প্রথমবার গ্যারি সোবার্সের সঙ্গে আমার দেখা হয় ১৯৬৫ সালে, যখন তিনি ইয়র্কশায়ারের হয়ে খেলছিলেন। হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন—ইয়র্কশায়ারের হয়ে।
সেই সময় ইয়র্কশায়ারের হয়ে খেলতে হলে ওই কাউন্টিতেই জন্ম নিতে হতো। কিন্তু ১৯৬৪-৬৫ সালের শীতে ক্লাবটি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও বারমুডা সফরে যাওয়ার আমন্ত্রণ পায়। সেই সফরে গ্যারি আমাদের হয়ে কয়েকটি ম্যাচ খেলেছিলেন। ফলে ক্রিকেট ইতিহাসে একটি অদ্ভুত তথ্যের জন্ম হয়েছিল—ইয়র্কশায়ারের হয়ে খেলা প্রথম বিদেশি ক্রিকেটার কে? উত্তর: গ্যারি সোবার্স।
সফরটির আয়োজন করেছিলেন সাংবাদিক রন রবার্টস। সেটিই ছিল আমার জীবনের প্রথম বিদেশ সফর এবং প্রথমবার বিমানে চড়ার অভিজ্ঞতা।
এর আগে গ্রীষ্মে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আমার টেস্ট অভিষেক হয়েছিল। এরপর শীতকালীন রোডেশিয়া (বর্তমান জিম্বাবুয়ে) ও দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের জন্যও আমাকে দলে নেওয়া হয়।
সফরে ইয়র্কশায়ারের প্রায় সব বড় তারকাই ছিলেন—ফ্রেড ট্রুম্যান, ব্রায়ান ক্লোজ, রে ইলিংওয়ার্থসহ আরও অনেকে। আমরা নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, টরন্টো, ক্যালগারি, ভ্যাঙ্কুভার, লস অ্যাঞ্জেলেস এবং বারমুডায় ম্যাচ খেলেছিলাম।
বারমুডার ক্রিকেট তখন ওয়েস্ট ইন্ডিজের অংশ হিসেবে বিবেচিত হতো। তাই সফরে তাদেরই ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী দল।
সেই সময় বিশ্বের সেরা ব্যাটার ছিলেন সোবার্স। ১৯৫৮ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে পাকিস্তানের বিপক্ষে অপরাজিত ৩৬৫ রান করে তিনি টেস্ট ক্রিকেটের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের রেকর্ড গড়েছিলেন।
ছোটবেলা থেকেই তাঁর ব্যাটিংয়ে ছিল ভারসাম্য, সৌন্দর্য এবং শক্তির অনন্য সমন্বয়।
বারমুডার বিপক্ষে ম্যাচগুলোর জন্য তাঁকে ইয়র্কশায়ারের হয়ে খেলানোর সিদ্ধান্ত ছিল দারুণ বুদ্ধিমানের কাজ। দর্শকদের আগ্রহ ছিল আকাশছোঁয়া। সেখানে আমরা খেলছিলাম কংক্রিটের ওপর বিছানো ম্যাটিং উইকেটে। বল অবিশ্বাস্য গতিতে উঠে আসত, বাউন্সও ছিল ভীষণ অস্বস্তিকর।

আমি গ্যারিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তাঁর লম্বা হ্যান্ডেলের ব্যাটটি কিছু সময়ের জন্য ব্যবহার করতে পারি কি না। আমার ভয় ছিল, অতিরিক্ত বাউন্সে আঙুলে আঘাত পেলে এমসিসির রোডেশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা সফর থেকে ছিটকে পড়তে পারি। লম্বা হ্যান্ডেলের ব্যাট ব্যবহার করলে হাত কিছুটা দূরে রাখা যেত।
প্রথম ম্যাচেই স্থানীয় বোলাররা আমাদের প্রথম পাঁচ ব্যাটারকে শর্টপিচ বলের ঝড় তুলে দ্রুত ফিরিয়ে দেয়। গ্যারি সাত নম্বরে ব্যাট করতে নেমে কয়েকটি বাউন্সার খাওয়ার পর প্রতিপক্ষ অধিনায়ককে বললেন, “এবার যথেষ্ট হয়েছে, আর বাউন্সার নয়।”
আমি মনে মনে ভাবলাম, দারুণ বুদ্ধি!
ওভার শেষে আমি তাঁকে বললাম, “আমার কী হবে?”
