দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করা ইসরায়েল বর্তমানে এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে সামরিক সক্ষমতা থাকলেও বিশ্ব রাজনীতিতে তার অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। গাজা, লেবানন, সিরিয়া ও ইরানকে ঘিরে সামরিক পদক্ষেপ এবং পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের কারণে দেশটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠছে।
একসময়ের বিচ্ছিন্নতা থেকে নতুন সংকট
ইহুদি জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা থেকেই ইসরায়েলের যাত্রা শুরু হয়েছিল। দীর্ঘ সময় ধরে দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের একটি বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি কাটিয়ে উঠতে চেয়েছে। মিশর ও জর্ডানের সঙ্গে শান্তিচুক্তি, উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েল আঞ্চলিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের পথে এগিয়েছিল।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোর সামরিক নীতি সেই অগ্রগতিকে আবার প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে বিশ্বজুড়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে।

সামরিক শক্তি বনাম রাজনৈতিক কৌশল
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের বর্তমান নেতৃত্ব সামরিক শক্তিকে রাজনৈতিক সমাধানের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করছে। গাজায় হামাসের আক্রমণের পর শুরু হওয়া অভিযান দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে রূপ নিয়েছে, যার প্রভাব আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসরায়েলের ভাবমূর্তিতে পড়েছে।
লেবানন ও ইরানকে ঘিরে সামরিক পদক্ষেপও আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে। এসব পদক্ষেপ স্বল্পমেয়াদি নিরাপত্তা সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক চাপ ও বিরোধিতা বাড়াচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
উপসাগরীয় সম্পর্কেও দেখা দিয়েছে টানাপোড়েন
ইসরায়েল ও কয়েকটি আরব দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার অন্যতম ভিত্তি ছিল অর্থনৈতিক সহযোগিতা, প্রযুক্তিগত বিনিময় এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার অভিন্ন উদ্বেগ। কিন্তু গাজা পরিস্থিতি আরব সমাজে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি করেছে।
উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন হলেও তারা এমন কোনো সংঘাতে জড়াতে চায় না, যার সরাসরি ক্ষতি তাদের ওপর পড়তে পারে। ফলে ইসরায়েলের নীতি ও আরব দেশগুলোর কৌশলের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কেও নতুন বাস্তবতা

ইসরায়েলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্কের মধ্যে চাপ তৈরি হয়েছে। ইসরায়েলের সিদ্ধান্তগুলোর কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক খরচ অনেক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকেও বহন করতে হচ্ছে বলে আলোচনা চলছে।
ইরান ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থানের পার্থক্য এই টানাপোড়েনকে আরও স্পষ্ট করেছে। যদিও দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক অব্যাহত রয়েছে, তবে আগের মতো নিঃশর্ত সমর্থন নিয়ে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
পশ্চিম তীরের নীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাত আন্তর্জাতিক মহলে আরও সমালোচনা তৈরি করেছে। অনেকের মতে, এই নীতি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমাধানের পথকে আরও কঠিন করে তুলছে।
দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা দুর্বল হলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিচ্ছিন্নতার নতুন অধ্যায়
ইতিহাসের এক বড় বৈপরীত্য হলো, যে নিরাপত্তা ও স্বীকৃতির জন্য ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা তৈরি হয়েছিল, বর্তমান নীতির কারণে সেই দেশই আবার আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার মুখে পড়ছে।
সামরিক শক্তি ইসরায়েলকে আঞ্চলিকভাবে শক্তিশালী রাখলেও কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখতে রাজনৈতিক সমাধান ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতির প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে গাজা যুদ্ধ, আঞ্চলিক সংঘাত এবং পশ্চিম তীরের নীতি। আগামী দিনে দেশটির কূটনৈতিক পথ কোন দিকে যায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















