০৮:০১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
প্রশ্নপত্র ফাঁসের ক্ষত ও অনশনের আর্তনাদ: আমরা কবে শুনব ক্ষুধার ভাষা? শুধু শ্রদ্ধা নয়, শহীদ সেনাদের প্রতি রাষ্ট্রের প্রকৃত দায়িত্ব এখনই পালন করতে হবে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ পুনঃতফসিলে বিশেষ সুবিধা বাড়াল বাংলাদেশ ব্যাংক আইএমএফের সতর্কবার্তা: প্রবৃদ্ধি ৩.৫%, মধ্যমেয়াদে ৩ শতাংশের নিচে নামার শঙ্কা বাগেরহাটে ঘরে মিলল দম্পতির মরদেহ, পাশে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার দেড় মাসের শিশু বিশ্বকাপের পরাজয়ের যন্ত্রণা নয়, অনুভূতিহীনতাই জীবনের সবচেয়ে বড় হার কালেমার পতাকা ইস্যুতে উগ্রবাদী তৎপরতার প্রমাণ নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চীনের দল নেই, তবু বিশ্বকাপ জ্বরে উন্মাতাল দেশ; দর্শক, ব্র্যান্ড ও ব্যবসায় নতুন সাফল্যের গল্প বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ১০৮ কিলোমিটার বেড়া নির্মাণের সিদ্ধান্ত, নিরাপত্তা জোরদারে নতুন উদ্যোগ গভীর সমুদ্র থেকে উঠে এলো শ্যাকলটন ও স্কটের ঐতিহাসিক জাহাজের রহস্যময় ছবি

প্রশ্নপত্র ফাঁসের ক্ষত ও অনশনের আর্তনাদ: আমরা কবে শুনব ক্ষুধার ভাষা?

অনশন কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, এটি মানুষের শরীরকে ভাষায় পরিণত করার এক চরম উপায়। যখন সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়, যখন যুক্তি, আবেদন, প্রতিবাদ কিংবা স্মারকলিপি কোনো পরিবর্তন আনতে পারে না, তখন কিছু মানুষ নিজেদের শরীরকেই শেষ অস্ত্রে পরিণত করেন। তাই অনশনকে কেবল প্রতীকী প্রতিবাদ বা রাজনৈতিক নাটক বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ হলেও, বাস্তবতা অনেক বেশি কঠিন।

আমাদের অধিকাংশ মানুষের জীবনে ক্ষুধা একটি সাময়িক অনুভূতি। কয়েক ঘণ্টা না খেলে আমরা অস্বস্তি বোধ করি, তারপর খাবার সামনে এলেই সেই অনুভূতি শেষ হয়ে যায়। কিন্তু দীর্ঘ অনশন সেই পরিচিত ক্ষুধা নয়। সেখানে শরীর ধীরে ধীরে নিজের সঞ্চিত শক্তি শেষ করে, পেশি ক্ষয় হতে থাকে, বিপাকীয় কার্যক্রম মন্থর হয়ে আসে, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়। প্রতিটি দিন তখন কেবল আরেকটি দিন নয়; প্রতিটি দিন জীবনের সঙ্গে শরীরের এক নতুন সমঝোতা। অনশনকারীর শরীর ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে, কিন্তু তার সংকল্প যদি অটুট থাকে, তাহলে সেই ভাঙনই হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা।

এই বাস্তবতা বোঝার পর একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে—কোন মানুষ স্বেচ্ছায় এমন যন্ত্রণা বেছে নেন?

