার বিষয় নয়; বরং আইনের শাসনের একটি মৌলিক নীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা—কোনো ব্যক্তি, তার রাজনৈতিক অবস্থান বা সামাজিক মর্যাদা যাই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে নন।
কিন্তু এই ইতিবাচক পরিবর্তনের মাঝেই নতুন একটি বিতর্ক সামনে এসেছে। সুপ্রিম কোর্ট ও আপিল বিভাগের বিচারকদের অবসরের বয়স দুই বছর বাড়ানোর প্রস্তাবকে ঘিরে দেশে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। বিতর্কের কারণ অবসরের বয়স বাড়ানোর ধারণা নয়; বরং প্রশ্ন উঠেছে এই পরিবর্তন কোন সময়ে এবং কী প্রক্রিয়ায় আনা হচ্ছে।
বিশ্বের অনেক দেশেই বিচারকদের অবসরের বয়স বাড়ানো হয়েছে। মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে, পেশাগত সক্ষমতাও দীর্ঘ সময় ধরে বজায় থাকে। বিচারকদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, আইনি বিশ্লেষণের গভীরতা এবং সাংবিধানিক ব্যাখ্যার দক্ষতা একদিনে তৈরি হয় না। জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক, নরওয়ে কিংবা জাপানের মতো দেশগুলো বিচার বিভাগসহ বিভিন্ন পেশায় অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের দীর্ঘ সময় কাজে রাখার নীতি গ্রহণ করেছে। সুতরাং বিচারকদের অবসরের বয়স বাড়ানোর পক্ষে নীতিগত যুক্তি অস্বাভাবিক নয়।
তবে বিচার বিভাগের মতো একটি সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শুধু নীতির যথার্থতা যথেষ্ট নয়; সমান গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সেই নীতি বাস্তবায়নের সময়, প্রেক্ষাপট এবং পদ্ধতি। যখন আদালতে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর দুর্নীতির মামলা বিচারাধীন, তখন বিচারকদের চাকরির মেয়াদে সাংবিধানিক পরিবর্তনের উদ্যোগ জনগণের মনে সন্দেহ তৈরি করতে পারে। উদ্দেশ্য সৎ হলেও যদি প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক।
এ কারণেই শ্রীলঙ্কার বার অ্যাসোসিয়েশন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের আপত্তি বিচারকদের দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের ধারণার বিরুদ্ধে নয়; বরং তারা মনে করছে, চলমান বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যে কর্মরত বিচারকদের মেয়াদ পরিবর্তনের উদ্যোগ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সম্পর্কে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। আন্তর্জাতিক আইনজীবী মহলেও একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যায়। বহু দেশ অবসরের বয়স বাড়িয়েছে, কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত এমনভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে যাতে বিচারকদের ব্যক্তিগত অবস্থান বা নির্দিষ্ট মামলার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক আছে বলে মনে না হয়।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচার বিভাগের শক্তি কেবল সংবিধান থেকে আসে না; আসে জনগণের আস্থা থেকে। আদালতের রায় মানুষ তখনই গ্রহণ করে, যখন তারা বিশ্বাস করে বিচারক রাজনৈতিক চাপমুক্ত থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যদি সেই বিশ্বাস দুর্বল হয়ে যায়, তবে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানও কাঙ্ক্ষিত নৈতিক শক্তি হারায়।
সরকারের সামনে তাই দুটি সমান গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। প্রথমত, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অতীতের অনিয়মের বিচার নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, সেই বিচার যে প্রতিষ্ঠানগুলো করছে, তাদের স্বাধীনতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে কোনো ধরনের প্রশ্নের সুযোগ না রাখা। এই দুই লক্ষ্য একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং পরস্পরের পরিপূরক।
যদি সরকার সত্যিই মনে করে যে বিচারকদের অবসরের বয়স বাড়ানো সময়ের দাবি, তাহলে সেই যুক্তি জনগণ, সংসদ, আইনজীবী সমাজ এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করা উচিত। বিচার বিভাগ-সংক্রান্ত সাংবিধানিক সংশোধন সাধারণ আইনের মতো নয়। এখানে রাজনৈতিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা আইনগত ক্ষমতা দিলেও নৈতিক বৈধতা নিশ্চিত করে না। বরং বিস্তৃত আলোচনা, সর্বদলীয় সমর্থন এবং প্রাতিষ্ঠানিক ঐকমত্য এমন সংস্কারের গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
একইভাবে বিরোধী দলেরও দায়িত্ব রয়েছে বিষয়টিকে কেবল রাজনৈতিক বিরোধিতার দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখা। যদি তারা সত্যিই সুশাসন, দুর্নীতিবিরোধী সংস্কার এবং আইনের শাসনের পক্ষে অবস্থান নেয়, তবে বিচার বিভাগের অভিজ্ঞতা ও স্বাধীনতা—দুই বিষয়ের মধ্যেই ভারসাম্য খোঁজার প্রচেষ্টায় অংশ নেওয়া উচিত।
শ্রীলঙ্কার জনগণ নতুন সরকারের কাছে কেবল প্রশাসনিক পরিবর্তন চাননি; তারা একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যাশা করেছেন। সেই সংস্কৃতির ভিত্তি হবে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। এই পরিবর্তনের যাত্রা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এমন কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া যা বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা সম্পর্কে অপ্রয়োজনীয় সন্দেহ সৃষ্টি করে।
দায়মুক্তির সংস্কৃতি থেকে জবাবদিহির রাষ্ট্রে উত্তরণের পথ দীর্ঘ এবং জটিল। এই যাত্রায় আদালতই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভরসার জায়গা। তাই বিচারকদের অবসরের বয়স বাড়ানোর মতো সংস্কার নীতিগতভাবে গ্রহণযোগ্য হলেও, তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া হতে হবে সর্বোচ্চ স্বচ্ছ, পরামর্শভিত্তিক এবং এমনভাবে পরিকল্পিত, যাতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জনআস্থা কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন না হয়। তখনই জনগণের রায়ের প্রকৃত মর্যাদা রক্ষা পাবে এবং আইনের শাসন স্থায়ী ভিত্তি লাভ করবে।
গায়ান আবেকুন 


