গ্যারি সঙ্গে সঙ্গে প্রতিপক্ষ অধিনায়কের দিকে ফিরে বললেন, “ওর জন্যও আর বাউন্সার নয়।”
এরপর আমরা দুজনই সেঞ্চুরি করলাম। তখনই মনে হয়েছিল, যদি সারাজীবন এই মানুষটির সঙ্গে ব্যাট করতে পারতাম!
বারমুডা ব্যাট করতে নামলে ফ্রেড ট্রুম্যান এবং গ্যারি নতুন বলে এমন তাণ্ডব চালালেন, যা আমি কখনও ভুলব না। তাঁদের গতি, আগ্রাসন আর ধার ছিল অবিশ্বাস্য। ওই কংক্রিটের ওপর ম্যাটিং উইকেটে তাঁদের মুখোমুখি হতে কেউই স্বস্তি পেত না। সত্যিই ভয়ঙ্কর ছিল।
বারমুডা মাত্র ৪৮ রানে অলআউট হয়ে যায়। ম্যাচ শেষে ট্রুম্যান গ্যারিকে দেখে শুধু বলেছিলেন, “এই ছেলেটা আমার দলে থাকলেই চলবে।”
গ্যারি যখন ব্যাট করতে নামতেন, তাঁর হাঁটার ভঙ্গিটাই ছিল আলাদা। অনেকটা শিকারের উদ্দেশ্যে এগিয়ে যাওয়া এক চিতাবাঘের মতো—আত্মবিশ্বাসী, স্থির এবং লক্ষ্যভেদে অটল। তিনি কিছু বলতেন না। বলারও প্রয়োজন হতো না। তাঁর মধ্যে অহংকার ছিল না, কিন্তু উপস্থিতিই প্রতিপক্ষকে বুঝিয়ে দিত, তিনি কাজ শেষ করতে এসেছেন।
তাঁর ব্যাটিংকে অনেকেই দৃষ্টিনন্দন বলে মনে রাখেন, কিন্তু আমি সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ হতাম তাঁর নিখুঁত কৌশলে। খুব কমই তাঁকে বল মিস করতে দেখেছি। দর্শকেরা তাঁর উঁচু ব্যাকলিফট আর শক্তিশালী শটের কথা মনে রেখেছেন, কিন্তু তাঁর রক্ষণাত্মক ব্যাটিংও ছিল সমান নিখুঁত।
তিনি সাধারণত পেছনের পায়ে খেলে পরিস্থিতি বিচার করতেন, তারপর সামনের পায়ে এগিয়ে আক্রমণ করতেন। হুক শট খেললে সেটিও দারুণ নিয়ন্ত্রণে খেলতেন। আমার মনে পড়ে না, তাঁকে কখনও সুইপ খেলতে দেখেছি। তাঁর সেই শটের প্রয়োজনই পড়ত না।
বছরের পর বছর কাউন্টি ক্রিকেট এবং টেস্ট ক্রিকেটে আমাদের পথ বহুবার মিলেছে।

১৯৬৬ সালে তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক হিসেবে ইংল্যান্ড সফরে আসেন। ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে খেলেন ১৬১ রানের দুর্দান্ত ইনিংস—যদিও সেই ম্যাচে আমি খেলিনি। এরপর লর্ডসে প্রথম ইনিংসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ পিছিয়ে পড়ার পর তিনি ৪৬ এবং পরে ১৬৩ রান করেন। ট্রেন্ট ব্রিজে করেন ৯৪, হেডিংলিতে ১৭৪ এবং ওভালে ৮১ রান।
লর্ডসে তাঁর চাচাতো ভাই ডেভিড হোলফোর্ডের সঙ্গে তাঁর ২৭৪ রানের জুটি আজও আমার চোখে ভাসে। হোলফোর্ড ছিলেন লেগ-স্পিনার এবং ব্যাটার। ওই ম্যাচেই তিনি নিজের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি করেন। আর গ্যারি? তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল, যেন আউট হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। তিনি ছিলেন রাজকীয়, অনবদ্য।
আমি নিজেও তাঁর বোলিংয়ের শিকার হয়েছি। ট্রেন্ট ব্রিজে প্রথম ইনিংসে দ্বিতীয় বলেই তিনি এমন এক দেরিতে সুইং করা বল করেছিলেন, যা আমাকে এলবিডব্লিউ করে দেয়। ক্রিকেটজীবনে যত বলের মুখোমুখি হয়েছি, তার মধ্যে সেটি ছিল অন্যতম সেরা।
পরের ইনিংসে আমি খুব চিন্তায় ছিলাম—দুই ইনিংসেই শূন্য রানে আউট হওয়ার লজ্জা এড়াতে পারব তো? খারাপ আলোয় তিনি আবারও দারুণ সুইং করালেন। এবার ব্যাট-প্যাডে সামান্য লেগে বল বেরিয়ে গেল। সেই সৌভাগ্য আমাকে রক্ষা করেছিল। পরে আমি ৭১ রান করি।