সোনম ওয়াংচুকের চলমান অনশন সেই প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে এনেছে। তাঁর দাবি নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, তাঁর পদ্ধতির সঙ্গে সবাই একমত নাও হতে পারেন। কিন্তু একজন সুপরিচিত উদ্ভাবক, শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী কেন নিজের জীবনকে এমন ঝুঁকির মধ্যে ফেলবেন, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

অনেকেই বলেন, একজন মন্ত্রীর পদত্যাগে কী বদলে যাবে? হয়তো সত্যিই কোনো সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান হবে না। কিন্তু জবাবদিহির শুরু তো কোনো না কোনো জায়গা থেকে হতে হয়। রাষ্ট্র যখন বারবার ব্যর্থ হয়, তখন সেই ব্যর্থতার রাজনৈতিক দায়ও একসময় নির্ধারণ করতে হয়। অন্তত একটি জাতীয় আলোচনার সূচনা হওয়াও গণতান্ত্রিক সমাজে গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের সাম্প্রতিক পরীক্ষা-ব্যবস্থার ইতিহাস সেই আলোচনার প্রয়োজনীয়তাকেই আরও স্পষ্ট করে। গত কয়েক বছরে একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন তদন্তে দেখা গেছে, কেন্দ্রীয় ও রাজ্য পর্যায়ের বহু নিয়োগ ও ভর্তি পরীক্ষায় একই ধরনের অনিয়ম পুনরাবৃত্ত হয়েছে। এক-দুটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলে তাকে ব্যতিক্রম বলা যেত। কিন্তু যখন একই ধরনের ব্যর্থতা বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন রাজ্যে ফিরে আসে, তখন সেটি আর দুর্ঘটনা থাকে না; সেটি একটি কাঠামোগত সংকটের পরিচয় বহন করে।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের ক্ষতি কেবল একটি পরীক্ষা বাতিল হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে থাকে অসংখ্য মানুষের দীর্ঘ প্রস্তুতি, অগণিত নির্ঘুম রাত, পরিবারের আর্থিক ত্যাগ এবং ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার স্বপ্ন। অনেক পরিবার ঋণ নিয়ে কোচিং করায়, নিজেদের প্রয়োজন কমিয়ে সন্তানের শিক্ষায় বিনিয়োগ করে। সেই সব পরিশ্রম এক সকালে ভেঙে পড়ে, যখন জানা যায় পরীক্ষার সততা আর অক্ষুণ্ন নেই।

প্রশাসনিক ব্যর্থতা শব্দবন্ধটি তাই বাস্তব পরিস্থিতিকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারে না। কারণ এর শিকার কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়; এর শিকার একজন ছাত্র, একটি পরিবার এবং একটি প্রজন্মের আস্থা।

এশিয়ায় ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৫০ কোটি

জাতীয় মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক সেই আস্থার সংকটকে আরও গভীর করেছে। পরীক্ষা বাতিল, পুনঃপরীক্ষা এবং দীর্ঘ অনিশ্চয়তার সময়ে একাধিক পরীক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে ব্যক্তিগত ও সামাজিক নানা কারণ থাকে, তাই একমাত্র একটি ঘটনাকে দায়ী করা অনুচিত। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও অস্বীকার করা কঠিন যে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা, মানসিক চাপ এবং একটি অবিশ্বস্ত ব্যবস্থার ভয় অনেক তরুণের ওপর অসহনীয় বোঝা হয়ে নেমে আসে।

একটি সমাজ হিসেবে আমাদের নিজেদেরই প্রশ্ন করা উচিত—আর কতবার এমন ঘটনা ঘটলে আমরা বুঝব যে সমস্যাটি আর সাময়িক নয়?

গণতন্ত্রে নাগরিকের ভূমিকা কেবল ভোট দেওয়া নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা, জবাবদিহি দাবি করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রতিবাদ করাও নাগরিক দায়িত্বের অংশ। জন এফ. কেনেডির সেই বহুল উদ্ধৃত আহ্বান—দেশ আমাদের জন্য কী করবে, তার চেয়ে আমরা দেশের জন্য কী করব—আজও তাই প্রাসঙ্গিক। কারণ রাষ্ট্রকে আরও দায়িত্বশীল করে তোলার লড়াইও নাগরিকত্বেরই একটি রূপ।

