মাত্র ২১ বছর বয়সে প্রথম উপন্যাস প্রকাশ করে সাহিত্যজগতে আলোড়ন তুলেছিলেন মার্কিন লেখক ব্রেট ইস্টন এলিস। তাঁর বহুল আলোচিত উপন্যাস ‘লেস দ্যান জিরো’ প্রকাশের প্রায় চার দশক পরও বইটি নিয়ে পাঠকের আগ্রহ কমেনি। এবার সেই উপন্যাসের লেখালেখি, সমালোচনা এবং চলচ্চিত্র রূপান্তর নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন এলিস।
ছোটবেলাতেই লেখার শুরু
ব্রেট ইস্টন এলিস জানান, মাত্র পাঁচ বছর বয়স থেকেই তাঁর লেখালেখির শুরু। প্রথমে শিশুদের জন্য গল্প লিখতেন, পরে কমিক বই আঁকা ও লেখায় আগ্রহী হন। ১৩ বছর বয়সে তিনি প্রথম পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস লেখেন।
কৈশোরে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, জোয়ান ডিডিয়ন ও রেমন্ড চ্যান্ডলারের লেখায় গভীরভাবে প্রভাবিত হন তিনি। বিশেষ করে হেমিংওয়ের লেখার ধরন তাঁকে গল্প বলার ক্ষেত্রে ভাষার গুরুত্ব বুঝতে সাহায্য করে। পরে ডিডিয়নের লস অ্যাঞ্জেলেসকেন্দ্রিক লেখালেখি তাঁর নিজের সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও বড় প্রভাব ফেলে।
‘লেস দ্যান জিরো’ যেভাবে জন্ম নেয়
১৯৮২ থেকে ১৯৮৩ সালের শীতকালে ‘লেস দ্যান জিরো’-এর প্রথম খসড়া লেখেন এলিস। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ক্লে বড়দিনের ছুটিতে পূর্ব উপকূলের কলেজ থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসে ফিরে আসে। এরপর পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে তার সময় কাটানো, পার্টি, মাদক, সম্পর্ক, গাড়ি চালিয়ে ঘুরে বেড়ানো এবং ধীরে ধীরে অন্ধকার এক জগতের মুখোমুখি হওয়ার গল্প এগিয়ে যায়।
এলিসের লক্ষ্য ছিল এমন এক ধরনের আবহ তৈরি করা, যেখানে উদাসীনতা ও শূন্যতার অনুভূতি পাঠকের কাছে স্বাভাবিকভাবেই পৌঁছে যায়। লস অ্যাঞ্জেলেসের সেই সময়কার জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও পরিবেশও উপন্যাসটির চরিত্র নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রকাশের পর বইটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মাত্র ২১ বছর বয়সেই এলিস পরিণত হন আলোচিত এক সাহিত্যিক ব্যক্তিত্বে।
সমালোচকদের মতামত নিয়ে খুব একটা ভাবেননি
প্রথম দিকের সমালোচনার অভিজ্ঞতা মনে করে এলিস বলেন, বইটি লেখার সময় তিনি পাঠক বা সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া মাথায় রাখেননি। বিভিন্ন পত্রিকায় বইটি নিয়ে প্রশংসা যেমন এসেছে, তেমনি কঠোর সমালোচনাও হয়েছে।
একজন প্রভাবশালী বই সমালোচক উপন্যাসটিকে অত্যন্ত অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু সেই প্রতিক্রিয়াও এলিসকে খুব একটা বিচলিত করেনি।