হেডিংলিতে ১৭৪ রান করার পাশাপাশি তিনি নতুন বল হাতে নিয়ে সুইং ও সিমের দুর্দান্ত প্রদর্শনী করেন। সেই ম্যাচে তিনি প্রথম ইনিংসে ৫ উইকেট এবং দ্বিতীয় ইনিংসে ৩ উইকেট নেন।
পঞ্চম টেস্টের আগে ইংল্যান্ড একটি বড় পরিবর্তন আনে। কলিন কাউড্রের পরিবর্তে অধিনায়ক করা হয় ব্রায়ান ক্লোজকে। পুরো সিরিজে সোবার্স আমাদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। ম্যাচের আগে দলের বৈঠকে ক্লোজি ঘোষণা দিলেন, তিনি জানেন কীভাবে গ্যারিকে আউট করতে হবে।
সত্যি বলতে, আমরা কেউই তাঁকে বিশ্বাস করিনি। মনে হয়েছিল, এও হয়তো ক্লোজির স্বভাবসুলভ অতিরঞ্জিত আত্মবিশ্বাস।
কিন্তু তাঁর পরিকল্পনা ছিল একেবারে নির্দিষ্ট। তিনি জন স্নোকে বললেন, সোবার্সের শরীর লক্ষ্য করে বল করতে। আর তিনি নিজে দাঁড়ালেন শর্ট লেগে, একেবারে ব্যাটসম্যানের কাছাকাছি।
এরপর যা ঘটল, তা অবিশ্বাস্য। স্নোর একটি বল সোবার্সের শরীরে উঠে এলো, তিনি বলটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না, আর সেটি সরাসরি ক্লোজের হাতে গিয়ে জমা পড়ল। সোবার্স শূন্য রানে আউট। ইংল্যান্ডও সেই টেস্ট জিতে নিল। এত বড় একজন ব্যাটসম্যানকেও সঠিক পরিকল্পনায় থামানো সম্ভব—সেদিন সেটাই প্রমাণিত হয়েছিল।
এরপর ১৯৬৭-৬৮ মৌসুমে এমসিসির হয়ে আমরা ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে যাই। অধিনায়ক ছিলেন কলিন কাউড্রে। দ্বিতীয় টেস্ট অনুষ্ঠিত হয় কিংস্টনের সাবাইনা পার্কে। ম্যাচ যত এগোচ্ছিল, উইকেটের ফাটল তত বড় হচ্ছিল।
ইংল্যান্ড প্রথম ইনিংসে ২৩৩ রানের লিড নেওয়ার পর জন স্নো নতুন বল হাতে সোবার্সকে দ্বিতীয় বলেই এলবিডব্লিউ করেন। তিনি শূন্য রানে ফিরে যান।
আমরা ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ফলো-অন করাই। দ্বিতীয় ইনিংসে আবার স্নোর প্রথম বলেই সোবার্সের ব্যাটের কানায় লেগে বল দ্বিতীয় স্লিপের সামনে পড়ে। টম গ্রাভেনি ক্যাচ নিতে গিয়ে আঙুলে চোট পান এবং মাঠ ছেড়ে যেতে বাধ্য হন।
তাঁর জায়গায় দ্বিতীয় স্লিপে দাঁড়ালেন ব্যাসিল ডি‘অলিভেইরা।
পরের বলেই এল সেই সুযোগ, যা আজও ভুলতে পারি না।

একেবারে সহজ একটি ক্যাচ তাঁর হাত ফসকে পড়ে গেল।
যদি সেই ক্যাচটি ধরা পড়ত, সোবার্স পরপর দুই ইনিংসেই শূন্য রানে আউট হতেন। কঠিন উইকেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজ তখন ভয়াবহ চাপে পড়ে যেত। কিন্তু ক্রিকেটে কখনও কখনও একটি মুহূর্তই পুরো ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়।
সেই উইকেটের অবস্থা ছিল ভয়ঙ্কর। ফাটল এতটাই প্রশস্ত ছিল যে আমি নিজের পুরো হাত একটি ফাটলের ভেতরে ঢুকিয়ে দিতে পারতাম।
ফাস্ট বোলাররা যদি সামনের ফাটলে বল ফেলত, সেটি মাটির সঙ্গে লেগে গড়িয়ে যেত। আর পেছনের ফাটলে পড়লে ব্যাটসম্যানের মাথার দিকে লাফিয়ে উঠত। বোলারদের জন্য সেটি ছিল স্বপ্নের উইকেট, কিন্তু ব্যাটসম্যানদের জন্য ছিল দুঃস্বপ্ন।