সোনম ওয়াংচুক চাইলে নিজের গবেষণা, শিক্ষা বা উদ্ভাবনের কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকতে পারতেন। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন তুলনামূলকভাবে স্বস্তিদায়কই হতে পারত। কিন্তু তিনি অন্য পথ বেছে নিয়েছেন। সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সবাই একমত না হলেও এটুকু অস্বীকার করার উপায় নেই যে তিনি বিশ্বাস করেন, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নীরব থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।

আজকের পৃথিবীতে আমরা প্রতিদিন অসংখ্য ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও বিতর্কের খবর দেখি। এত বেশি ঘটনার ভিড়ে অনেক সময় মানুষের কষ্টও যেন আর আমাদের স্পর্শ করে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েক মিনিট আলোচনা হয়, তারপর নতুন কোনো খবর এসে আগের সবকিছুকে সরিয়ে দেয়। ধীরে ধীরে আমরা এমন এক অবস্থায় পৌঁছাই, যেখানে কারও আত্মত্যাগও আর আমাদের দীর্ঘক্ষণ ভাবায় না।

এই উদাসীনতাই সম্ভবত সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়। কারণ সহমর্মিতা মানে সব দাবির সঙ্গে একমত হওয়া নয়। সহমর্মিতা মানে অন্য একজন মানুষের যন্ত্রণা সত্যিই আছে—এই সাধারণ সত্যটুকু স্বীকার করা।

জন্তর মন্তরে সোনম ওয়াংচুকের পাশে বসা তরুণদের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে তাদের ক্লান্তি। তারা উচ্চস্বরে স্লোগান দিচ্ছে না; বরং শান্ত গলায় বলছে, তাদের স্বপ্ন বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে, ব্যবস্থার ওপর বিশ্বাস ভেঙে পড়ছে এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। সেই নীরব হতাশাই অনেক সময় উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

সমাজের একটি অস্বস্তিকর প্রবণতা হলো, আমরা প্রায়ই জীবিত অবস্থায় প্রতিবাদকারীদের উপেক্ষা করি, কিন্তু তারা ইতিহাসে পরিণত হওয়ার পর তাদের স্মরণ করি। তাদের নিয়ে বই লিখি, চলচ্চিত্র বানাই, বক্তৃতা দিই এবং দেরিতে উপলব্ধি করি যে, যখন তারা কথা বলছিলেন, তখন আমরা শুনিনি।

সুতরাং আজকের মূল প্রশ্ন অনশন সঠিক না ভুল—সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, একজন মানুষ যখন নিজের শরীরকে প্রতিবাদের ভাষায় পরিণত করেছেন, তখন আমরা কি তাঁর কথাগুলো এখন শুনব, নাকি ইতিহাসের বিচারের জন্য অপেক্ষা করব?

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রশ্নপত্র ফাঁসের ক্ষত ও অনশনের আর্তনাদ: আমরা কবে শুনব ক্ষুধার ভাষা?

প্রশ্নপত্র ফাঁসের ক্ষত ও অনশনের আর্তনাদ: আমরা কবে শুনব ক্ষুধার ভাষা?

০৮:০০:৪৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

অনশন কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, এটি মানুষের শরীরকে ভাষায় পরিণত করার এক চরম উপায়। যখন সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়, যখন যুক্তি, আবেদন, প্রতিবাদ কিংবা স্মারকলিপি কোনো পরিবর্তন আনতে পারে না, তখন কিছু মানুষ নিজেদের শরীরকেই শেষ অস্ত্রে পরিণত করেন। তাই অনশনকে কেবল প্রতীকী প্রতিবাদ বা রাজনৈতিক নাটক বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ হলেও, বাস্তবতা অনেক বেশি কঠিন।