তাঁর কাছে লেখার মূল বিষয় ছিল নিজের মতো করে গল্প বলা। বইটি প্রকাশের পর কে কী বলছেন, সেটি নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করলে লেখার স্বাধীনতা নষ্ট হতে পারে—এমন মনোভাবই তাঁর কথায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নিজের লেখা আবার পড়তে চান না
এলিস জানিয়েছেন, নিজের পুরোনো লেখা আবার পড়া তাঁর কাছে বেশ কষ্টকর। কারণ বই শেষ হয়ে যাওয়ার পরও লেখকের মনে নানা জায়গা বদলে দেওয়ার ইচ্ছা তৈরি হয়।
‘লেস দ্যান জিরো’ও তিনি বহু বছর ধরে পড়েননি। তাঁর মতে, বইটি তাঁর তরুণ বয়সের একটি প্রতিচ্ছবি। এখন একই গল্প লিখলে তিনি হয়তো অনেক কিছুই অন্যভাবে লিখতেন।
নিজের লেখার প্রতি অতিরিক্ত আত্মসমালোচনামূলক হয়ে পড়ার কারণেই পুরোনো বই পুনরায় পড়তে তাঁর অনীহা।

লেখার প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে এলিসের ভাবনা
ব্রেট ইস্টন এলিস মনে করেন, জীবন নিজেই অনেক সময় অদ্ভুত ও হাস্যকর। তাই তাঁর লেখায় ব্যঙ্গ বা হাস্যরস আলাদাভাবে তৈরি করার প্রয়োজন হয় না। পৃথিবীকে তিনি যেভাবে দেখেন, সেটিই স্বাভাবিকভাবে তাঁর লেখায় চলে আসে।
নিজেকে অনেক সময় বাইরের একজন মানুষ হিসেবে দেখেছেন বলেও জানান তিনি। এই অবস্থান থেকেই সমাজ, মানুষের আচরণ ও প্রচলিত রীতিনীতিকে অন্যভাবে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পেয়েছেন বলে মনে করেন।
তাঁর মতে, একজন লেখকের লেখায় রসবোধ থাকা জরুরি। কারণ জীবনের অদ্ভুত দিকগুলো দেখতে না পারলে অনেক কিছুই অপূর্ণ থেকে যায়।
সিনেমা নিয়ে বদলে গেছে তাঁর মত
‘লেস দ্যান জিরো’ চলচ্চিত্রে রূপ নেওয়ার সময় প্রথমে বেশ আশাবাদী ছিলেন এলিস। কিন্তু ১৯৮৭ সালে সিনেমাটি দেখার পর তাঁর মন ভেঙে যায়। কারণ বইয়ের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য বা সংলাপ সিনেমায় ছিল না।
তবে সময়ের সঙ্গে সেই চলচ্চিত্র সম্পর্কে তাঁর ধারণা পুরোপুরি বদলে গেছে। এখন তিনি সিনেমাটিকে অত্যন্ত সুন্দর, আবহময় ও স্মরণীয় বলে মনে করেন।
এলিসের চোখে সিনেমাটি মূলত একটি অন্ধকার আবহের রহস্যনির্ভর চলচ্চিত্র। এর সংগীত, ক্যামেরার কাজ ও দৃশ্যধারণ তাঁকে এখন মুগ্ধ করে। তাঁর উপলব্ধি, একটি বই থেকে চলচ্চিত্র তৈরি হলে সেটি হুবহু বইয়ের মতো হবে—এমন প্রত্যাশা করা ঠিক নয়।
লেখক হিসেবে নিজের স্বাধীনতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
ব্রেট ইস্টন এলিসের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে লেখকের স্বাধীনতার বিষয়টি। তিনি মনে করেন, একটি বই লেখার সময় পাঠক, প্রকাশক বা সমালোচকের প্রত্যাশা পূরণের চিন্তা লেখকের সৃষ্টিশীলতাকে সীমাবদ্ধ করতে পারে।
তাঁর কাছে লেখা মানে নিজের ভেতরের গল্প ও অনুভূতিকে নিজের মতো করে প্রকাশ করা। আর সেই কারণেই চার দশক পেরিয়েও ‘লেস দ্যান জিরো’ তাঁর সাহিত্যিক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত কাজগুলোর একটি হয়ে আছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