ম্যাচের চতুর্থ বিকেলে আমরা জয়ের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছিলাম। ঠিক তখন ব্যাসিল বুচারকে লেগ সাইডে ক্যাচ আউট দেওয়া হলে গ্যালারির একাংশ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।
সারাদিন রোদে বসে থাকা দর্শকদের অনেকেই মদ্যপ ছিলেন। তাঁদের প্রিয় দল যে হেরে যেতে পারে, সেটি তারা মেনে নিতে পারেনি। মাঠে ছুড়ে মারা শুরু হয় বিয়ারের বোতল, পাথর আর বিভিন্ন জিনিস।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দাঙ্গা পুলিশ মাঠে নামে। টিয়ার গ্যাসও ব্যবহার করা হয়। খেলোয়াড়দের দ্রুত মাঠ ছাড়তে হয়। প্রায় ৭৫ মিনিট খেলা বন্ধ থাকে।
চা-বিরতির পর আবার খেলা শুরু হলেও আমরা ইতিমধ্যে মূল্যবান সময় হারিয়েছিলাম।
ম্যাচ শেষে সেই হারানো সময় পূরণ করতে ষষ্ঠ দিনে আরও ৭৫ মিনিট খেলার সিদ্ধান্ত হয়। তখন আমাদের বিশ্বাস ছিল, অতিরিক্ত সময়ে সহজেই জয় নিশ্চিত করা যাবে।
কিন্তু গ্যারি সোবার্স অন্য পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন।
পঞ্চম দিনে তিনি এমন একটি শতরান করলেন, যা ওই ধরনের উইকেটে কল্পনাও করা কঠিন। আমরা ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম, জয় আর সহজ নয়। ড্র-ই সম্ভবত বাস্তবসম্মত ফল।
কিন্তু সোবার্স ছিলেন ভিন্ন মানসিকতার ক্রিকেটার।
তিনি বুঝেছিলেন, আমরা মানসিকভাবে কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে পড়েছি। আমরা ধরে নিয়েছি ম্যাচ আর জেতা সম্ভব নয়। সেই আত্মতুষ্টির সুযোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি।
অপরাজিত ১১৩ রানে তিনি ইনিংস ঘোষণা করে দিলেন।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ তখন ১৫৮ রানে এগিয়ে। হাতে ছিল সেদিনের অল্প কিছু সময় এবং পরদিনের অতিরিক্ত ৭৫ মিনিট।
তিনি জানতেন, তাঁর দল আর হারবে না।
কিন্তু একই সঙ্গে ইংল্যান্ডকে জয়ের বদলে হারের মুখেও ঠেলে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হলো।

ঘোষণার পর নতুন বল হাতে নিলেন সোবার্স নিজেই।
আমাকে তিনি শূন্য রানে বোল্ড করলেন। বলটি লেগ স্টাম্পের বাইরে একটি ফাটলে পড়ে এত নিচু হয়ে গেল যে ব্যাট নামানোর সুযোগই পাইনি।
এরপর একই ধরনের একটি বলে কাউড্রে এলবিডব্লিউ।
ওয়েস হল জন এডরিচকে ফিরিয়ে দিলেন। চার্লি গ্রিফিথ কেন ব্যারিংটনকে এলবিডব্লিউ করলেন।
মুহূর্তের মধ্যে আমাদের স্কোর ৪ উইকেটে ২৯।
সেই রাতে আমরা সবাই একটাই কথা ভাবছিলাম—অতিরিক্ত ৭৫ মিনিট খেলার আবেদন না করলেই ভালো হতো।
পরদিন সকালে আমাদের শেষ সারির ব্যাটাররা প্রাণপণ লড়াই করে। তখনকার নিয়মে শেষ এক ঘণ্টায় বাধ্যতামূলক ১৫ ওভার করার বিধান ছিল না। তাই ওয়েস্ট ইন্ডিজ যত বেশি সম্ভব ওভার করানোর চেষ্টা করছিল।
নাটকীয়তার শেষ তখনও বাকি ছিল।
জ্যামাইকান আম্পায়ার ডগলাস স্যাং হিউ তাঁর মাত্র তৃতীয় টেস্ট পরিচালনা করছিলেন। ম্যাচের উত্তেজনায় তিনিও যেন ভেসে গিয়েছিলেন। একবার বল তাঁর কাছে চলে এলে তিনি সময় বাঁচাতে নিজেই সেটি তুলে বোলারের দিকে ছুড়ে দেন।
আমাদের ব্যাটার ফ্রেড টিটমাস সঙ্গে সঙ্গে মজা করে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি আসলে কোন দলের হয়ে খেলছেন?”
