স্মৃতি একটি জাতিকে অনুপ্রাণিত করতে পারে, আবার সেটিই তার সবচেয়ে বড় বোঝাও হয়ে উঠতে পারে। যখন কোনো দেশের বর্তমানকে বিচার করা হয় তার অতীতের শ্রেষ্ঠ মুহূর্তগুলোর মানদণ্ডে, তখন সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতার অনুভূতিই বেশি প্রবল হয়ে ওঠে। ইংল্যান্ডের ফুটবল দলকে ঘিরে প্রতি বিশ্বকাপে যে আবেগ, হতাশা ও অবাস্তব প্রত্যাশা তৈরি হয়, তা কেবল একটি ক্রীড়া-গল্প নয়; বরং আধুনিক ব্রিটেনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক অবস্থারও প্রতিচ্ছবি।
১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ জয় ইংল্যান্ডের জন্য নিছক একটি ট্রফি ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সাম্রাজ্যের পতন, সুয়েজ সংকটের অপমান এবং বৈশ্বিক প্রভাব হারানোর মধ্যেও সেই বিজয় জাতীয় আত্মপরিচয়ের একটি স্থায়ী প্রতীক হয়ে ওঠে। অনেকের কাছে সেটি ছিল প্রমাণ—ব্রিটেন এখনও বিশেষ, এখনও আলাদা। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন একটি মুহূর্ত পুরো জাতির ভবিষ্যৎ কল্পনার ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
এরপরের কয়েক দশকে ফুটবল মাঠে ইংল্যান্ডের ইতিহাস যেন এক দীর্ঘ পুনরাবৃত্তি। সম্ভাবনা জাগে, প্রত্যাশা বাড়ে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরাজয়ই নিয়তি হয়ে দাঁড়ায়। কখনও আর্জেন্টিনা, কখনও জার্মানি, কখনও ব্রাজিল কিংবা ফ্রান্স—প্রতিবারই মনে হয়েছে, এবার হয়তো বদল আসবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাস্তবতা সেই আশাকে ভেঙে দিয়েছে।
এই ধারাবাহিক ব্যর্থতাকে কেবল খেলার ফল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর পেছনে রয়েছে এমন এক জাতীয় মানসিকতা, যা অতীতের গৌরবকে বর্তমানের বাস্তবতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। যখন একটি দেশ নিজেকে ক্রমাগত পুরোনো সাফল্যের আলোয় দেখতে চায়, তখন বর্তমানের দুর্বলতা বিশ্লেষণের সাহস কমে যায়। অর্থনৈতিক স্থবিরতা, উৎপাদনশীলতার সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা আন্তর্জাতিক প্রভাবের হ্রাস—এসবের মুখোমুখি হওয়ার পরিবর্তে অতীতের স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরা সহজ হয়ে ওঠে।
ব্রেক্সিট তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। “নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনো”—এই স্লোগান আসলে কেবল ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান ছিল না; এটি এমন এক কল্পিত অতীতের প্রতিশ্রুতি বহন করেছিল, যেখানে ব্রিটেন নাকি আরও শক্তিশালী, আরও স্বাধীন এবং আরও সফল ছিল। কিন্তু বাস্তবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়েছে, জনসেবার মান কমেছে এবং বহু প্রতিশ্রুতি অপূর্ণ থেকে গেছে। তবু সেই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার রাজনৈতিক সাহস খুব কমই দেখা যায়।
ফুটবলেও একই মনস্তত্ত্ব কাজ করে। “ফুটবল ঘরে ফিরছে”—এই জনপ্রিয় স্লোগানটি মূলত আশা ও আত্মপ্রত্যয়ের প্রতীক হলেও এর ভেতরে রয়েছে দীর্ঘ ব্যর্থতার ইতিহাস। প্রতিটি টুর্নামেন্টের আগে ইংল্যান্ড নিজেদের সম্ভাবনাকে বাস্তবতার চেয়ে বড় করে দেখে, যেন ইতিহাসের কোনো অদৃশ্য অধিকার তাদের রয়েছে বিশ্বকাপ জয়ের ওপর। অথচ সাম্প্রতিক কয়েক দশকের ফলাফল বলছে, তারা বিশ্বের ভালো দলগুলোর একটি হলেও অপরাজেয় নয়।
এই মনস্তত্ত্বের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো পরাজয়কেও জাতীয় গৌরবের অংশে পরিণত করা। সামরিক ইতিহাস থেকে খেলাধুলা—বহু ব্যর্থ ঘটনাকেই ব্রিটিশ সংস্কৃতি বীরত্বের গল্পে রূপ দিয়েছে। এতে আত্মসম্মান রক্ষা হয় বটে, কিন্তু আত্মসমালোচনার সুযোগ সংকুচিত হয়। ইতিহাস তখন শিক্ষা নয়, সান্ত্বনার উপকরণ হয়ে দাঁড়ায়।
অবশ্য বর্তমান ইংল্যান্ড দলকে ঘিরে নতুন আশারও কিছু কারণ আছে। তরুণ প্রতিভার অভাব নেই, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও বেড়েছে। এমনকি জাতীয় দলের নেতৃত্বে একজন জার্মান কোচের উপস্থিতি ব্রিটেনের পুরোনো আত্মপরিচয়ের বাইরে গিয়ে বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইঙ্গিতও দেয়। তবু মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে যায় মানসিকতার পরিবর্তন।
একটি জাতি তখনই পরিণত হয়, যখন সে নিজের ইতিহাসকে সম্মান করে, কিন্তু তার বন্দী হয়ে থাকে না। অতীতের গৌরব বর্তমানের সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়। বরং বাস্তব অবস্থানকে মেনে নিয়ে নতুন শক্তি গড়ে তোলাই দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর।
সম্ভবত ইংল্যান্ডের ফুটবল দলের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা বা জার্মানি নয়। তাদের সবচেয়ে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বী সেই স্মৃতি, যা প্রতিটি নতুন প্রজন্মের কাঁধে পুরোনো অসম্ভব প্রত্যাশার বোঝা চাপিয়ে দেয়। একইভাবে আধুনিক ব্রিটেনেরও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বাইরের বিশ্ব নয়; বরং নিজের সম্পর্কে তৈরি করা সেই রোমান্টিক কল্পনা, যা বাস্তবতার সঙ্গে আর পুরোপুরি মেলে না।
যেদিন ব্রিটেন নিজেকে অতীতের সাম্রাজ্য নয়, বর্তমান বিশ্বের একটি সক্ষম কিন্তু সীমাবদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে গ্রহণ করতে পারবে, আর ইংল্যান্ডের ফুটবল দল ১৯৬৬ সালের ছায়া থেকে বেরিয়ে বর্তমানকে নিজের পরিচয় বানাতে পারবে, সেদিন হয়তো বিজয়ও আর এত অধরা থাকবে না।
ম্যাথিউ রোজ 

