আমাদের অধিকাংশ মানুষের জীবনে ক্ষুধা একটি সাময়িক অনুভূতি। কয়েক ঘণ্টা না খেলে আমরা অস্বস্তি বোধ করি, তারপর খাবার সামনে এলেই সেই অনুভূতি শেষ হয়ে যায়। কিন্তু দীর্ঘ অনশন সেই পরিচিত ক্ষুধা নয়। সেখানে শরীর ধীরে ধীরে নিজের সঞ্চিত শক্তি শেষ করে, পেশি ক্ষয় হতে থাকে, বিপাকীয় কার্যক্রম মন্থর হয়ে আসে, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়। প্রতিটি দিন তখন কেবল আরেকটি দিন নয়; প্রতিটি দিন জীবনের সঙ্গে শরীরের এক নতুন সমঝোতা। অনশনকারীর শরীর ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে, কিন্তু তার সংকল্প যদি অটুট থাকে, তাহলে সেই ভাঙনই হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা।

এই বাস্তবতা বোঝার পর একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে—কোন মানুষ স্বেচ্ছায় এমন যন্ত্রণা বেছে নেন?

সোনম ওয়াংচুকের চলমান অনশন সেই প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে এনেছে। তাঁর দাবি নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, তাঁর পদ্ধতির সঙ্গে সবাই একমত নাও হতে পারেন। কিন্তু একজন সুপরিচিত উদ্ভাবক, শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী কেন নিজের জীবনকে এমন ঝুঁকির মধ্যে ফেলবেন, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

অনেকেই বলেন, একজন মন্ত্রীর পদত্যাগে কী বদলে যাবে? হয়তো সত্যিই কোনো সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান হবে না। কিন্তু জবাবদিহির শুরু তো কোনো না কোনো জায়গা থেকে হতে হয়। রাষ্ট্র যখন বারবার ব্যর্থ হয়, তখন সেই ব্যর্থতার রাজনৈতিক দায়ও একসময় নির্ধারণ করতে হয়। অন্তত একটি জাতীয় আলোচনার সূচনা হওয়াও গণতান্ত্রিক সমাজে গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের সাম্প্রতিক পরীক্ষা-ব্যবস্থার ইতিহাস সেই আলোচনার প্রয়োজনীয়তাকেই আরও স্পষ্ট করে। গত কয়েক বছরে একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন তদন্তে দেখা গেছে, কেন্দ্রীয় ও রাজ্য পর্যায়ের বহু নিয়োগ ও ভর্তি পরীক্ষায় একই ধরনের অনিয়ম পুনরাবৃত্ত হয়েছে। এক-দুটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলে তাকে ব্যতিক্রম বলা যেত। কিন্তু যখন একই ধরনের ব্যর্থতা বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন রাজ্যে ফিরে আসে, তখন সেটি আর দুর্ঘটনা থাকে না; সেটি একটি কাঠামোগত সংকটের পরিচয় বহন করে।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের ক্ষতি কেবল একটি পরীক্ষা বাতিল হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে থাকে অসংখ্য মানুষের দীর্ঘ প্রস্তুতি, অগণিত নির্ঘুম রাত, পরিবারের আর্থিক ত্যাগ এবং ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার স্বপ্ন। অনেক পরিবার ঋণ নিয়ে কোচিং করায়, নিজেদের প্রয়োজন কমিয়ে সন্তানের শিক্ষায় বিনিয়োগ করে। সেই সব পরিশ্রম এক সকালে ভেঙে পড়ে, যখন জানা যায় পরীক্ষার সততা আর অক্ষুণ্ন নেই।

প্রশাসনিক ব্যর্থতা শব্দবন্ধটি তাই বাস্তব পরিস্থিতিকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারে না। কারণ এর শিকার কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়; এর শিকার একজন ছাত্র, একটি পরিবার এবং একটি প্রজন্মের আস্থা।

এশিয়ায় ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৫০ কোটি

জাতীয় মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক সেই আস্থার সংকটকে আরও গভীর করেছে। পরীক্ষা বাতিল, পুনঃপরীক্ষা এবং দীর্ঘ অনিশ্চয়তার সময়ে একাধিক পরীক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে ব্যক্তিগত ও সামাজিক নানা কারণ থাকে, তাই একমাত্র একটি ঘটনাকে দায়ী করা অনুচিত। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও অস্বীকার করা কঠিন যে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা, মানসিক চাপ এবং একটি অবিশ্বস্ত ব্যবস্থার ভয় অনেক তরুণের ওপর অসহনীয় বোঝা হয়ে নেমে আসে।

একটি সমাজ হিসেবে আমাদের নিজেদেরই প্রশ্ন করা উচিত—আর কতবার এমন ঘটনা ঘটলে আমরা বুঝব যে সমস্যাটি আর সাময়িক নয়?