শেষ পর্যন্ত আমরা আট উইকেট হারিয়ে ম্যাচ ড্র করতে সক্ষম হই। কিন্তু সত্যি বলতে, সোবার্সের অসাধারণ নেতৃত্ব আমাদের হারিয়ে দেওয়ার একেবারে কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে তাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ।
সেই সিরিজে তাঁকে আরেকটি কারণে সবাই মনে রাখবে।
ত্রিনিদাদে চতুর্থ টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ছিল ম্যাচের নিয়ন্ত্রণে। তবু সোবার্স ইনিংস ঘোষণা করে ইংল্যান্ডকে ৫৩ ওভারে ২১৫ রানের লক্ষ্য দেন। মনে রাখতে হবে, তখন একদিনের ক্রিকেট বা টি-টোয়েন্টির যুগ আসেনি। দ্রুত রান তোলার সংস্কৃতিও ছিল না। এমন উইকেটে ওই লক্ষ্য তাড়া করা অত্যন্ত কঠিন হওয়ার কথা।
তবু আমরা ম্যাচ জিতে যাই।
অনেকেই প্রশ্ন করেছিলেন, তিনি এমন ঝুঁকি নিলেন কেন?
আমার বিশ্বাস, উত্তরটি তাঁর ব্যক্তিত্বের মধ্যেই লুকিয়ে আছে।
সোবার্স ছিলেন স্বভাবগতভাবেই সাহসী। তিনি সম্ভাবনার ওপর বাজি ধরতে ভালোবাসতেন। তিনি বুঝেছিলেন, কলিন কাউড্রে অত্যন্ত সতর্ক মানসিকতার অধিনায়ক। স্বাভাবিক অবস্থায় কাউড্রে জয়ের জন্য ঝুঁকি নিতেন না। কিন্তু ড্রেসিংরুমের অন্য খেলোয়াড়দের উৎসাহে শেষ পর্যন্ত তিনি আক্রমণাত্মক পথ বেছে নেন, আর আমরা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে সক্ষম হই।

১৯৭৪ সালে আমরা আবার ক্যারিবীয় সফরে যাই।
তত দিনে সোবার্স আর আগের মানুষটি নন।
বহু বছর ধরে অবিরাম ক্রিকেট খেলতে খেলতে তিনি মানসিক ও শারীরিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে বার্বাডোসের হয়ে অভিষেকের পর থেকে বছরের প্রায় প্রতিটি সময়ই তাঁকে ক্রিকেট খেলতে হয়েছে। তখনকার দিনে অর্থনৈতিক বাস্তবতাও ছিল ভিন্ন। জীবিকা নির্বাহের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পাশাপাশি বিভিন্ন লিগ, কাউন্টি ক্রিকেট এবং আমন্ত্রণমূলক ম্যাচেও তাঁকে নিয়মিত খেলতে হতো।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে না খেললে তিনি বার্বাডোসের হয়ে দ্বীপের প্রতিযোগিতায় খেলতেন। এরপর ইংল্যান্ডের সেন্ট্রাল ল্যাঙ্কাশায়ার লীগ, নর্থ স্ট্যাফোর্ডশায়ার ও চেশায়ার লীগে পেশাদার ক্রিকেট খেলেছেন। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার হয়েও তিন মৌসুম কাটিয়েছেন। ১৯৬৮ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত খেলেছেন নটিংহ্যামশায়ারের হয়ে।
১৯৭০ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত পাঁচটি টেস্টে রেস্ট অব দ্য ওয়ার্ল্ড একাদশের অধিনায়ক ছিলেন তিনি। আবার ১৯৭১-৭২ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়ায় বিশ্ব একাদশেরও নেতৃত্ব দিয়েছেন।
