যুক্তরাজ্যে অন্তত ১০ লাখ পাউন্ড নিট সম্পদের মালিক মানুষের সংখ্যা ২০২৫ সালে আর্থিক সংকট-পরবর্তী সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। নতুন এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উচ্চ সুদের হার, সম্পদের মূল্য কমে যাওয়া এবং ধনী ব্যক্তিদের একটি অংশের দেশত্যাগ—এই তিনটি কারণ মিলিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির মিলিয়নিয়ার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমেছে।
অ্যাডাম স্মিথ ইনস্টিটিউটের প্রকাশিত ‘মিলিয়নিয়ার ট্র্যাকার’-এ বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্যে মিলিয়নিয়ারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪২ হাজার, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ শতাংশ কম এবং ২০০৮ সালের পর সর্বনিম্ন।
সম্পদের মূল্য হ্রাসের প্রভাব
প্রতিবেদনটি যুক্তরাজ্যের জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তর (ওএনএস)-এর তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। এতে অন্তত ১০ লাখ পাউন্ড নিট সম্পদের অধিকারী প্রাপ্তবয়স্কদের গণনা করা হয়েছে। এই সম্পদের মধ্যে বাড়ি, পেনশন, নগদ অর্থ এবং বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনা মহামারির পর থেকে সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন সম্পদের মূল্য চাপের মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকের সঞ্চয় আমানতের আয়ও কমেছে, যা ব্যক্তিগত সম্পদের প্রবৃদ্ধিকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে।
মূল্যস্ফীতির প্রভাব বাদ দিয়ে এবং বিনিময় হার সমন্বয় করে ‘কনস্ট্যান্ট প্রাইস’ পদ্ধতিতে এই হিসাব করা হয়েছে।
চার বছর ধরে ধারাবাহিক পতন
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০ সালে যুক্তরাজ্যে মিলিয়নিয়ারের সংখ্যা প্রথমবার ১০ লাখ অতিক্রম করে এবং ২০২১ সালে তা বেড়ে প্রায় ১০ লাখ ৭০ হাজারে পৌঁছায়। তবে এরপর টানা চার বছর এই সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমেছে।
কেন দেশ ছাড়ছেন ধনীরা?
অ্যাডাম স্মিথ ইনস্টিটিউটের মতে, উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিদের একটি অংশ যুক্তরাজ্য ছেড়ে অন্য দেশে চলে যাচ্ছেন অথবা আগের মতো যুক্তরাজ্যে বসবাস করতে আগ্রহী নন। তাদের মতে, ‘নন-ডম’ কর সুবিধা বাতিল, উচ্চ করের বোঝা এবং সম্পদ সৃষ্টিকারীদের প্রতি অনুকূল নয়—এমন পরিবেশ এই প্রবণতার পেছনে ভূমিকা রাখছে।
তবে যুক্তরাজ্যের কর কর্তৃপক্ষ এইচএম রেভিনিউ অ্যান্ড কাস্টমস (এইচএমআরসি)-এর তথ্য ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। তাদের হিসাবে, ব্যাপক হারে ‘নন-ডম’ বাসিন্দারা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন—এমন সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই।
নন-ডম ব্যবস্থায় পরিবর্তন
২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত করবর্ষে যুক্তরাজ্যে ৬০ হাজার ৭০০ জন এমন বাসিন্দা ছিলেন, যাদের স্থায়ী আবাস ছিল দেশের বাইরে। ‘নন-ডম’ ব্যবস্থা বাতিল হওয়ার আগে বিদেশে অর্জিত আয়ের ওপর তারা নির্দিষ্ট কর সুবিধা পেতেন।
বর্তমানে নতুন নিয়ম অনুযায়ী, নতুন বাসিন্দা বা অন্তত এক দশক পর যুক্তরাজ্যে ফিরে আসা ব্যক্তিরা সর্বোচ্চ চার বছর পর্যন্ত বিদেশে অর্জিত আয়ের ওপর করছাড় পেতে পারেন।
নীতিগত বিতর্কও জোরালো
ওএনএস প্রতি দুই বছর পরপর পরিবারের সম্পদের মূল্য নির্ধারণ করে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে ১০ লাখ পাউন্ডের বেশি নিট সম্পদ রয়েছে এমন পরিবারের সংখ্যা প্রায় ৩৭ লাখ। এর বড় অংশই বাড়ির দাম বৃদ্ধির ফলে তৈরি হয়েছে।
অ্যাডাম স্মিথ ইনস্টিটিউট উত্তরাধিকার কর বাতিল এবং মূলধনী মুনাফা কর কমানোর সুপারিশ করেছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতা মূলধনী মুনাফা করকে আয়করের সমপর্যায়ে আনার পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়নি।
বিরোধী দলের শ্যাডো বিজনেস অ্যান্ড ট্রেড সেক্রেটারি অ্যান্ড্রু গ্রিফিথ বলেছেন, যুক্তরাজ্যে মিলিয়নিয়ারের সংখ্যা কমে যাওয়া শুধু ধনীদের বিষয় নয়; এটি কর আদায়, কর্মসংস্থান এবং নতুন ব্যবসা সৃষ্টির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে তরুণ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষ দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া উদ্বেগের বিষয়।
যুক্তরাজ্যে মিলিয়নিয়ারের সংখ্যা আর্থিক সংকট-পরবর্তী সর্বনিম্নে। উচ্চ সুদের হার, সম্পদের মূল্যহ্রাস ও করনীতির পরিবর্তনকে এর প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে নতুন বিশ্লেষণ।
Sarakhon Report 



