গণতন্ত্রে নাগরিকের ভূমিকা কেবল ভোট দেওয়া নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা, জবাবদিহি দাবি করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রতিবাদ করাও নাগরিক দায়িত্বের অংশ। জন এফ. কেনেডির সেই বহুল উদ্ধৃত আহ্বান—দেশ আমাদের জন্য কী করবে, তার চেয়ে আমরা দেশের জন্য কী করব—আজও তাই প্রাসঙ্গিক। কারণ রাষ্ট্রকে আরও দায়িত্বশীল করে তোলার লড়াইও নাগরিকত্বেরই একটি রূপ।

সোনম ওয়াংচুক চাইলে নিজের গবেষণা, শিক্ষা বা উদ্ভাবনের কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকতে পারতেন। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন তুলনামূলকভাবে স্বস্তিদায়কই হতে পারত। কিন্তু তিনি অন্য পথ বেছে নিয়েছেন। সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সবাই একমত না হলেও এটুকু অস্বীকার করার উপায় নেই যে তিনি বিশ্বাস করেন, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নীরব থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।

আজকের পৃথিবীতে আমরা প্রতিদিন অসংখ্য ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও বিতর্কের খবর দেখি। এত বেশি ঘটনার ভিড়ে অনেক সময় মানুষের কষ্টও যেন আর আমাদের স্পর্শ করে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েক মিনিট আলোচনা হয়, তারপর নতুন কোনো খবর এসে আগের সবকিছুকে সরিয়ে দেয়। ধীরে ধীরে আমরা এমন এক অবস্থায় পৌঁছাই, যেখানে কারও আত্মত্যাগও আর আমাদের দীর্ঘক্ষণ ভাবায় না।

এই উদাসীনতাই সম্ভবত সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়। কারণ সহমর্মিতা মানে সব দাবির সঙ্গে একমত হওয়া নয়। সহমর্মিতা মানে অন্য একজন মানুষের যন্ত্রণা সত্যিই আছে—এই সাধারণ সত্যটুকু স্বীকার করা।

জন্তর মন্তরে সোনম ওয়াংচুকের পাশে বসা তরুণদের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে তাদের ক্লান্তি। তারা উচ্চস্বরে স্লোগান দিচ্ছে না; বরং শান্ত গলায় বলছে, তাদের স্বপ্ন বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে, ব্যবস্থার ওপর বিশ্বাস ভেঙে পড়ছে এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। সেই নীরব হতাশাই অনেক সময় উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

সমাজের একটি অস্বস্তিকর প্রবণতা হলো, আমরা প্রায়ই জীবিত অবস্থায় প্রতিবাদকারীদের উপেক্ষা করি, কিন্তু তারা ইতিহাসে পরিণত হওয়ার পর তাদের স্মরণ করি। তাদের নিয়ে বই লিখি, চলচ্চিত্র বানাই, বক্তৃতা দিই এবং দেরিতে উপলব্ধি করি যে, যখন তারা কথা বলছিলেন, তখন আমরা শুনিনি।

সুতরাং আজকের মূল প্রশ্ন অনশন সঠিক না ভুল—সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, একজন মানুষ যখন নিজের শরীরকে প্রতিবাদের ভাষায় পরিণত করেছেন, তখন আমরা কি তাঁর কথাগুলো এখন শুনব, নাকি ইতিহাসের বিচারের জন্য অপেক্ষা করব?