তখন তিনি বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার। ফলে ডাবল-উইকেট, সিঙ্গল-উইকেট কিংবা প্রদর্শনী ম্যাচ—সবখানেই তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হতো।
১৯৬৮ সালে কর্নওয়াল ও ডেভনে স্থানীয় দলের বিপক্ষে ইন্টারন্যাশনাল ক্যাভালিয়ার্সের হয়ে তাঁর সঙ্গে আমারও খেলার সুযোগ হয়েছিল।
মাঠের বাইরে তিনি ছিলেন অবিশ্বাস্য সহজ-সরল একজন মানুষ।
আমি কখনও তাঁকে অন্য কোনো ক্রিকেটারের নিন্দা করতে শুনিনি। অভিযোগ করতে দেখিনি। তিনি ছিলেন উদার, আন্তরিক এবং সবসময় তরুণদের সাহায্য করতে প্রস্তুত। নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে তাঁর কোনো দ্বিধা ছিল না।
১৯৭৪ সালের সেই সিরিজই ছিল তাঁর শেষ টেস্ট সিরিজ।
চারটি টেস্টে পাঁচ ইনিংসে তিনি মাত্র ১০০ রান করেন, যা তাঁর মানদণ্ডের তুলনায় অনেক নিচে।
তবে বল হাতে তখনও তাঁর জাদু পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। তিনি ১৪টি উইকেট নিয়েছিলেন। সিম ও সুইং করানোর দক্ষতা এখনও ছিল চমৎকার।
তাঁর বোলিং অ্যাকশন ছিল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। কাঁধের দারুণ ঘূর্ণন, উঁচু সামনের হাত এবং অসাধারণ নমনীয়তা তাঁকে আলাদা করে তুলত। তিনি জন্মগত অ্যাথলেট ছিলেন। বল করার সময় তাঁকে অতিরিক্ত কিছু ভাবতে হতো না। দৌড়ে এসে স্বাভাবিক ছন্দেই বল ছুড়ে দিতেন।
কিন্তু ব্যাটিং অন্যরকম।

একজন ব্যাটারের সফল হতে হলে মনকে থাকতে হয় সম্পূর্ণ সতর্ক, পরিষ্কার এবং ধৈর্যশীল। প্রতিটি বলের জন্য মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পায়ের নড়াচড়াও হতে হয় নিখুঁত।
সোবার্সের ক্ষেত্রে সেই মানসিক সতেজতাই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছিল।
দল ব্যাটিং করলে তাঁকে প্রায়ই ড্রেসিংরুমে শুয়ে বিশ্রাম নিতে বা ঘুমিয়ে থাকতে দেখতাম। তিনি নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিলেন। বছরের পর বছর বিরামহীন ক্রিকেট শেষ পর্যন্ত তাঁর কাছ থেকেও মূল্য আদায় করেছিল।
দেখতে কষ্ট লাগত।
কারণ আমরা বুঝতে পারছিলাম, ক্রিকেটের এক উজ্জ্বল সূর্য অস্ত যাওয়ার পথে।
তবু একজন মহান খেলোয়াড়কে শেষ কয়েকটি বছর দিয়ে বিচার করা যায় না।
সোবার্সের প্রকৃত উত্তরাধিকার তাঁর পরিসংখ্যানে নয়, তাঁর খেলায়। যাঁরা তাঁর সেরা সময়টি নিজের চোখে দেখেছেন, তাঁরা জানেন—তিনি ছিলেন এক অসাধারণ ব্যাটার, ইতিহাসের সেরা অলরাউন্ডার এবং এমন একজন ক্রিকেটার, যার মতো প্রতিভা হয়তো একটি প্রজন্মে একবারই জন্ম নেয়।
কিন্তু আমার কাছে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় অন্যত্র।
তিনি শুধু অসাধারণ ক্রিকেটার ছিলেন না।
তিনি ছিলেন সত্যিকারের একজন ভদ্র, উদার এবং হৃদয়বান মানুষ।
জিওফ্রে বয়কট 



















