বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের নানা পরিবর্তনের পাশাপাশি হাড়ের ঘনত্বও ধীরে ধীরে কমতে থাকে। তবে বয়স বাড়ার পর হাড় দুর্বল হবে—এমনটা অবধারিত নয়। ছোটবেলা থেকেই সঠিক খাবার, পর্যাপ্ত পুষ্টি এবং নিয়মিত শরীরচর্চার অভ্যাস গড়ে তুললে দীর্ঘদিন হাড়ের শক্তি ধরে রাখা সম্ভব।
শুধু দুধ খেলেই হাড় ভালো থাকে—এমন ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়। হাড়ের সুস্থতার জন্য ক্যালসিয়ামের পাশাপাশি ভিটামিন ডি, আমিষ, ম্যাগনেশিয়াম, দস্তা, ফসফরাস, ভিটামিন কে ও পটাশিয়ামের মতো পুষ্টি উপাদানও গুরুত্বপূর্ণ।
হাড়ের শক্তি গড়ে ওঠে ছোটবেলা থেকেই
হাড়ের ঘনত্ব তৈরির বড় একটি সময় হলো শৈশব ও তরুণ বয়স। এই সময়ে হাড় যত বেশি শক্ত ও ঘন হয়, পরবর্তী জীবনে হাড়ের ক্ষয় সামলানো তত সহজ হয়। বয়স বাড়ার পর স্বাভাবিকভাবেই হাড়ের ঘনত্ব কমতে শুরু করে।
হাড় ক্ষয় বা অস্থিক্ষয় অনেক সময় নীরবে এগোয়। শুরুতে তেমন কোনো লক্ষণ না থাকলেও পরে সামান্য আঘাতেই হাড় ভেঙে যেতে পারে। বিশেষ করে কোমরের হাড় ভাঙা বয়স্ক মানুষের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

নারীদের ক্ষেত্রে রজোনিবৃত্তির পর হাড়ের ঘনত্ব দ্রুত কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। তবে পুরুষরাও অস্থিক্ষয় থেকে মুক্ত নন।
দুধ, দই ও পনিরে মিলবে ক্যালসিয়াম
দুধ, দই ও পনির ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস। এক গ্লাস দুধে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্যালসিয়াম থাকে। পাশাপাশি এসব খাবারে থাকা আমিষ হাড়ের গঠন ও পেশির শক্তি ধরে রাখতে সাহায্য করে।
বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম ও আমিষ গ্রহণ পড়ে যাওয়া এবং কোমরের হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই শুধু শিশুদের নয়, বয়স্কদের খাদ্যতালিকাতেও দুধজাত খাবার রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
সয়া খাবারেও আছে হাড়ের উপকার
দুধ খেতে পারেন না বা দুধজাত খাবার কম খান—এমন মানুষের জন্য সয়া, টোফু ও এডামামে ভালো বিকল্প হতে পারে। টোফুতে যথেষ্ট পরিমাণ ক্যালসিয়াম থাকে।
সয়ায় থাকা উদ্ভিজ্জ উপাদান হাড়ের ঘনত্ব ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে রজোনিবৃত্তির পর নারীদের হাড়ের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সয়া নিয়ে গবেষণায় আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে।

চিয়া বীজ হতে পারে ছোট্ট পুষ্টির ভাণ্ডার
অল্প পরিমাণ চিয়া বীজ থেকেও ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও ফসফরাস পাওয়া যায়। এতে থাকা স্বাস্থ্যকর চর্বিও শরীরের জন্য উপকারী।
দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ শরীরে পুরোনো হাড় ভাঙার প্রক্রিয়া বাড়িয়ে দিতে পারে। চিয়া বীজের কিছু উপাদান এ ধরনের প্রদাহ কমাতে সহায়তা করতে পারে বলে ধারণা করা হয়। তবে মানুষের ক্ষেত্রে এর সরাসরি প্রভাব নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
শুকনো ফল ও কমলাতেও উপকার
ডুমুর, খেজুরজাতীয় কিছু শুকনো ফল এবং এপ্রিকটে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম থাকে। ডুমুরের মতো ফলে থাকা বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ উপাদান হাড়ের ক্ষয় ধীর করতে সহায়ক হতে পারে।
তাজা ফলও খাদ্যতালিকায় গুরুত্বপূর্ণ। কমলা, পেঁপে, কলা ও টমেটোর মতো খাবার থেকে শরীর বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায়, যা সামগ্রিকভাবে হাড় ও পেশির স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক।
কাঁটাসহ ছোট মাছ ও তৈলাক্ত মাছ
কাঁটাসহ খাওয়া যায় এমন ছোট মাছ ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস। সার্ডিনজাতীয় মাছের একটি ছোট কৌটা থেকেই দৈনিক প্রয়োজনের উল্লেখযোগ্য অংশ ক্যালসিয়াম পাওয়া যেতে পারে।
এ ছাড়া সামুদ্রিক তৈলাক্ত মাছ ভিটামিন ডি ও আমিষের ভালো উৎস। ভিটামিন ডি শরীরকে ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে। আবার পর্যাপ্ত আমিষ পেশির শক্তি ধরে রাখতে সহায়তা করে। শক্তিশালী পেশি থাকলে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে, ফলে হাড় ভাঙার আশঙ্কাও কমতে পারে।
সবুজ শাকসবজিও রাখুন খাবারের তালিকায়
পালং শাক, ঢেঁড়স, আলু, মিষ্টি আলু, বাঁধাকপি ও অন্যান্য সবুজ শাকসবজিতে হাড়ের জন্য প্রয়োজনীয় নানা পুষ্টি রয়েছে। তিলবীজ ও বিভিন্ন ডালও ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস হতে পারে।
যারা প্রাণিজ খাবার খান না, তাদের জন্য এসব উদ্ভিজ্জ খাবার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন অনুযায়ী ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবারও খাদ্যতালিকায় যোগ করা যেতে পারে।
বেশি পরিমাণে ভিটামিনের বড়ি নয়
হাড় শক্ত রাখার জন্য নিজের ইচ্ছায় অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম বা ভিটামিন ডি গ্রহণ করা ঠিক নয়। সবার ক্ষেত্রে একই মাত্রার পরিপূরক খাবার প্রয়োজন হয় না।

বিশেষ করে ভিটামিন ডি বেশি খেলেই যে বেশি উপকার হবে, তা নয়। অতিরিক্ত গ্রহণ বরং ক্ষতির কারণ হতে পারে। যাদের খাবার থেকে পর্যাপ্ত পুষ্টি পাওয়া সম্ভব নয় বা যাদের অস্থিক্ষয়ের ঝুঁকি বেশি, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরিপূরক গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
খাবারের পাশাপাশি দরকার শরীরচর্চা
হাড়ের যত্ন শুধু খাবারের ওপর নির্ভর করে না। নিয়মিত হাঁটা, ওজন বহনকারী ব্যায়াম এবং পেশি শক্ত করার শরীরচর্চা হাড়ের স্বাস্থ্য ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাই ছোটবেলা থেকেই সুষম ও বৈচিত্র্যময় খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত শরীরচর্চার অভ্যাস গড়ে তোলাই হতে পারে শক্ত হাড়ের সবচেয়ে সহজ পথ। বয়স বাড়লেও এই অভ্যাস ধরে রাখতে পারলে হাড়ের দুর্বলতা ও ভাঙনের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
বয়স বাড়ার আগেই হাড়ের যত্ন নেওয়া শুরু করা তাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 




















